বাংলাদেশের কৃষির ভিত্তি কেবল অর্থনীতির কোনো সাধারণ খাত নয়—এটি কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তির মূল স্তম্ভ। কিন্তু যে কৃষকের রক্ত-ঘামে সচল থাকে এই বদ্বীপের অর্থনীতি, সেই কৃষকের হাতেই যদি ফসল উৎপাদনের এই সংকটময় সময়ে সময়মতো সার না পৌঁছায়, তবে তা কেবল একটি পণ্য সংকট থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে গোটা জাতির বেঁচে থাকার ওপর এক সরাসরি আঘাত। বর্তমান অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক সরকারের আমলে সৃষ্ট তীব্র সার সংকট আজ সেই নির্মম বাস্তবতাই জাতির সামনে উন্মোচন করেছে।
ডিলারের গুদামে তালা, কৃষকের বুকফাটা কান্না-সরকারের নিস্পৃহ তামাশাঃ আজকের বাস্তবতা এক নির্মম পরিহাস ও প্রহসনে পরিণত হয়েছে। একদিকে অবৈধ ও জনবিচ্ছিন্ন সরকারের মন্ত্রী-আমলারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে প্রেস ব্রিফিংয়ে গলা ফাটিয়ে দাবি করছেন—দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই, পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। অন্যদিকে মাঠের নির্মম চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।
দ্য ডেইলি স্টার-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফসল উৎপাদনের এই সংকটময় সময়ে জেলার পর জেলায় কৃষকেরা ডিলারের কাছে সার না পেয়ে চরমভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ডিলারদের কারসাজিতে খোলাবাজারে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা সারে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। প্রশ্ন আজ একটাই—গুদামে যদি সত্যিই সার থাকে, তবে কৃষকের মাঠে কেন এই হাহাকার?
রাজপথে কৃষকের বিক্ষুব্ধ স্লোগান-গত ছয় মাসের রক্তক্ষয়ী ক্ষোভঃ সংকট যখন চরমে পৌঁছেছে, তখন কৃষকের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সার সংকটকে কেন্দ্র করে যে নজিরবিহীন জনরোষ ও সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, তার অসংখ্য ঘটনার মাঝে কিছু চিত্র নিচে তুলে ধরা হলোঃ
১. কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে গুদাম ভাঙচুর ও সার লুট (২৩ আগস্ট): দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সার না পেয়ে দুই শতাধিক ক্ষুব্ধ কৃষক ধৈর্যের বাঁধ হারিয়ে ডিলারের গুদামে জোরপূর্বক প্রবেশ করেন এবং প্রায় ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান। পরে অনিয়মের প্রমাণ মেলায় ওই ডিলারের ডিলারশিপ বাতিলের সুপারিশ করা হয়।
২. কুড়িগ্রামের রৌমারীতে গুদামের দরজা ভাঙচুর (৭ সেপ্টেম্বর): রৌমারী উপজেলায় ফসল উৎপাদনের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সার না পাওয়ার চরম ক্ষোভে কৃষকেরা একটি ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে জোরপূর্বক সার সংগ্রহ করতে বাধ্য হন।
৩. কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে নতুন কৃষক বিদ্রোহ ও মামলা-হয়রানি (৭ সেপ্টেম্বর): বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের শহীদ মোড়ে চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে এবং ডিলারের স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির প্রতিবাদে শত শত কৃষক সড়ক অবরোধ করেন। বিক্ষুব্ধ জনতার একাংশ কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হলেও, এই ন্যায্য আন্দোলনের সুরাহা না করে উল্টো কৃষি কর্মকর্তার দায়ের করা মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অর্ধশত অজ্ঞাত কৃষককে আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে গ্রেপ্তার আতঙ্কে পুরো গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে এবং সাধারণ কৃষকরা রাতে বাড়ি ছেড়ে ঝোপঝাড়ে বা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
