বাংলাদেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় গড়ে ওঠা বরিশাল সিটি করপোরেশনের পানি শোধনাগার প্রকল্প। যে প্রকল্পের সুফল নগরবাসীর কাছে পৌঁছানোর আগেই সেই সরকারি স্থাপনার জমিতেই দিব্যি দুম্বা আর ছাগলের খামার করে বসেছেন বিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী। নগরবাসী যখন খাবার পানির জন্য হাহাকার করছে, তখন সরকারি জমিতে ব্যক্তিগত বিলাসবহুল খামার চালাতে গিয়ে বিসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মী আর ভেটেরিনারি চিকিৎসকের জনবল ও বেতন ভাতা টেনে নিচ্ছেন এই আমলা। আর এই পুরো কাণ্ড ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন তথাকথিত প্রশাসকের চেয়ারটি আলংকারিক আর ক্ষমতার পুরোটাই কুক্ষিগত করে বসে আছেন এই সিইও।
ঘটনার গভীরে গেলে দেখা যায়, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়। এটা একটা সিস্টেমিক কালচার, যার জন্মসূত্র গেঁথে আছে সেনানিবাসের নিরাপত্তাবলয় থেকে উঠে আসা সেই দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায়। যখন দেশের শাসনব্যবস্থায় নিয়োগ হয় নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে, তখন সরকারি সম্পত্তি যে ব্যক্তিগত জমিদারিতে রূপ নেয়, সেটা আর অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকে না।
নগরবাসীকে বিশুদ্ধ পানি দিতে আমানতগঞ্জ আর রূপাতলীতে প্লান্ট বসানো হলো। সেই প্লান্টের ভেতরের ফাঁকা জমিতে বিদেশি ঘাসের বাগান করা হলো, শেড তৈরি হলো। অথচ সেই জমিতেই যদি সবজি চাষ হতো বা প্লান্ট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হতো, তাহলে বরিশালবাসীর কষ্ট কিছুটা লাঘব হতো। কিন্তু সেখানে চলছে সিইওর ব্যক্তিগত শখের পশুপালন।
বিসিসির পরিচ্ছন্নতা শাখার দুই কর্মী মেহেদী ও ইব্রাহিমকে ডিসেম্বর মাস থেকে দৈনিক মজুরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের কাজ সরকারি স্থাপনা পরিষ্কার করা নয়, বরং সিইওর দুম্বা আর ছাগলের গোবর সাফাই করা। জনগণের ট্যাক্স থেকে তাদের বেতন যাচ্ছে মাসে ১৯ হাজার ৫০০ টাকা করে। শুধু তাই নয়, বিসিসির বেতনভোগী ভেটেরিনারি চিকিৎসক ডা. রবিউল ইসলামকেও নিয়মিত সেখানে হাজিরা দিতে হচ্ছে পশুর অস্ত্রোপচার আর চিকিৎসা দিতে। অথচ একজন সরকারি চিকিৎসকের দায়িত্ব হলো নগরীর গবাদিপশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, কোনো ব্যক্তি বিশেষের ব্যক্তিগত ফার্মের তদারকি করা নয়।
ঘটনার সবচেয়ে বড় কৌতুকপূর্ণ অধ্যায় হলো সিইওর চালাকি। প্রশাসক শিরীন যখন পরিদর্শনে যাবেন জানতে পেরে, মঙ্গলবার গভীর রাতে ট্রাক ভর্তি করে দুম্বা পাঠানো হলো জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে। অথচ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে উনি দাবি করলেন, এমন খামার নাকি বেলতলাতেও আছে এবং সেটা তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে করা। একজন সিটি করপোরেশনের সিইও নিজস্ব অর্থায়নে সরকারি জমিতে খামার করবেন কেন? আর নিজস্ব অর্থায়নে করলে বিসিসির কর্মী দিয়ে সেটা দেখভাল করাবেন কেন? এই বৈপরীত্য আর মিথ্যাচার যেন চরম অপরাধবোধ আর ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শনীর পরিচয় বহন করছে।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, সিইওর এই লাগামহীন আচরণের বিরুদ্ধে এতদিন কেউ মুখ খোলেনি। কারণ তখন প্রশাসক পদে ছিলেন একজন বিভাগীয় কমিশনার। আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভয়ে বা দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার নিরাপত্তায় কেউ সাহস পাননি কথা বলতে। এক মাস আগে রাজনৈতিক পরিচয়ের নতুন প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন আসার পরেই বিষয়টি আলোচনায় এলো। তার মানে দাঁড়ায়, সিস্টেমের ভেতরেই এমন একটা চক্র কাজ করছে যেখানে নির্ভয়ে দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি চলতে পারে, যতক্ষণ না রাজনৈতিক পালাবদলে কেউ প্রশ্ন করতে আসে।
বরিশালের এই ঘটনা শুধু একজন আমলার ক্ষমতার অপব্যবহার নয়। এটা একটা অকার্যকর প্রশাসনের প্রতিচ্ছবি। যেখানে সিটি করপোরেশন জনগণের পানির চেয়ে একজন কর্মকর্তার পশুপালন শখকে বেশি প্রাধান্য দেয়। যে রাজনৈতিক পটভূমিতে আজকের এই প্রশাসন চলছে, সেখানে এই ধরনের অনিয়ম যেন পৃষ্ঠপোষকতাই পায়। ট্যাক্সের টাকায় কেনা জমি হয়ে যায় কারও ব্যক্তিগত খামারবাড়ি। সাধারণ মানুষ যখন ভ্যাট আর ট্যাক্সের বোঝায় ন্যুব্জ, তখন সিটি করপোরেশনের রিসোর্স পাচার হয়ে যায় দুম্বার পেটে।

