জুলাই আন্দোলন ঘিরে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্তে যা বেরিয়ে আসছে, সেটা এখন সিরিয়াসলি ভাবার মতো একটা বিষয়। পুলিশের নিজস্ব চূড়ান্ত প্রতিবেদনেই স্বীকার করা হচ্ছে যে অনেক মামলায় যাকে নিহত বলে দেখানো হয়েছিল সে আসলে জীবিত, কেউ বিদেশে শ্রমিকের কাজ করছে, কারো মৃত্যুসনদ জাল বলে প্রমাণিত হয়েছে। বাদীর হদিস নেই কোথাও কোথাও, কারো মোবাইল নম্বর ভুয়া, কারো নাম-পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কেউ মামলা করেছে বলে খোদ সেই বাদীই আদালতে গিয়ে বলছেন। এসব তো ছোটখাটো টেকনিক্যাল ভুল নয়, এগুলো একেবারে পরিকল্পিতভাবে সাজানো মিথ্যা মামলার প্রমাণ।
আর এই মিথ্যা মামলাগুলোই হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার হাতিয়ার। একটা মামলায় শত শত, কোথাও হাজারের বেশি মানুষকে আসামি করার এই যে প্যাটার্ন, এটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিচার চাওয়ার প্রক্রিয়া না। এটা একটা সংগঠিত খেলা, যেখানে ঘটনার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই এমন মানুষকেও আসামি বানানো হচ্ছে, পাবনার ট্রাকচালক চাচা-ভাতিজার মতো মানুষ যারা জীবনেও শোনেননি বাদী বা কথিত নিহতের নাম। এই ঢালাও মামলার সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানো হচ্ছে, জমি-বিরোধ মেটানো হচ্ছে, ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীকে ফাঁসানো হচ্ছে, আর এই পুরো প্রক্রিয়ার আড়ালে টার্গেট করা হচ্ছে একটামাত্র রাজনৈতিক দলকে।
এই মিথ্যা মামলার ভিত্তিতেই একটা গোটা রাজনৈতিক দলের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনকে সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে নিষিদ্ধ করে ফেলা হয়েছে, দলটার কার্যক্রমই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ যে মামলাগুলোর ভিত্তিতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর একটা বড় অংশই তদন্তে ধরা পড়ছে মিথ্যা, সাজানো, ভুয়া বাদী আর ভুয়া নিহতের গল্প দিয়ে বানানো। এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা না। যখন একটা দলের নেতাকর্মী, সমর্থক, এমনকি তাদের সঙ্গে দূরতম সম্পর্কও নেই এমন মানুষকে টার্গেট করে হাজার হাজার মামলা দেওয়া হয়, আর তার একটা বড় অংশ তদন্তেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক যে আসল উদ্দেশ্যটা বিচার নাকি প্রতিহিংসা।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, যারা এই মিথ্যা মামলা সাজাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না। আইনে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় মিথ্যা ফৌজদারি অভিযোগ দায়েরকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে এই ধারা প্রয়োগের কোনো নজিরই নেই বললে চলে। যে ভুয়া বাদী, যে চক্র মিথ্যা মৃত্যুসনদ বানিয়ে মামলা সাজাচ্ছে, তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ সাংবাদিকতা করছে, কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছে, অথচ যাদের বিরুদ্ধে ভুয়া মামলা হয়েছে তাদের জীবন থমকে গেছে, হয়রানির শিকার হতে হয়েছে, সমাজে হেয় হতে হয়েছে। এই একতরফা ব্যবস্থাটাই বলে দেয় গোটা প্রক্রিয়াটা কতটা পক্ষপাতমূলক।