৪. লালমনিরহাটে মহাসড়ক অবরোধ ও ডিলার অবরুদ্ধ (৬–৭ সেপ্টেম্বর): সার সরবরাহে ঘাটতি ও সিন্ডিকেটের কৃত্রিম সংকটের প্রতিবাদে কৃষকেরা লালমনিরহাট–বুড়িমারী এবং রংপুর–কুড়িগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ কৃষকরা এক সার ডিলারকে প্রায় এক ঘণ্টা তার দোকানের ভেতর অবরুদ্ধ করে রাখেন।
৫. রাজশাহীর পুঠিয়ায় মহাসড়ক অবরোধ (৭ সেপ্টেম্বর): ডিলারের কাছে সরকারি দামে সার না পেয়ে এবং খুচরা বাজারে চড়া দামে সার বিক্রির অভিযোগে প্রায় তিনশ কৃষক ঢাকা–রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
৬. চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে বিক্ষোভ (আগস্ট): রাজশাহী অঞ্চলের নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ডিলারদের কারসাজিতে সরকারি দামে সার না পাওয়ার ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে গোমস্তাপুরে কৃষকেরা তীব্র বিক্ষোভ করেন।
৭. যশোরের অপর্যাপ্ত ও বিলম্বিত সরবরাহ (জুলাই–আগস্ট): পরিবহন সংকটের অজুহাতে জুলাইয়ে ২৯৭ টন এবং আগস্টের ৮২০ টন এমওপি (MOP) সার সময়মতো কৃষক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে উৎপাদনে কৃষকদের বাধ্য হয়ে চড়া দামে সার কিনতে হয়।
৮. গাজীপুর ও নরসিংদীতে বরাদ্দের বড় ব্যবধান (আগস্ট): কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে প্রকৃত বিতরণ ছিল অত্যন্ত কম। গাজীপুরে ১,৮৭৬ টন বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ হয় মাত্র ৮০০ টন এবং নরসিংদীতে ২,৫৫৩ টনের বিপরীতে মাত্র ৯১৯ টন।
যে কৃষক সারা জীবন মাঠে রোদে পুড়ে সোনার ফসল ফলান, আজ নিজের পেটের ভাত জোগাড়ের উপায়ে সারটুকু পাওয়ার জন্য তাকে কেন পুলিশের লাঠির সামনে বা মহাসড়কে দাঁড়াতে হবে? এই ক্ষোভ কেবল এক মুঠো সারের ঘাটতি নয়; সেটি একটি অবৈধ, অনির্বাচিত ও জনবিচ্ছিন্ন সরকারের ওপর পুঞ্জীভূত অনাস্থার চরম বিস্ফোরণ।
সার নিয়ে বুলেট ও লাঠিপেটা-বিএনপি আমলের রক্তস্নাত ইতিহাসঃ বর্তমান সরকারের ব্যর্থতার বিপরীতে যদি আমরা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলের দিকে তাকাই, তবে সেখানে দেখতে পাই সারের জন্য কৃষকের রক্ত ঝরার বীভৎস ইতিহাস। ১৯৯৫ সালে বিএনপি সরকারের আমলে সার সংকটের প্রতিবাদ করায় বাংলার বুকে নিরীহ কৃষকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ১৮ জন কৃষককে হত্যা করা হয়েছিল। সারের দাবিতে মিছিলে যাওয়ার অপরাধে কৃষকের বুক চিরে বুলেট চালিয়েছিল তৎকালীন প্রশাসন। এছাড়া ২০০১–২০০৬ সালের শাসনামলেও সার ও বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলন করায় কৃষকদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। বিএনপির সেই পুরো যুগটাই ছিল সার সিন্ডিকেট, হাওয়া ভবন লুটপাট এবং কৃষকদের ওপর দমন-পীড়নের এক অন্ধকার অধ্যায়।
আজ সবার মুখেই একটাই আক্ষেপ-কোথায় গেল কৃষকের মুখে হাসির সেই দিনগুলোঃ এর সম্পূর্ণ বিপরীত সোনালী অধ্যায় রচিত হয়েছিল জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, যেখানে কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো হয়েছিল। মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খুলে সরাসরি ভর্তুকি প্রদান, হাজার হাজার কোটি টাকার রেকর্ড ভর্তুকি এবং সেচ ও বিদ্যুতে বিশাল ছাড়ের সুবাদে বাংলাদেশ খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছিল। অথচ আজকের অবৈধ প্রশাসনের খামখেয়ালিপনায় সেই কৃষিবান্ধব অর্জন আজ ধ্বংসের মুখে। আজ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে কেবল সেই দিনগুলোর কথাই ফিরে আসে—কোথায় হারিয়ে গেল কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো সেই সোনালী দিনগুলো!
