শুরুতে সংখ্যাটা দিয়েই বলি। ছয় মাস, ছয়টি মাজারে হামলা, একজন নিহত, নারীসহ অন্তত দশজন আহত। সংখ্যাগুলো শুনতে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটা করে পরিবার আছে, একটা করে সম্প্রদায় আছে, যাদের কাছে ওরস মানে শুধু উৎসব নয়, বেঁচে থাকার একটা সংস্কৃতি। আর সেই সংস্কৃতির ওপর যখন বারবার হামলা হয়, রাষ্ট্র তখন চুপ করে থাকে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম বাবাকে যেভাবে হত্যা করা হলো, তা নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল মানুষ দরবারে ভাঙচুর চালাল, আগুন দিল, একজন পীরকে খুন করে ফেলল, আর এই ঘটনার মামলায় নাম এলো জামায়াতে ইসলামী আর খেলাফত মজলিসের নেতাকর্মীদের। এটা কাকতালীয় নয়। বছরের পর বছর ধরে এই দুই সংগঠন সুফি ধারার বিরুদ্ধে যে আদর্শিক অবস্থান নিয়ে চলেছে, মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন এখন লাশ হয়ে ফিরছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কোথায়? ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলো, ইউনূস সাহেবের নেতৃত্বে যে সরকার নিজেদের বৈষম্যবিরোধী, অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কারিগর দাবি করল, তাদের হাত ধরেই তো দেশে ৯৭টি মাজার হামলার প্রমাণ মিলল। ষোলো মাসের বেশি সময় ক্ষমতায় থেকেও একটা কার্যকর সুরক্ষা কাঠামো দাঁড় করাতে পারল না তারা। মুখে সংস্কারের বুলি, বাস্তবে সুফি ধারার মানুষগুলো একের পর এক আক্রান্ত হয়েছে, আর সরকার সেটাকে আইনশৃঙ্খলার সাধারণ বিষয় বলে এড়িয়ে গেছে।
এরপর ক্ষমতায় এলো বিএনপি। প্রত্যাশা ছিল, অন্তত এবার বদলাবে চিত্রটা। কিন্তু ছয় মাসে ছয়টা হামলা, তার মধ্যে মাত্র দুটোতে মামলা, সাতজন গ্রেপ্তার, বাকি সব আক্রমণের হোতারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাকামের প্রতিবেদন স্পষ্ট বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত মাজার-দরগাহকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই। যে সরকার ক্ষমতায় বসেই সবার আগে আইনের শাসন আর সবার জন্য নিরাপদ বাংলাদেশের কথা বলেছিল, তাদের আমলেই সুফি সাধকের নিথর দেহ পড়ে থাকল একটা দরবারের উঠানে।
জামায়াতে ইসলামী আর খেলাফত মজলিসের অবস্থানটা আরও স্পষ্ট। এরা বহুদিন ধরে মাজারকেন্দ্রিক ধর্মচর্চাকে বিদআত আখ্যা দিয়ে এসেছে, ওরস-উৎসবকে ইসলামবিরোধী বলে প্রচার চালিয়েছে। এখন সেই বয়ান হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে কর্মীদের, আর প্রশাসন সেটা দেখেও না দেখার ভান করছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একটা মানুষকে পুড়িয়ে মারা, এটা কোনো ধর্মীয় উদ্যোগ নয়, এটা পরিকল্পিত সন্ত্রাস। অথচ এই সংগঠনগুলোই এখন রাজনীতির মাঠে নিজেদের ধর্মের রক্ষক হিসেবে জাহির করে বেড়াচ্ছে।
মাকামের হিসাব বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত মোট ১০৩টি হামলার প্রমাণ মিলেছে। সংখ্যাটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু কমা মানে তো সমাধান নয়। একটা রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিকের ধর্মচর্চার অধিকার রক্ষা করতে পারে না, বিচার নিশ্চিত করতে পারে না, ক্ষতিপূরণ দিতে গড়িমসি করে, তখন সেই ব্যর্থতার দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই, না ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের, না এখনকার বিএনপি সরকারের, আর অবশ্যই না জামায়াত-খেলাফত মজলিসের মতো সংগঠনগুলোর, যাদের নাম বারবার এসব হামলার মামলায় উঠে আসছে।
এখন প্রশ্ন হলো, সরকার আর এই দলগুলো নিজেদের পক্ষে যুক্তি দেবে অবশ্যই। বলবে, মামলা চলমান, তদন্ত শেষ হয়নি, সাতজন গ্রেপ্তার হয়েছে সেটাও তো একটা অগ্রগতি। কিন্তু এই যুক্তিগুলো তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন বিচারপ্রক্রিয়া সত্যিই স্বচ্ছ ও দ্রুত হবে, আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো অন্তত একটা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাবে। তার আগ পর্যন্ত সংখ্যাগুলো শুধু সংখ্যাই থেকে যাবে, আর মাজারের উঠানে ঝরা রক্ত শুকিয়ে যাবে বিচারহীনতার ধুলোর নিচে পদদলিত হয়ে।

