বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর ‘জেলহত্যা’র এক নতুন ও ভয়ংকর অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারেক জিয়াও সেই একই কায়দায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যা করছে।
সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে জামালপুর জেলা কারাগারে বন্দি অবস্থায় মারা গেছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও কৃষিবিদ জিয়াউল হক জিয়া। দুদক-এর একটি মামলায় গত ১৫ জানুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ ডায়াবেটিস ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কথা বললেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। গুরুতর অসুস্থ থাকার পরও কেন তাকে পর্যাপ্ত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে পটুয়াখালী জেলা কারাগারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান দুমকি উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম খাঁন। হার্টে ব্লক থাকা সত্ত্বেও তাকে উন্নত চিকিৎসা না দিয়ে কারান্তরীণ রাখা হয়েছিল।
গত ফেব্রুয়ারিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয় নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মনির হোসেন সিকদারের। পরিবারের দাবি, গত তিন মাস ধরে বিনা বিচারে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। দলটির নেতাকর্মীরা একে স্রেফ ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ নয়, বরং ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে দেখছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘হার্ট অ্যাটাক’ বা ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’র তকমা দেওয়া হলেও নিহতদের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন এবং চিকিৎসার চরম অবহেলার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সমালোচকরা একে রাজনৈতিক বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার ‘জাকার্তা মেথড’-এর সাথে তুলনা করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন,, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে যেমন জিয়াউর রহমান ওতোপ্রতোভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ৩ নভেম্বরের জেলহত্যার নেপথ্যে ছিলেন, ঠিক একইভাবে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্ব এই জেলহত্যার রাজনীতিকে মৌন সমর্থন দিচ্ছে।
জুলাই পরবর্তী সময়ে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। সিরাজগঞ্জের ৮০ বছর বয়সী আহমদ মোস্তফা খান বাচ্চু কিংবা গাইবান্ধার তারিক রিফাতের মতো প্রবীণ নেতাদেরও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। গণতন্ত্র রক্ষার দোহাই দিয়ে আওয়ামী লীগ ঠেকানোর নামে এই ‘কাস্টডিয়াল ডেথ’ বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর এক চরম চপেটাঘাত।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নীরবতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, জেলখানায় এই নৃশংসতা বন্ধ না হলে দেশ আরও বড় রাজনৈতিক রক্তপাতের দিকে ধাবিত হতে পারে।

