শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনেই কি এত ভয়? বাংলাদেশে রাজনীতির নতুন আতঙ্কের নাম ‘ডিসেম্বর’

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরবেন—এই সম্ভাবনাটিই কি এখন বিএনপি সরকার, তাদের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত-এনসিপি এবং ইউনূস-পরবর্তী ক্ষমতার বলয়ের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন?

বিবিসির সাংবাদিক শুভজ্যোতি ঘোষের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অন্তত সেই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনে ভারতীয় অবস্থানের যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা হলো—বাংলাদেশ সরকার মুখে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চাইছে, কিন্তু বাস্তবে তাঁকে হাতে পাওয়ার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ নিয়ে দিল্লির সন্দেহ আছে। কারণ, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সংকট আরও তীব্র হতে পারে এবং সরকারের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

যদি এই মূল্যায়ন সত্যি হয়, তাহলে প্রশ্ন একটাই—যাঁকে পরাজিত করার দাবি করে ক্ষমতায় আসা হয়েছে, তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাবনাতেই যদি এত ভয়, তাহলে আসলে ভয়টা কিসের? শেখ হাসিনার, নাকি জনতার?

প্রত্যর্পণের দাবি, নাকি রাজনৈতিক কৌশল? বাংলাদেশ সরকার যদি সত্যিই মনে করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান এতটাই শক্তিশালী, তাহলে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করতে এত দ্বিধা কেন?

ভারতের পক্ষ থেকে যে বার্তা আসছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সারকথা—শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফিরতে চাইলে সেটিই বরং প্রত্যর্পণের চেয়ে স্বাভাবিক পথ।

অর্থাৎ, দিল্লির দৃষ্টিতে বিষয়টি কেবল প্রত্যর্পণের কূটনৈতিক ফাইল নয়; বরং শেখ হাসিনার নিজের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাবনাও বাস্তব একটি রাজনৈতিক সমীকরণ। আর এখানেই বিএনপি সরকারের অস্বস্তির জায়গাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ একজন রাজনৈতিক নেতাকে পরাজিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় তাঁকে দেশে ফিরতে দেওয়া—যদি সরকার সত্যিই বিশ্বাস করে জনগণ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবে।

কিন্তু যদি তাঁকে দেশে ফেরার আগেই রাজনৈতিকভাবে ঠেকাতে হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—সরকার কি জনসমর্থনের একটি নতুন ঢেউয়ের আশঙ্কা করছে?

‘ডিসেম্বর’ এখন শুধু একটি মাস নয়: শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষিত সময় ডিসেম্বর—এই একটি শব্দই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কাউন্টডাউন তৈরি করেছে। সরকারের সামনে এখন দুটি পথ। এক. তাঁকে দেশে ফিরতে দেওয়া এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টির মোকাবিলা করা। দুই. নানা কূটনৈতিক, প্রশাসনিক কিংবা রাজনৈতিক কৌশলে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঠেকানোর চেষ্টা করা।

দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়া হলে রাজনৈতিক বার্তাটি ভয়াবহ হতে পারে। তখন জনগণের কাছে প্রশ্ন উঠবেই—একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সরকার এতটা উদ্বিগ্ন কেন? কারণ শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে কী হবে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না। কিন্তু এটুকু বলা যায়—তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের গণ-মনস্তাত্ত্বিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস তৈরি হতে পারে। বিরোধীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়তে পারে। রাজপথে নতুন মেরুকরণ শুরু হতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
জনরোষ কি সত্যিই বাড়ছে? এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট, দ্রব্যমূল্যের চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট, চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—এসব নিয়ে মানুষের অসন্তোষ যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে যে কোনো সরকারের জন্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সরকারের সমর্থকেরা এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হলো—মানুষের রান্নাঘরের সংকটকে কোনো সরকারি প্রচার দিয়ে দীর্ঘদিন ঢেকে রাখা যায় না।

বিদ্যুৎ না থাকলে মানুষ সরকারের সাফল্যের গল্প শুনতে চায় না। গ্যাস না থাকলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে ক্ষোভ থামানো যায় না। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নাগালের বাইরে গেলে রাজনৈতিক স্লোগান মানুষের ক্ষুধা মেটায় না। আর এই অসন্তোষের সঙ্গে যদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারে।

উগ্রবাদ ও সাংস্কৃতিক পরিসর: অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো এড়ানো যাবে কতদিন? সরকার জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের কথা অস্বীকার করতে পারে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন বোমা বিস্ফোরণ, ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্টকে ঘিরে বাধা—এসব ঘটনা যদি ধারাবাহিকভাবে সামনে আসে, তাহলে সরকারের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—রাষ্ট্র কি নাগরিকের নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারছে?

