আজ নববর্ষের দিন সকালে ভালো কিছু ছবি তোলার জন্য উত্তরার সেক্টর থ্রিতে ঢুকেছিলাম। ভাইরে ভাই, আর বের হতে পারছি না। চারদিকে এমন জ্যাম, আর এত মানুষের ঢল যে মনে হচ্ছে পুরো শহর যেন একসাথে নিঃশ্বাস ফেলছে। ভয়ানক সুন্দর এক উচ্ছ্বাস। পহেলা বৈশাখকে বুকের মধ্যে এমনভাবে ধারণ করেছে মানুষ যে দেখে মনটা ভরে গেল। আজ রাতে এই ভিড়ে থাকা অনেকের ঘরেই হয়তো ভাত চুলোয় উঠবে না, অথচ মুখে অদ্ভুত এক শান্তির হাসি।
চারপাশের আমেজটা বলে বোঝানোর মতো না। রাস্তায় লাল আর সাদার মেলা। এই যে ফেসবুক খুললে চোখে পড়ে কিছু চরমপন্থী আর উগ্রবাদীর বিষোদগার, তাদের দেখে ভয় পেয়ো না কেউ। এরা সংখ্যায় নগণ্য। মানুষ কিন্তু এই উন্মাদনা ছেপে ধরে গুনেও শেষ করতে পারছে না। ফেসবুকের ভার্চুয়াল বিষবাষ্প থেকে বের হয়ে একটু রাস্তায় দাঁড়ালেই চোখে পড়বে চমৎকার এক দুনিয়া। একটু বিনোদনের সুযোগ পেলেই বাঙালি যে কিভাবে সব ভেদাভেদ ভুলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আজকের এই ঢাকা শহর।
কিন্তু এই আনন্দের আড়ালে একটা সত্যি কথা বলতে ইচ্ছে করছে। প্রকৃতি নাকি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। কথাটা একদম ঠিক। দেখুন না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে এবার যখন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটা কেড়ে নেওয়ার চাপ এসেছে, যখন জামাতের ইশারায় নাম পাল্টে দিতে হলো, তখন কি হলো? শূন্যস্থানটা ভরাট করে দিল ধানমন্ডির বর্ষবরণ পর্ষদ। তারা সেই আগের চেনা নামেই শোভাযাত্রা করল, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামেই।
আর মজার ব্যাপার হলো, সেই শোভাযাত্রার নেতৃত্বে কিন্তু তারাই রইলেন, যারা একসময় চারুকলার সেই ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রার কাণ্ডারি ছিলেন। প্রচারণার বড় কোনো ঝাড়–ফুঁতো ছিল না, তবু মানুষের উপস্থিতি একেবারে কম হয়নি। যারা বছর বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পা মাড়াতেন, তাদের অনেকেই এবার পথ বদলে ধানমন্ডিতে হাজির হয়েছেন। কেননা বাংলা নববর্ষ যারা মন থেকে ধারণ করেন, যারা এই দিনটিকে সত্যিকারের সংস্কৃতির আলোয় দেখতে চান, তারা কখনোই ধর্মীয় গোঁড়ামির ছাপ মারা কোনো উৎসব চান না।
একটা সময় ছিল যখন এই দেশের প্রগতিশীল সমাজের নেতৃত্ব দিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পহেলা বৈশাখ এলেই সবার পায়ের মোচড় যেন সেদিকেই পড়ত। মঙ্গল শোভাযাত্রার স্রষ্টা নন জেনেও সবাই যেন একক ঠিকাদারির ভার তুলে দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে। কিন্তু সেই অবস্থান কি তারা ধরে রাখতে পেরেছে? যে মঙ্গল শোভাযাত্রা ছিল মৌলবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের এক অনন্য কাফেলা, সেই শোভাযাত্রাকেই আজ তারা মৌলবাদের পায়ের কাছে সঁপে দিতে বাধ্য হয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই বর্ষবরণ পর্ষদকে প্রতিবাদের ভাষা হাতে তুলে নিতে হলো। তারা সেই কেড়ে নেওয়া নামটিকেই বুকে ধরে রাস্তায় নামল।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বর্ষবরণ পর্ষদ যদি এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র চেতনা ধরে রাখতে পারে, তবে আগামী দু’তিন বছরের মধ্যে এই পথটিই হয়ে উঠবে পহেলা বৈশাখের প্রধান আকর্ষণ। কারণ যে মানুষগুলো সত্যিকারের প্রগতিশীল, যারা জামাতের ঠিক করে দেওয়া নাম কিংবা নির্ধারিত পথে চলতে নারাজ, তারা আর ফিরে যাবে না ক্যাম্পাসের সেই আপসকৃত আয়োজনে। গত দু’বছর যারা বাধ্য হয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন, তারাও হয়তো সামনের বছরগুলোতে নিজেদের গন্তব্য বদলে ফেলবেন।
আর এই পুরো চিত্রটা মাথায় রেখেই বলি, আজকের এই যে সেনানিবাসের কোলে বেড়ে ওঠা দলটি (যার জন্মই হয়েছিল জিয়াউর রহমানের স্বৈরাচারী ছত্রছায়ায় এবং যারা দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে) আর তাদেরই গায়ে লেগে থাকা জামায়াত নামক দাগি যুদ্ধাপরাধীদের দলবল, এরা জনগণের অংশগ্রহণহীন পাতানো ভোটে বসে আছে ক্ষমতায়। এদের সাংস্কৃতিক দেউলিয়াপনার বহিঃপ্রকাশ আমরা চারুকলার সেই ঘটনায় প্রত্যক্ষ করেছি।
এরা মনে করেছিল, একটা নাম বদলে দিলেই হয়তো প্রগতিশীল মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া যাবে। কিন্তু আজ সেক্টর থ্রির এই জ্যামের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হচ্ছে, মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ আর সাংস্কৃতিক প্রাণশক্তির কাছে এদের যত রাজনৈতিক চাপ আর সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প, সব যেন অত্যন্ত নস্যি আর তুচ্ছ হয়ে গেছে। মানুষ ঠিকই তার নিজের ভাষায়, নিজের পথে উৎসব খুঁজে নিয়েছে। আর এই জ্যামের মধ্যে দাঁড়িয়ে সেটা উপলব্ধি করাটাই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

