২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসার পর যে কাজটা প্রথমেই করেছিল, সেটা হলো ভিন্নমত দমন। সাংবাদিক, শিক্ষক, সংখ্যালঘু, সাধারণ নাগরিক, কেউ রক্ষা পায়নি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রাতের আঁধারে তুলে নেওয়া হয়েছে, গুম হয়েছে, খুন হয়েছে। সেই সময়ে মানুষ শুধু ভয়ে চুপ করে থাকত। এখন ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর। সেই একই রাজনৈতিক শক্তি, বিএনপি আর জামাতে ইসলাম, ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে আছে। আর তারা যা করছে, তাতে স্পষ্ট হচ্ছে তারা একই অপশাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চাইছে। তাদের নতুন নিপিড়নের অস্ত্র ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের খসড়া তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
এই আইনের নামে যে “ডিজিটাল সুরক্ষা” শব্দটা বসানো হয়েছে, সেটাই সবচেয়ে বড় বাটপারি। কারণ আইনটা সুরক্ষা দিচ্ছে না, সরাসরি দমন করছে। যে আইনে গালি, অপমান, মানহানি, গুজব, অযাচাইকৃত খবর, মিম শেয়ার, এমনকি সরকারের সমালোচনার জন্য ৫ থেকে ১০ বছর জেল এবং লাখ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব থাকছে, সেই আইন কাউকে সুরক্ষা দেয় না। এটা ক্ষমতাকে সুরক্ষা দেয়। ক্ষমতার সমালোচনাকে অপরাধ বানিয়ে দেয়।
বিশিষ্টজনেরা বলছেন, খসড়াটা আসলে ভিন্নমত দমনের একটা হাতিয়ার। চলুন দেখা যাক, কেন আর কিভাবে।
প্রথমত, গালি বা অপমানের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছর জেল বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা। নারী বা শিশুকে ঘিরে হলে ১০ বছর জেল বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা। প্রশ্ন হলো, এই “গালি” বা “অপমান” কে নির্ধারণ করবে? কোন শব্দটা গালি, আর কোনটা সমালোচনা, সেই সীমারেখা খসড়ায় স্পষ্ট নয়। বিএনপি-জামাত জোটের আমলে “অপমান” শব্দটা দিয়ে ঠিক এইভাবেই ভিন্নমতকে দমানো হয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে যত মামলা হয়েছিল ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে, তার একটা বড় অংশ ছিল এই “অপমান” এবং “মানহানি” ধারায়। এখন অনলাইনে একই কৌশল প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, মিম শেয়ার করা। মিমটা আপনি বানাননি, আপনি শুধু শেয়ার করেছেন। কিন্তু সেটাকে “অপরাধে সহায়তা” হিসেবে দেখা হবে। এমনকি মিমে হাহা রিঅ্যাকশন দিলেও প্রশ্ন উঠতে পারে। এর মানে হলো, আপনি হাসলেও অপরাধী। বিএনপি-জামাত জোটের শাসনামলে ঠিক এই নীতিতেই মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কেউ কোনো মিছিলে ছিল না, শুধু পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, তাকেও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে “সহযোগী” হিসেবে। এই মিম শেয়ার এবং রিঅ্যাকশন ধারাটা সেই একই মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
তৃতীয়ত, সরকারের সমালোচনা করা পোস্ট ব্লক হবে। মানে সরকারের ভুলের কথা বলা যাবে না। অথচ ২০০১-০৬ সালে বিএনপি-জামাত সরকারের সময়ে সাংবাদিকরা যেভাবে রাষ্ট্রের সমালোচনা করার জন্য হেনস্তার শিকার হয়েছেন, তার ইতিহাস সবাই জানে এখন। হরতাল, অবরোধ, রাষ্ট্রীয় চাপ, সবকিছুর পরেও তখন মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়াই রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছে। এখন যখন সোশ্যাল মিডিয়া ভিন্নমত প্রকাশের প্রধান মাধ্যম, তখন ঠিক সেই মাধ্যমটাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হচ্ছে। সরকারের সমালোচনা ব্লক মানে হলো সরকারের ভুল ঢেকে রাখা। আর সরকারের ভুল ঢাকা মানে দুর্নীতি, নির্যাতন, গুম, খুন সবকিছু ঢেকে রাখা।
চতুর্থত, অযাচাইকৃত খবরের জন্য ১০ বছর জেল। এই ধারাটাই সবচেয়ে বড় ফাঁদ। কারণ “অযাচাইকৃত” শব্দটা অস্পষ্ট। একটি খবর কে যাচাই করবে, কীভাবে যাচাই হবে, কতটুকু যাচাই হলে সেটা যথেষ্ট হবে, এসবের কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। ফলে যেকোনো সাংবাদিক, যেকোনো সাধারণ নাগরিক, যিনি কোনো তথ্য শেয়ার করবেন, তার বিরুদ্ধে যেকোনো সময় এই ধারা প্রয়োগ করা যাবে। বিএনপি-জামাত জোটের ইতিহাসে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া, হয়রানি করা, জেল খাটানো সবই আছে। এখন সেই মামলাগুলো ডিজিটাল রূপ নিতে যাচ্ছে।
