আওয়ামী লীগ খুব শিগগির সগৌরবে ফিরে আসবে

এম নজরুল ইসলাম
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তাঁর পরিবারের অন্তসত্ত্বা গৃহবধূ, ছোট্ট শিশু কাউকে রেহাই দেওয়া হয়নি। ঢাকার রাস্তায় ট্যাংক দাপিয়ে বেড়ায়। রাতভর কার্ফ্যু চলতে থাকে। সারা দেশে সেনাবাহিনী নামানো হয়। আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়, বন্দী করা হয়। নিষ্ঠুরতা আর পৈশাচিকতা দেখে দেশের মানুষ স্তম্ভিত হয়ে যায়। দেশব্যাপী এমন এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয়, যাতে মানুষ বঙ্গবন্ধুর নাম, আওয়ামী লীগের নাম মুখে আনতেও ভয় পেত।

‘জয়বাংলা’ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। পত্রপত্রিকা বঙ্গবন্ধুর ছবি ছাপানো দূরে থাক, তাঁর নাম নিয়ে একটি বাক্য লেখারও সাহস পেত না। তখন কি কেউ ভেবেছিল, এই বাংলাদেশে আবারও আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে? আওয়ামী লীগ আবার এ দেশে রাজনীতি করবে এবং ক্ষমতায় আসবে? না, কেউ ভাবেনি। কারণ, ভাবার মতো পরিস্থিতি তখন ছিল না। কিন্তু সত্য হলো, ষড়যন্ত্রের আয়ু দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মীরজাফরের হয়নি, মোশতাকের হয়নি, ইঊনূসেরও হয়নি। পচাত্তর থেকে আজ পর্যন্ত এ দেশে আওয়ামী লীগ নিধনের অপচেষ্টা অনেক হয়েছে। আর এর প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। তারা বুঝতে চায় না, আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল, ষড়যন্ত্র সহিংসতা দিয়ে তাকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়।

আওয়ামী লীগ আদর্শের রাজনীতি করে। বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষ্যে রাজনীতি করে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য রাজনীতি করে। তাই কোনো ষড়যন্ত্র আওয়ামী লীগকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। পারবেও না। পাকিস্তানে আইয়ুব-ইয়াহিয়ারা পারেনি। পঁচাত্তরের পর মোশতাক-জিয়া গং পারেনি। চব্বিশের ষড়যন্ত্রকারীরাও পারবে না।

বাস্তব সত্য এই যে পঁচাত্তর-পরবর্তী সেই কঠিন সময় থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ২১ বছর পর মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ১৯৯৬ সালে আবারও বাংলাদেশের ক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ। একই সঙ্গে ফিরে আসে মুক্তিযুদ্ধের নির্বাসিত অর্জনগুলো। আবারও শুরু হয়, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলা। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরাও পিছু ছাড়েনি। জঙ্গিদের নামিয়ে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলতে থাকে।

২০০১ সালের নির্বাচনে পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে দেওয়া হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় বসেই আওয়ামী লীগ নিধন শুরু করে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে এই জোট হেরে যাবে বুঝতে পেরে শুরু হয় নতুন এক ষড়যন্ত্র, যা এক/এগারো নামে পরিচিত। আসে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেখানেও ইঊনূস ছিল এবং রাজনৈতিক দল বানাতে গিয়েছিল। পারেনি। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে জনগণ আবার রাস্তায় নেমে আসে। তুমুল গণ-আন্দোলনের মুখে তারা বাধ্য হয় ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন দিতে। সেই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিজয়ী হয়।