নাটক-সিনেমায় প্রেমের গল্প থাকবে কি থাকবে না—এমন প্রশ্ন যদি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে, তাহলে সেটি কেবল বিনোদনের বিষয় থাকে না; সেটি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক চরিত্রের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ কি একটি মুক্ত, বহুত্ববাদী সমাজের দিকে যাবে, নাকি ধর্মীয় ও সামাজিক রক্ষণশীলতার চাপ ধীরে ধীরে জনজীবনের স্বাধীন পরিসর সংকুচিত করবে—এই প্রশ্নের উত্তরও বর্তমান সরকারকেই দিতে হবে।

‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি’ থেকে বেরিয়ে এসে কার পায়ের নিচে?: বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতিও কম বিতর্কিত নয়। সরকারের পক্ষ থেকে যদি দাবি করা হয় যে বাংলাদেশ আগের ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি’ থেকে বেরিয়ে এসেছে, তাহলে বাস্তব কূটনৈতিক অর্জন দিয়ে সেই দাবির প্রমাণ দিতে হবে।

কারণ কূটনীতিতে বড় বড় ঘোষণা নয়—ফলাফলই শেষ কথা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা স্বাধীন? ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে ঢাকা কতটা নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারছে? ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৌশল কী? চীন, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতা কতটা?

এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ‘নতজানু নীতি থেকে বেরিয়ে এসেছি’ বলা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকে। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করার বিনিময়ে বাংলাদেশ কি এমন কোনো কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, যার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দেশকেই দিতে হবে?

ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক: কূটনৈতিক সাফল্য না প্রতীকী মর্যাদার লড়াই? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একান্ত বৈঠক হবে কি না—এ নিয়ে প্রত্যাশা ও জল্পনা রয়েছে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক হওয়া বা না হওয়াই একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য-ব্যর্থতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। তবে যদি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা দিতে প্রস্তুত থাকে, অথচ বিনিময়ে শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে—দর-কষাকষির টেবিলে বাংলাদেশ আসলে কতটা শক্তিশালী?

পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের তুলনা টেনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাই রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক নয়। তবে আরও ভয়ংকর একটি সম্ভাবনার কথাও রাজনৈতিক মহলে ঘুরছে—বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ পূরণে বড় ধরনের ছাড় দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কোনো পক্ষের সঙ্গে অবস্থান পরিবর্তন করে কিংবা ইসরায়েলকে স্বীকৃতির মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।

কিন্তু সেটি বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক বিজয় হবে, নাকি এক পরাশক্তির অনুকম্পা পাওয়ার বিনিময়ে জাতীয় স্বার্থের বন্ধক রাখা, সেটিই হবে আসল প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত ভয়টা কোথায়? সব প্রশ্ন এসে শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় দাঁড়ায়। শেখ হাসিনাকে সরকার কেন এত ভয় পাবে? যদি তিনি জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাকেন, তাঁকে দেশে আসতে দিন। যদি তাঁর জনপ্রিয়তা শেষ হয়ে থাকে, তাঁকে রাজনৈতিক মাঠে নামতে দিন।

যদি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি শক্তিশালী হয়, তাঁকে দেশে এনে আইনের মুখোমুখি করুন। আর যদি সরকার মনে করে জনগণ তাঁকে আর গ্রহণ করবে না, তাহলে তাঁকে ঠেকানোর জন্য এত কূটনৈতিক তৎপরতা, এত রাজনৈতিক উদ্বেগ, এত প্রশাসনিক প্রস্তুতির প্রয়োজন কোথায়?

রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভুল হয় তখনই, যখন কোনো সরকার জনগণকে নিজের মতো করে ভাবতে শেখাতে চায়। মানুষকে ভয় দেখিয়ে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিষিদ্ধ করে কিংবা প্রশাসনিক শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে জনমত নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
শেষ কথা বলে জনগণ।

আর বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ডিসেম্বর যত এগিয়ে আসবে, ততই স্পষ্ট হবে—শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে আসল আতঙ্কটা কোথায়। এটি কি একজন নেত্রীর প্রত্যাবর্তনের ভয়? নাকি তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর সম্ভাব্য জনস্রোতের ভয়? সময়ের সঙ্গে সেই উত্তরই সবচেয়ে নির্মমভাবে প্রকাশিত হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরবেন—এই সম্ভাবনাটিই কি এখন বিএনপি সরকার, তাদের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত-এনসিপি এবং ইউনূস-পরবর্তী ক্ষমতার বলয়ের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন?

