১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও, এই স্বাধীনতার মূল্য দিতে হয়েছিল অপরিসীম। সার্বভৌমত্ব অর্জিত হলেও দেশের অবকাঠামো ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল, অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল, আর মাসের পর মাস চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল কোটি কোটি মানুষ।
এমন এক ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়েই ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি, পাকিস্তানি বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর প্রত্যাবর্তন যেমন একদিকে ছিল দীর্ঘ সংগ্রামের সফল পরিণতি, অন্যদিকে তা সূচিত করেছিল আরেক কঠিন সংগ্রামের—যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার এক মহাযজ্ঞ।
সংঘাতে ক্ষতবিক্ষত এক দেশ
সদ্য স্বাধীন সরকারের কাঁধে যে ধ্বংসের বোঝা এসে পড়েছিল, তা ছিল নজিরবিহীন। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সরকারি হিসাব মতে, ৩০০টিরও বেশি রেলসেতু এবং ৩০০টিরও বেশি সড়কসেতু সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দেশের প্রধান সামুদ্রিক বন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবেশমুখে ২৯টি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ায় সেটি অচল হয়ে পড়ে। এমনকি যুদ্ধ শেষের পরও পিছু হটতে থাকা পাকিস্তানি বাহিনী পুরো বন্দর চ্যানেলে মাইন পুঁতে রেখেছিল, যার ফলে নৌচলাচল একদম অসম্ভব হয়ে পড়ে।
দেশের আর্থিক পরিস্থিতিও ছিল সমান ভয়াবহ। আত্মসমর্পণের ঠিক আগে, পাকিস্তানি প্রশাসন সেন্ট্রাল ব্যাংকের নগদ অর্থ ও স্বর্ণের মজুদ ধ্বংস করে দেয় বলে জানা যায়। অন্যদিকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্পপতিরা বিপুল অঙ্কের আর্থিক সম্পদ বাংলাদেশ থেকে পাচার করে নিয়ে যায়। কৃষিউৎপাদন সম্পূর্ণ ধসে পড়ে, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং যাতায়াতব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভৌত অবকাঠামোর এই ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি বাংলাদেশকে সামলাতে হচ্ছিল এক বিশাল মানবিক সংকট। লাখ লাখ শরণার্থী ও যুদ্ধগ্রস্ত পরিবারের জন্য প্রয়োজন ছিল অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ।
জরুরি অগ্রাধিকার: ত্রাণ ও পুনর্বাসন
পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে বঙ্গবন্ধু ত্রাণ ও পুনর্বাসনকে সরকারের মূল এজেন্ডা হিসেবে নির্ধারণ করেন। জনজীবনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনাই হয়ে ওঠে তৎকালীন জাতীয় অগ্রাধিকার।
মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা, এতিম শিশু এবং যুদ্ধে সব হারানো পরিবারগুলোর জন্য প্রায় ১,৬৬,০০০ ঘর তৈরির পরিকল্পনা হাতে নেয় সরকার। গৃহহীনদের আবাসন সুবিধা দিতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করতে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এই পদক্ষেপগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, জাতীয় পুনর্গঠন কেবল দালানকোঠা বা রাস্তাঘাট তৈরির বিষয় নয়—এর আসল উদ্দেশ্য মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আশা ফিরিয়ে আনা।
অর্থনীতির পুনর্জীবন
১৯৭২ সালে ঘোষিত বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছিল মূলত পুনর্গঠন কাজকে গতিশীল রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে।
খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দ দেওয়া হয় কৃষি খাতে। এছাড়া সমাজ পুনর্গঠনে অপরিহার্য ভূমিকা বিবেচনা করে শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ খাতকেও সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়।
সাধারণ মানুষের স্বস্তি দিতে এবং অর্থনীতি সচল করতে সার ও গুঁড়ো দুধের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেওয়া হয়; সেই সাথে সুতি সুতা, পানির পাম্প ও সুতি বস্ত্রের কর কমিয়ে আনা হয়। এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল কৃষি উৎপাদনে গতি আনা, শিল্প খাতকে উৎসাহিত করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে রাখা।
পরের বছর, ১৯৭৩ সালে ৪,৪৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দে বাংলাদেশ তার প্রথম ‘পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা’ গ্রহণ করে। এই পরিকল্পনায় দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের রূপরেখা নির্ধারণ এবং অর্থনীতি পুনর্গঠনের এক শক্ত কাঠামো তৈরি করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মেরামত
দেশের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সড়ক, রেলপথ, সেতু, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, তিস্তা রেলসেতু এবং ভৈরব রেলসেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো দ্রুত মেরামত করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন অপসারণ ও ডুবে থাকা জাহাজগুলো তুলে নেওয়ার জন্য ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চালানো হয়, যার ফলে আবার চালু হয় সামুদ্রিক বাণিজ্য।
এমনকি যমুনা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের ঐতিহাসিক পদক্ষেপও বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করেছিলেন—যা দেশের যোগাযোগব্যবস্থা জোরদারে সরকারের সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয় দেয়।
উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন
যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন এমন কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বিজ্ঞান, শিল্প ও কৃষির ভিত্তি মজবুত করবে।
এই সময়েই বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR), শিল্প উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) প্রতিষ্ঠিত হয়।
শিল্প খাতে উৎপাদন ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন নীতি গ্রহণ করা হয়, পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকরী মূলধন ও ইকুইটি সহায়তার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।
আজ কয়েক দশক পরও এই প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ
স্বাধীনতার প্রাথমিক দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন ছিল আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয় এবং দেশের পুনর্নির্মাণে আন্তর্জাতিক সাহায্য সুনিশ্চিত করে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলতে জাতিসংঘ বিশাল অঙ্কের আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করে, আর স্বাধীনতার পরপরই ত্রাণ ও পুনর্বাসনে ভারতের পক্ষ থেকেও আসে অভূতপূর্ব সহায়তা।
নতুন সরকারের এই সাফল্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিও আকর্ষণ করে। তৎকালীন নানামুখী সংকট সত্ত্বেও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেছিল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।
জাতি গঠনের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়
স্বাধীনতার ঠিক পরের বছরগুলো ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময়। চতুর্দিকের ধ্বংসলীলা, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, মানবিক সংকট এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মতো পাহাড়সম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন সরকার।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ত্রাণ, পুনর্গঠন, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর জোর দিয়ে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিল। অবকাঠামো নির্মাণ, সামাজিক পুনর্বাসন, নীতিগত সংস্কার ও কূটনৈতিক বিচক্ষণতার মাধ্যমে সরকার একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডকে একটি কার্যকর ও স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়।
১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশের পুনর্গঠন কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনাই নয়, এটি ছিল জাতি গঠনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি যেমন তুলে ধরে স্বাধীন দেশের শুরুর দিকের কঠিন বাস্তবতা, তেমনি উন্মোচিত করে ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি জাতির অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার অদম্য অদম্য সংগ্রামের গল্প।