লুটেরা সিন্ডিকেটের থাবা ও মূল্যস্ফীতির অভিশাপ-গ্রামীণ অর্থনীতি ধ্বংসের পাঁয়তারাঃ আজকের অবৈধ সরকারের আমলে এসে সেই অর্জিত সাফল্য আজ ধূলিসাৎ হতে বসেছে। রাষ্ট্রের কাজ কেবল বিদেশ থেকে সার আমদানি করে গুদাম ভর্তি করা নয়; বরং সঠিক সময়ে, সঠিক মূল্যে, প্রকৃত কৃষকের দোরগোড়ায় তা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু বর্তমান অবৈধ সরকার ও তাদের তোষণকারী সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে।
সারের এই কৃত্রিম সংকট কেবল কৃষকের পকেটই কাটছে না, বরং এটি গোটা জাতীয় অর্থনীতিকে এক গভীর খাদের কিনারায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। অতিরিক্ত দামে সার কিনে ফসল ফলানোর বাড়তি খরচ কৃষকের মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে দিচ্ছে। সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারায় আসন্ন সময়ে যে নিশ্চিত ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার এই নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত চালসহ নিত্যপণ্যের বাজারকে এক অসহনীয় অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেবে এবং রেকর্ড পরিমাণ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি অচল করে তুলবে—যার দায় বর্তমান অদক্ষ ও অবৈধ প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
আর নয় অবহেলা-কৃষকের হাহাকারে জবাবদিহিতার কাঠগড়াঃ আজকের এই তীব্র সার সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি অবৈধ ও অদক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনার একটি অনিবার্য পরিণতি। কৃষকের চোখে সরকারের সফলতা কোনো সাজানো প্রেস ব্রিফিংয়ের বুলি নয়; সফলতা হলো জমিতে সময়মতো ন্যায্য মূল্যে সার পাওয়া এবং নির্বিঘ্নে ফসল ঘরে তোলা।
এটি স্পষ্ট যে, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচে। কিন্তু আজকের অবৈধ ক্ষমতার মোহে অন্ধ থাকা এই সরকার কৃষকের কান্না শোনার সময় রাখে না। কুড়িগ্রাম বা লালমনিরহাটের রাজপথে কৃষকের যে ক্ষোভ আজ আগুন হয়ে জ্বলে উঠেছে, তা কোনোভাবেই দমিয়ে রাখা যাবে না। সার না পেয়ে প্রতিবাদ করা কৃষকদের ওপর পুলিশের মামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক আর গ্রামগুলোকে পুরুষশূন্য করে তোলার এই দমনপীড়ন নীতি কোনো কল্যাণকামী রাষ্ট্রের লক্ষণ হতে পারে না। বিএনপির আমলের মতো কৃষক হত্যার ইতিহাস কিংবা বর্তমানের এই ব্যর্থ সিন্ডিকেটের কারসাজি ও গায়েবি মামলার হয়রানি—কোনোটিই এ দেশের সচেতন কৃষক সমাজ মেনে নেবে না।
গুদামের কৃত্রিম ও ভুয়া হিসাব দিয়ে পার পাওয়ার দিন শেষ। “সার আছে, কিন্তু কৃষক পাচ্ছে না—সংকটের প্রতিবাদ করলেই গায়েবি মামলা আর পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।” কৃষকের পেটে লাথি মেরে ও গায়েবি মামলার ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা এই ব্যর্থ ও অবৈধ সরকারকে মাঠের বাস্তব জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতেই হবে।