বিবিসির সাংবাদিক শুভজ্যোতি ঘোষের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অন্তত সেই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনে ভারতীয় অবস্থানের যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা হলো—বাংলাদেশ সরকার মুখে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চাইছে, কিন্তু বাস্তবে তাঁকে হাতে পাওয়ার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ নিয়ে দিল্লির সন্দেহ আছে। কারণ, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সংকট আরও তীব্র হতে পারে এবং সরকারের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

যদি এই মূল্যায়ন সত্যি হয়, তাহলে প্রশ্ন একটাই—যাঁকে পরাজিত করার দাবি করে ক্ষমতায় আসা হয়েছে, তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাবনাতেই যদি এত ভয়, তাহলে আসলে ভয়টা কিসের? শেখ হাসিনার, নাকি জনতার?

প্রত্যর্পণের দাবি, নাকি রাজনৈতিক কৌশল? বাংলাদেশ সরকার যদি সত্যিই মনে করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান এতটাই শক্তিশালী, তাহলে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করতে এত দ্বিধা কেন?

ভারতের পক্ষ থেকে যে বার্তা আসছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সারকথা—শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফিরতে চাইলে সেটিই বরং প্রত্যর্পণের চেয়ে স্বাভাবিক পথ।

অর্থাৎ, দিল্লির দৃষ্টিতে বিষয়টি কেবল প্রত্যর্পণের কূটনৈতিক ফাইল নয়; বরং শেখ হাসিনার নিজের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাবনাও বাস্তব একটি রাজনৈতিক সমীকরণ। আর এখানেই বিএনপি সরকারের অস্বস্তির জায়গাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ একজন রাজনৈতিক নেতাকে পরাজিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় তাঁকে দেশে ফিরতে দেওয়া—যদি সরকার সত্যিই বিশ্বাস করে জনগণ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবে।

কিন্তু যদি তাঁকে দেশে ফেরার আগেই রাজনৈতিকভাবে ঠেকাতে হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—সরকার কি জনসমর্থনের একটি নতুন ঢেউয়ের আশঙ্কা করছে?

‘ডিসেম্বর’ এখন শুধু একটি মাস নয়: শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষিত সময় ডিসেম্বর—এই একটি শব্দই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কাউন্টডাউন তৈরি করেছে। সরকারের সামনে এখন দুটি পথ। এক. তাঁকে দেশে ফিরতে দেওয়া এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টির মোকাবিলা করা। দুই. নানা কূটনৈতিক, প্রশাসনিক কিংবা রাজনৈতিক কৌশলে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঠেকানোর চেষ্টা করা।

দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়া হলে রাজনৈতিক বার্তাটি ভয়াবহ হতে পারে। তখন জনগণের কাছে প্রশ্ন উঠবেই—একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সরকার এতটা উদ্বিগ্ন কেন? কারণ শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে কী হবে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না। কিন্তু এটুকু বলা যায়—তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের গণ-মনস্তাত্ত্বিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস তৈরি হতে পারে। বিরোধীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়তে পারে। রাজপথে নতুন মেরুকরণ শুরু হতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
জনরোষ কি সত্যিই বাড়ছে? এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট, দ্রব্যমূল্যের চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট, চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—এসব নিয়ে মানুষের অসন্তোষ যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে যে কোনো সরকারের জন্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সরকারের সমর্থকেরা এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হলো—মানুষের রান্নাঘরের সংকটকে কোনো সরকারি প্রচার দিয়ে দীর্ঘদিন ঢেকে রাখা যায় না।

বিদ্যুৎ না থাকলে মানুষ সরকারের সাফল্যের গল্প শুনতে চায় না। গ্যাস না থাকলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে ক্ষোভ থামানো যায় না। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নাগালের বাইরে গেলে রাজনৈতিক স্লোগান মানুষের ক্ষুধা মেটায় না। আর এই অসন্তোষের সঙ্গে যদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারে।

উগ্রবাদ ও সাংস্কৃতিক পরিসর: অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো এড়ানো যাবে কতদিন? সরকার জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের কথা অস্বীকার করতে পারে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন বোমা বিস্ফোরণ, ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্টকে ঘিরে বাধা—এসব ঘটনা যদি ধারাবাহিকভাবে সামনে আসে, তাহলে সরকারের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—রাষ্ট্র কি নাগরিকের নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারছে?

