প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের মুখস্থ প্রতিশ্রুতিতে দুই লাখ কর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

দুই লাখ কর্মীকে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই মালয়েশিয়া সরকারের চাকরি দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে! সম্পূর্ণ বিনা খরচে যাবে আরও দশ হাজার! সংখ্যাগুলো শুনতে দারুণ না? কিন্তু এই সংখ্যাগুলোর উৎস খুঁজতে গেলে যা পাওয়া যায়, তা হলো একটা সৌজন্য বৈঠক, একজন রাষ্ট্রদূতের মুখের কথা, আর একজন প্রতিমন্ত্রীর অতি উৎসাহী মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে পড়া। কোনো চুক্তি নেই, কোনো এমওইউ নেই, দুই সরকারের যৌথ ঘোষণাপত্র নেই। অথচ পরদিনই এটা জাতীয় খবর হয়ে যায়।

গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খানের সঙ্গে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ শুহাদা ওসমানের বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, রাষ্ট্রদূত তাকে বলেছেন সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ ধাপে ধাপে কর্মী পাঠানো শুরু হবে এবং ছয় মাসে দুই লাখ কর্মী নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হবে। লক্ষ করুন শব্দচয়নটা, “রাষ্ট্রদূত তাকে জানিয়েছেন”। এটা কোনো নথি নয়, কোনো সরকারি বিজ্ঞপ্তি নয়, একজন কূটনীতিকের মুখের কথা, যেটা একজন উপমন্ত্রী নিজের ভাষায় অনুবাদ করে জাতির সামনে “সিদ্ধান্ত” বলে চালিয়ে দিলেন।

বুধবারই সেই বেলুন ফেটে যায়। মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র ফাহমি ফাদজিল সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সরাসরি বলে দেন, মানবসম্পদমন্ত্রী রামানানের কাছ থেকে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে সরকারি ঘোষণা হিসেবে দেখা উচিত নয়। অর্থাৎ যে দেশের নামে দুই লাখ কর্মীর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো, সেই দেশই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গণমাধ্যমের সামনে তা অস্বীকার করে দিল। এটা কূটনৈতিক ভাষায় প্রায় একটা কষে থাপ্পড় বসানোর সমান।

এখানে যুক্তির জায়গাটা আরও পরিষ্কার করা দরকার। মালয়েশিয়া সরকার নিজেই ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের মোট শ্রমশক্তির মধ্যে বিদেশি কর্মীর অনুপাত মাত্র ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার নীতিগত লক্ষ্য ঘোষণা করে রেখেছে। অর্থাৎ পুত্রাজায়ার নিজস্ব নীতিই হলো বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমানো। এই বাস্তবতায় হঠাৎ ছয় মাসে একটা মাত্র দেশ থেকে দুই লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণা তাদের নিজেদের ঘোষিত নীতির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। একজন প্রতিমন্ত্রী যদি সত্যিই এই বিষয়ে কথা বলার আগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নীতি সম্পর্কে সামান্যতম হোমওয়ার্কও করতেন, তাহলে এত বড় সংখ্যা মুখ ফসকে বলে দেওয়ার আগে অন্তত একবার ভাবতেন। হয় তিনি এই নীতির কথা জানতেনই না, যেটা একজন প্রতিমন্ত্রীর জন্য চরম অযোগ্যতার প্রমাণ। অথবা জেনেও বলেছেন, যেটা সরাসরি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।

আরেকটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। ২০২৪ সালে জুলাই দাঙ্গার পর সুদী ইউনুসের অবৈধ শাসনামলেও ঠিক এই বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজার নিয়েই বড় ধরনের কেলেঙ্কারি হয়েছিল। গ্রামীণ ব্যাংকের ঘনিষ্ঠ এজেন্ট আর মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অতিরিক্ত ফি আদায়, শ্রমিকদের ঋণের ফাঁদে ফেলা, প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে পাঠানোর অভিযোগে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ সীমিত করে দিয়েছিল। এমন একটা ইতিহাসের পর দুই দেশের মধ্যে যেকোনো নতুন শ্রমচুক্তি স্বাভাবিকভাবেই আরও কঠোর যাচাই-বাছাই আর লিখিত দলিলের মধ্য দিয়ে আসার কথা, মৌখিক আশ্বাসের মধ্য দিয়ে নয়। অথচ যা ঘটল তা ঠিক উল্টো। একটা সৌজন্য সাক্ষাতের পরই বিশাল সংখ্যা ঘোষণা করে দেওয়া হলো, যেন আগের সব তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষাই নেওয়া হয়নি।

সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটা হলো দায়ভার এড়ানোর ধরন। ভুল স্বীকার করে সংশোধনী বিবৃতি দেওয়ার বদলে সরকারি মহল থেকে এখনো নীরবতা। অথচ এই নীরবতার মাশুল গুনতে হবে সেইসব মানুষকে, যারা এই খবর শুনে দালালের কাছে দৌড়াবেন, আগাম টাকা জমা দেবেন, ভিসার আশায় বসে থাকবেন। ছয় মাস পর যখন বাস্তবতা সামনে আসবে, তখন প্রতিমন্ত্রীর নাম আর কেউ মনে রাখবে না, কিন্তু যারা প্রতারিত হবেন তাদের ক্ষতি থেকে যাবে।

একজন সরকারি কর্মকর্তার মুখের একটা বাক্য এখন শুধু কথার কথা নয়, এটা লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। এই দায়িত্ববোধের ন্যূনতম অনুশীলনও যে সরকারের নেই, তাদের কাছ থেকে বড় বড় সংখ্যার প্রতিশ্রুতি শোনাটা এখন থেকে সন্দেহের চোখেই দেখা উচিত।

