বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশাল বাজেটের হিসাব সামনে এসেছে। দেশের দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়ার এই মূল লক্ষ্য হলেও প্রকল্পটির কার্ড প্রস্তুত, জরিপ ও পরিচালনা সংক্রান্ত প্রশাসনিক খাতেই ব্যয় হতে যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। দেশের অর্থনীতিতে যখন ব্যয় সংকোচনের কথা বলা হচ্ছে, তখন একটি প্রকল্পের প্রারম্ভিক কাজেই এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ এবং প্রথম ধাপেই উপকারভোগী বাছাইয়ে অনিয়ম ওঠা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
পরিকল্পনা কমিশন ও সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘সোশ্যাল প্রটেকশন ফর ইম্প্রুভড রেজিলিয়েন্স, ইনক্লুশন অ্যান্ড টার্গেটিং’ (এসএসপিআইআরআইটি) প্রকল্পের আওতায় এই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি যুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটির মূল বাজেট ছিল ৯০৪ কোটি টাকা, কিন্তু ফ্যামিলি কার্ড যুক্ত করার কারণে এর সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ২ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন অংশের জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা।
খাতওয়ারি খরচের তথ্যে দেখা যায়, সারা দেশে তথ্য সংগ্রহের জন্য ৬০ হাজার জরিপকারী নিয়োগ, ডেটা প্রসেসিং ও এন্ট্রির জন্য ধরা হয়েছে ৬৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড প্রস্তুত ও বিতরণের জন্য চলতি অর্থবছরেই চাওয়া হয়েছে ৫৫০ কোটি টাকা। এছাড়া তথ্য সংগ্রহের সুবিধার্থে ৬৬ হাজার ৮১৫টি ট্যাব এবং ৫টি সুপার কম্পিউটার কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২২১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। মাঠপর্যায়ে তদারকির জন্য কর্মকর্তাদের ভ্রমণ ভাতা ৮ কোটি টাকা, প্রশিক্ষণ খাতে ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং সেমিনারের জন্য ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তাবিত ৫০ কোটি টাকার বাজেট। কেবল একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পেছনে এমন বিপুল অঙ্কের খরচের প্রস্তাবকে ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি’ বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, অনুষ্ঠান আয়োজনে বিপুল অর্থ অপচয় না করে তা দরিদ্র মানুষের সহায়তায় ব্যবহার করা উচিত ছিল। তবে প্রকল্প পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন দাবি করেছেন, বাজেটে ৫০ কোটি টাকা ধরা হলেও পুরো অর্থ খরচ নাও হতে পারে। প্রথম বছরে ৪১ লাখ পরিবারকে এই কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে, এত বিপুল ব্যয়ের পরও প্রকল্পটির মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক বাস্তবায়নেই অনিয়মের খবর সামনে এসেছে। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কার্ড বিতরণ শুরু হলে রাজধানী ঢাকার কড়াইল বস্তিতেই প্রকৃত অভাবগ্রস্তদের বাদ পড়ার অভিযোগ ওঠে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নিজের সংসদীয় এলাকার অন্তর্ভুক্ত এই বস্তিতে অনেক দিনমজুর ও রিকশাচালক পরিবার সুবিধা পাননি, অথচ স্থানীয়ভাবে সচ্ছল ও বাড়ির মালিকরা ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন।
চলতি অর্থবছরে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকার থোক বরাদ্দ থেকে ১ হাজার ৫১১ কোটি টাকা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। চলতি আগস্ট মাসের মধ্যেই দেশের ৬টি বিভাগে জরিপ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও বিশাল বাজেট ও প্রাথমিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশাসনিক ও সচেতন মহলে বড় ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পটি বাস্তবে দরিদ্র পরিবারের সহায়তায় নয়, বরং একটি বিশাল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। মূল বাজেট ৯০৪ কোটি থেকে বেড়ে ২ হাজার ৮১৩ কোটি টাকায় পৌঁছানো এবং এর মধ্যে শুধু জরিপ, কার্ড তৈরি, ট্যাব-সুপার কম্পিউটার কেনাকাটা ও অনুষ্ঠানের পেছনে প্রায় ১৯০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ—এটিই প্রমাণ করে যে প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থ উপকারভোগীদের কাছে না গিয়ে মধ্যবর্তী স্তরেই খরচ হয়ে যাবে।
৬০ হাজার জরিপকারী নিয়োগ, শত শত কোটি টাকার ডিভাইস কেনাকাটা এবং একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য ৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব—এসবই ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি’ ধরনের ব্যয়। যখন দেশের অর্থনীতিতে ব্যয় সংকোচনের কথা বলা হচ্ছে, তখন এ ধরনের বিপুল প্রশাসনিক খরচ জনগণের অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। কড়াইল বস্তির মতো প্রধানমন্ত্রীর নিজ এলাকাতেই প্রকৃত দরিদ্ররা বাদ পড়ে সচ্ছলরা কার্ড পাওয়ার অভিযোগ ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে টার্গেটিং প্রক্রিয়ায় অনিয়ম শুরু হয়ে গেছে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই ফ্যামিলি কার্ড এটি শুধু একটি ব্যয়বহুল রাজনৈতিক প্রকল্প হয়েই থাকবে—যেখানে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নামে ব্যবসা চলবে, কিন্তু দরিদ্র পরিবারের উপকার সীমিতই থাকবে।

