২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সেই নাটকীয় পটপরিবর্তনের ২০ মাস পর এখন বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে নেপথ্যের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। পর্দার আড়ালে থাকা ‘থলের বিড়াল’ যত বেরিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে, শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাতের নীল নকশাটি কেবল রাজপথের আন্দোলন ছিল না; বরং এর সূত্রপাত হয়েছিল মিরপুর ও মহাখালী ডিওএইচএস-এ।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট সকালে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের তিনটি পৃথক গ্রুপ মিরপুর এবং মহাখালী ডিওএইচএসে একত্রিত হয়। এই কর্মকর্তাদের একটি দল ঢাকার ইসিবি স্কয়ারের দিকে, দ্বিতীয় দল জাহাঙ্গীর গেটের অভিমুখে এবং তৃতীয় দলটি মহাখালী রেলগেট অতিক্রম করে বনানী ডিওএইচএসের দিকে অগ্রসর হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ৪০-৫০ জনের এই ছোট ছোট মিছিলগুলো থেকে সরাসরি উস্কানিমূলক স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল। তাদের কণ্ঠে তখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল— “আমরা এখনই একটি সেনা সরকার চাই।”
জাহাঙ্গীর গেটের দিকে অগ্রসরমান দলে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন, যিনি পরবর্তীতে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাও হয়েছিলেন। তৎকালীন ডিজিএফআই-এর কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দিকী তাকে ফোন করে সতর্ক করেছিলেন এই বলে যে, তিনি একটি ‘স্নাইপার জোনে’ প্রবেশ করছেন।
একই সুর শোনা গেছে বর্তমান উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের কণ্ঠেও। গত ৬ এপ্রিল এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, ৫ আগস্টের আট দিন আগেই জনৈক সেনা কর্মকর্তা তাকে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে স্নাইপার অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন। ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)-এর রেকর্ডে এসব যোগাযোগের অকাট্য প্রমাণ থাকলেও রহস্যজনক কারণে তা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে দেখা যায়, কোটা আন্দোলন দমনে পুলিশ রাবার বুলেট ও পেলেট গান ব্যবহার করলেও তাদের কাছে স্নাইপার বা ৭.৬২ মিমি ক্যালিবারের কোনো অস্ত্র ছিল না। অথচ ১৬ জুলাই থেকে ৮ আগস্টের মধ্যে শতাধিক মানুষ দূরপাল্লার গুলিতে নিহত হন। ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে, নিহতদের অধিকাংশকেই পেছন থেকে গুলি করা হয়েছিল এবং আঘাতের ধরন ছিল ‘টার্গেট কিলিং’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনমনে পুলিশ ও তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করতেই এই অজ্ঞাত পরিচয় স্নাইপারদের ব্যবহার করা হয়েছিল। কোনো যথাযথ তদন্ত ছাড়াই এসব হত্যাকাণ্ডের দায় একতরফাভাবে পুলিশের ওপর চাপিয়ে একটি নির্দিষ্ট ‘ন্যারেটিভ’ বা বয়ান তৈরি করা হয়।
৫ আগস্টের ঘটনায় শত শত সামরিক কর্মকর্তার বিতর্কিত ভূমিকা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এটি ছিল সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। বিশ্বস্ত সূত্রগুলো বলছে, ৪৬তম ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড এবং ৯ম ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনকে ঢাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। এমনকি জননিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকা আর্টিলারি ডিভিশনও নির্দিষ্ট মহলের নির্দেশে হাত গুটিয়ে বসে ছিল।
এই পরিকল্পিত নিষ্ক্রিয়তার উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের আড়াল করা, বিশেষ করে ইউনিফর্মধারী বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই ব্যক্তিদের যারা পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছিলেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, সরকার পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিংবা কোনো গোয়েন্দা সংস্থা ওই হামলাকারীদের শনাক্ত করার ন্যূনতম উদ্যোগ নেয়নি। উল্টো পুলিশ হত্যা ও জুলাইয়ের অস্থিরতায় জড়িতদের এক প্রকার ‘দায়মুক্তি’ দেওয়া হয়েছে।
২০ মাস পর আজ প্রশ্ন উঠছে, তবে কি একটি সুনিপুণ সামরিক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতার এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল? এই ছায়াশক্তি কারা, তা নিয়ে এখন জনমনে গভীর সন্দেহ দানা বাঁধছে।