নাটক-সিনেমায় প্রেমের গল্প থাকবে কি থাকবে না—এমন প্রশ্ন যদি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে, তাহলে সেটি কেবল বিনোদনের বিষয় থাকে না; সেটি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক চরিত্রের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ কি একটি মুক্ত, বহুত্ববাদী সমাজের দিকে যাবে, নাকি ধর্মীয় ও সামাজিক রক্ষণশীলতার চাপ ধীরে ধীরে জনজীবনের স্বাধীন পরিসর সংকুচিত করবে—এই প্রশ্নের উত্তরও বর্তমান সরকারকেই দিতে হবে।

‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি’ থেকে বেরিয়ে এসে কার পায়ের নিচে?: বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতিও কম বিতর্কিত নয়। সরকারের পক্ষ থেকে যদি দাবি করা হয় যে বাংলাদেশ আগের ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি’ থেকে বেরিয়ে এসেছে, তাহলে বাস্তব কূটনৈতিক অর্জন দিয়ে সেই দাবির প্রমাণ দিতে হবে।

কারণ কূটনীতিতে বড় বড় ঘোষণা নয়—ফলাফলই শেষ কথা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা স্বাধীন? ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে ঢাকা কতটা নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারছে? ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৌশল কী? চীন, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতা কতটা?

এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ‘নতজানু নীতি থেকে বেরিয়ে এসেছি’ বলা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকে। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করার বিনিময়ে বাংলাদেশ কি এমন কোনো কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, যার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দেশকেই দিতে হবে?

ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক: কূটনৈতিক সাফল্য না প্রতীকী মর্যাদার লড়াই? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একান্ত বৈঠক হবে কি না—এ নিয়ে প্রত্যাশা ও জল্পনা রয়েছে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক হওয়া বা না হওয়াই একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য-ব্যর্থতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। তবে যদি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা দিতে প্রস্তুত থাকে, অথচ বিনিময়ে শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে—দর-কষাকষির টেবিলে বাংলাদেশ আসলে কতটা শক্তিশালী?

পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের তুলনা টেনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাই রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক নয়। তবে আরও ভয়ংকর একটি সম্ভাবনার কথাও রাজনৈতিক মহলে ঘুরছে—বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ পূরণে বড় ধরনের ছাড় দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কোনো পক্ষের সঙ্গে অবস্থান পরিবর্তন করে কিংবা ইসরায়েলকে স্বীকৃতির মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।

কিন্তু সেটি বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক বিজয় হবে, নাকি এক পরাশক্তির অনুকম্পা পাওয়ার বিনিময়ে জাতীয় স্বার্থের বন্ধক রাখা, সেটিই হবে আসল প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত ভয়টা কোথায়? সব প্রশ্ন এসে শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় দাঁড়ায়। শেখ হাসিনাকে সরকার কেন এত ভয় পাবে? যদি তিনি জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাকেন, তাঁকে দেশে আসতে দিন। যদি তাঁর জনপ্রিয়তা শেষ হয়ে থাকে, তাঁকে রাজনৈতিক মাঠে নামতে দিন।

যদি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি শক্তিশালী হয়, তাঁকে দেশে এনে আইনের মুখোমুখি করুন। আর যদি সরকার মনে করে জনগণ তাঁকে আর গ্রহণ করবে না, তাহলে তাঁকে ঠেকানোর জন্য এত কূটনৈতিক তৎপরতা, এত রাজনৈতিক উদ্বেগ, এত প্রশাসনিক প্রস্তুতির প্রয়োজন কোথায়?

রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভুল হয় তখনই, যখন কোনো সরকার জনগণকে নিজের মতো করে ভাবতে শেখাতে চায়। মানুষকে ভয় দেখিয়ে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিষিদ্ধ করে কিংবা প্রশাসনিক শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে জনমত নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
শেষ কথা বলে জনগণ।

আর বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ডিসেম্বর যত এগিয়ে আসবে, ততই স্পষ্ট হবে—শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে আসল আতঙ্কটা কোথায়। এটি কি একজন নেত্রীর প্রত্যাবর্তনের ভয়? নাকি তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর সম্ভাব্য জনস্রোতের ভয়? সময়ের সঙ্গে সেই উত্তরই সবচেয়ে নির্মমভাবে প্রকাশিত হবে।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