দুই লাখ কর্মীকে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই মালয়েশিয়া সরকারের চাকরি দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে! সম্পূর্ণ বিনা খরচে যাবে আরও দশ হাজার! সংখ্যাগুলো শুনতে দারুণ না? কিন্তু এই সংখ্যাগুলোর উৎস খুঁজতে গেলে যা পাওয়া যায়, তা হলো একটা সৌজন্য বৈঠক, একজন রাষ্ট্রদূতের মুখের কথা, আর একজন প্রতিমন্ত্রীর অতি উৎসাহী মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে পড়া। কোনো চুক্তি নেই, কোনো এমওইউ নেই, দুই সরকারের যৌথ ঘোষণাপত্র নেই। অথচ পরদিনই এটা জাতীয় খবর হয়ে যায়।

গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খানের সঙ্গে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ শুহাদা ওসমানের বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, রাষ্ট্রদূত তাকে বলেছেন সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ ধাপে ধাপে কর্মী পাঠানো শুরু হবে এবং ছয় মাসে দুই লাখ কর্মী নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হবে। লক্ষ করুন শব্দচয়নটা, “রাষ্ট্রদূত তাকে জানিয়েছেন”। এটা কোনো নথি নয়, কোনো সরকারি বিজ্ঞপ্তি নয়, একজন কূটনীতিকের মুখের কথা, যেটা একজন উপমন্ত্রী নিজের ভাষায় অনুবাদ করে জাতির সামনে “সিদ্ধান্ত” বলে চালিয়ে দিলেন।

বুধবারই সেই বেলুন ফেটে যায়। মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র ফাহমি ফাদজিল সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সরাসরি বলে দেন, মানবসম্পদমন্ত্রী রামানানের কাছ থেকে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে সরকারি ঘোষণা হিসেবে দেখা উচিত নয়। অর্থাৎ যে দেশের নামে দুই লাখ কর্মীর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো, সেই দেশই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গণমাধ্যমের সামনে তা অস্বীকার করে দিল। এটা কূটনৈতিক ভাষায় প্রায় একটা কষে থাপ্পড় বসানোর সমান।

এখানে যুক্তির জায়গাটা আরও পরিষ্কার করা দরকার। মালয়েশিয়া সরকার নিজেই ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের মোট শ্রমশক্তির মধ্যে বিদেশি কর্মীর অনুপাত মাত্র ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার নীতিগত লক্ষ্য ঘোষণা করে রেখেছে। অর্থাৎ পুত্রাজায়ার নিজস্ব নীতিই হলো বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমানো। এই বাস্তবতায় হঠাৎ ছয় মাসে একটা মাত্র দেশ থেকে দুই লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণা তাদের নিজেদের ঘোষিত নীতির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। একজন প্রতিমন্ত্রী যদি সত্যিই এই বিষয়ে কথা বলার আগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নীতি সম্পর্কে সামান্যতম হোমওয়ার্কও করতেন, তাহলে এত বড় সংখ্যা মুখ ফসকে বলে দেওয়ার আগে অন্তত একবার ভাবতেন। হয় তিনি এই নীতির কথা জানতেনই না, যেটা একজন প্রতিমন্ত্রীর জন্য চরম অযোগ্যতার প্রমাণ। অথবা জেনেও বলেছেন, যেটা সরাসরি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।

আরেকটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। ২০২৪ সালে জুলাই দাঙ্গার পর সুদী ইউনুসের অবৈধ শাসনামলেও ঠিক এই বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজার নিয়েই বড় ধরনের কেলেঙ্কারি হয়েছিল। গ্রামীণ ব্যাংকের ঘনিষ্ঠ এজেন্ট আর মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অতিরিক্ত ফি আদায়, শ্রমিকদের ঋণের ফাঁদে ফেলা, প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে পাঠানোর অভিযোগে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ সীমিত করে দিয়েছিল। এমন একটা ইতিহাসের পর দুই দেশের মধ্যে যেকোনো নতুন শ্রমচুক্তি স্বাভাবিকভাবেই আরও কঠোর যাচাই-বাছাই আর লিখিত দলিলের মধ্য দিয়ে আসার কথা, মৌখিক আশ্বাসের মধ্য দিয়ে নয়। অথচ যা ঘটল তা ঠিক উল্টো। একটা সৌজন্য সাক্ষাতের পরই বিশাল সংখ্যা ঘোষণা করে দেওয়া হলো, যেন আগের সব তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষাই নেওয়া হয়নি।

সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটা হলো দায়ভার এড়ানোর ধরন। ভুল স্বীকার করে সংশোধনী বিবৃতি দেওয়ার বদলে সরকারি মহল থেকে এখনো নীরবতা। অথচ এই নীরবতার মাশুল গুনতে হবে সেইসব মানুষকে, যারা এই খবর শুনে দালালের কাছে দৌড়াবেন, আগাম টাকা জমা দেবেন, ভিসার আশায় বসে থাকবেন। ছয় মাস পর যখন বাস্তবতা সামনে আসবে, তখন প্রতিমন্ত্রীর নাম আর কেউ মনে রাখবে না, কিন্তু যারা প্রতারিত হবেন তাদের ক্ষতি থেকে যাবে।

একজন সরকারি কর্মকর্তার মুখের একটা বাক্য এখন শুধু কথার কথা নয়, এটা লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। এই দায়িত্ববোধের ন্যূনতম অনুশীলনও যে সরকারের নেই, তাদের কাছ থেকে বড় বড় সংখ্যার প্রতিশ্রুতি শোনাটা এখন থেকে সন্দেহের চোখেই দেখা উচিত।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