পঞ্চমত, একই পোস্ট নিয়ে একাধিক মামলা। মামলা করার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। মানে একজন মানুষকে হয়রানি করার জন্য একই পোস্ট নিয়ে একাধিক থানায়, একাধিক জায়গায় মামলা করা যাবে। ২০০১-০৬ সালে এই কৌশলটাই ব্যবহার করা হয়েছে। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, একাধিক থানা, যাতে সে কোনোভাবে জামিন পেতে না পারে। এখন অনলাইনে সেই কৌশল ডিজিটাল রূপে ফিরে আসছে।
ষষ্ঠত, ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার। কিছু অপরাধ আমলযোগ্য হলে পুলিশ আদালতের পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারবে। মানে রাত দুটোয় আপনার দরজায় নক। কারণ আপনি হয়তো একটা পোস্ট দিয়েছেন, যা সরকারের সমালোচনা। ২০০১-০৬ সালে রাতের আঁধারে মানুষ তুলে নেওয়ার যে ঘটনা ঘটেছে, সেটাই এখন আইনি বৈধতা পেতে যাচ্ছে।
সপ্তমত, কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি। ভুলভাবে ব্লক করা হলো, ভুলভাবে গ্রেপ্তার করা হলো, তাতে কর্মকর্তাদের কোনো দায় থাকবে না। অথচ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণের বিষয়টি অস্পষ্ট। মানে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হলে আপনি কিছুই পাবেন না, কিন্তু নির্যাতনকারীরা নিরাপদ থাকবেন। এটা ঠিক সেই ব্যবস্থা, যা ২০০১-০৬ সালে বিএনপি-জামাত জোট চালু করেছিল।
অষ্টমত, শাস্তির পরিমাণ। অযাচাইকৃত খবরের জন্য ১০ বছর জেল। কিন্তু ধর্ষণ, খুন, গুমের মতো গুরুতর অপরাধে অনেক সময় এর চেয়ে কম শাস্তি হয়। প্রশ্ন হলো, একটা অযাচাইকৃত তথ্যের জন্য ১০ বছর জেল কেন? সমালোচকরা বলছেন, এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা অসম শাস্তির উদ্দেশ্য ন্যায়বিচার নয়, ভয় সৃষ্টি করা। মানুষ যাতে ভয় পেয়ে কোনো কিছু শেয়ার না করে, সরকারের বিরুদ্ধে কথা না বলে। ২০০১-০৬ সালে বিএনপি-জামাত জোটের শাসনামলে ঠিক এই ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। সাংবাদিকরা নিজেরাই জানতেন না কখন তাদের বিরুদ্ধে মামলা হবে, কখন তারা গ্রেপ্তার হবেন।
নবমত, সাংবাদিকদের সুরক্ষা নেই। সূত্রের বরাতে তথ্য প্রকাশ করলেন, পরে সেটা অযাচাইকৃত হিসেবে বিবেচিত হলো, তাহলে সাংবাদিকও আইনি ঝুঁকিতে পড়বেন। ২০০১-০৬ সালে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যত মামলা হয়েছে, তার একটা বড় অংশ ছিল এই ধরনের “অযাচাইকৃত” তথ্য প্রকাশের অভিযোগে। এখন সেটা ডিজিটাল মাধ্যমে প্রসারিত হচ্ছে। অথচ একটি স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া কোনো সমাজে দুর্নীতি, নির্যাতন, গুম, খুন প্রকাশ পায় না। এই আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হচ্ছে।
দশমত, মোবাইল কোর্টে বিচার। মানে রাস্তার পাশেই আপনার বিচার, রাস্তার পাশেই সাজা। ২০০১-০৬ সালে বিএনপি-জামাত জোটের আমলে মোবাইল কোর্ট দিয়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের হয়রানি করা হয়েছে। এখন সেটা ডিজিটাল অপরাধের ক্ষেত্রে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে একজন মানুষকে হয়রানি করার জন্য কোনো বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে না, শুধু একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সিদ্ধান্তই যথেষ্ট।
এতকিছুর পরেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। এই আইনটা আসলে কার জন্য? কারা এর সুবিধা পাবে? কারা এর ভয়ে চুপ করে থাকবে? উত্তরটা স্পষ্ট। বিএনপি-জামাত জোটের শাসনামলে এই ধরনের আইনের মাধ্যমে সবসময় ভিন্নমতকে দমন করা হয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে যত রাজনৈতিক মামলা, যত গুম, যত খুন, যত নির্যাতন, তার সবকিছুর পেছনে ছিল এই ধরনের দমনমূলক আইন। এখন ২০২৬ সালে সেই একই শক্তি আবারও ক্ষমতায়। আর তারা একই কৌশল প্রয়োগ করতে চাইছে।