এরপর বাংলাদেশের ইতিহাস শুধুই এগিয়ে চলার ইতিহাস। ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিদ্যুতের দাবিতে মানুষ আন্দোলন করায় গুলি চালানো হয়েছিল, ২০ জনের প্রাণ গিয়েছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল মাত্র ১৬০০ মেগাওয়াট। পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা হয় চার হাজার ২০০ মেগাওয়াট। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট ও এক-এগারোর অবৈধ সরকারের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন না বেড়ে বরং আরো কমে যায়।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে তখন বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো তিন হাজার মেগাওয়াটেরও কম। ১৬ বছরে আওয়ামী লীগের সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে যায় ২৫ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ হাবের কাজ শেষ পর্যায়ে ছিল। সব মিলিয়ে সক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হতো। বঙ্গোপসাগরে বিপুল সমুদ্রসীমা অর্জিত হয়েছে। প্রমত্তা পদ্মার ওপর সেতু হবে, এটা কেউ কল্পনাও করেনি।

বিশ্বব্যাংকের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে নিজস্ব অর্থায়নে আওয়ামী লীগের সরকার সেই সেতু তৈরি করতে সক্ষম হয়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াত সুগম হয়। কর্ণফুলী নদীর নিচে দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল নির্মাণ করা হয়। যানজটে প্রায় অচল হয়ে পড়া ঢাকার রাস্তায় গতি আনতে মেট্রোরেল করা হয়। একাধিক এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করা হয়। একইভাবে চট্টগ্রামেও করা হয় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। বৈদেশিক বাণিজ্যে গতি আনতে পায়রা সমুদ্রবন্দর তৈরি করা হয়।

বন্দরঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিও চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপন করা হয়। ফলে সারা পৃথিবীর সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগ অনেক সহজ ও সাবলীল হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল করায় বিমানবন্দরের সক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। জাতীয় মহাসড়কগুলো আট লেন করাসহ ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে এই ১৬ বছরে। এমনি আরো অনেক উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে। মাথাপিছু আয় ৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ২৮০০ ডলার ছাড়িয়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সারা পৃথিবী বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল আখ্যায়িত করেছিল। ‘এশিয়ার উদীয়মান বাঘ’ আখ্যায়িত করা হয়েছিল। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করে।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়। চক্রান্তকারীরা সেই দেশটিকে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। নতুন বিনিয়োগ নাই। চালু কারখানাগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গ্যাসের অভাবে কারখানার উৎপাদন কমে যাচ্ছে। লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন। খেতে না পেয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ বহু মানুষ আত্মহত্যা করছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। সকল সূচকে বাংলাদেশ কেবলই পিছিয়ে যাচ্ছে। অথচ, চক্রান্তকারীরা দুই হাতে দেশকে লুটেপুটে খাচ্ছে। বিদেশে অর্থপাচার বেড়ে গেছে।

মেটিকুলাসলি ডিজাইন’ করা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করায় কি কোনো অপরাধ আছে? পুলিশের কাছে যে গুলি নাই স্নাইপার রাইফেলের সেই গুলি দিয়ে মানুষ হত্যা করে মানুষকে উত্তেজিত করায় কি কোনো দোষ আছে? পুলিশ বাহিনীর সাড়ে তিন হাজার সদস্যকে হত্যা করা কি কোনো অপরাধ? দেশ বিক্রির অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় আসা এবং ক্ষমতায় এসে গোপন চুক্তির মাধ্যমে অঙ্গীকার রক্ষা করছে যারা, তাদেরও কোনো দোষ হয় না।

মানবাধিকার ব্যবসায়ীরা আজ কোথায়? এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। নদী-খাল-বিল, মাঠ, বনবাদারে শত শত নেতাকর্মীর লাশ পাওয়া যাচ্ছে। সহায়-সম্পদ বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। চাঁদা না দিলে মারধর করা হচ্ছে, বাড়িঘরে হামলা-লুটপাট করা হচ্ছে, আগুন দেওয়া হচ্ছে। মধ্যরাতে সংখ্যালঘুদের ঘরে শিকল আটকে আগুন দেওয়া হচ্ছে। মিথ্যা অপবাদে পিটিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছে। ভীতি ছড়িয়ে তাদের দেশছাড়া করতে চাইছে। মানবাধিকার ব্যবসায়ীরা আজ মুখে কুলুপ এটে বসে আছে। তাদের টু শব্দটিও নেই।

আওয়ামী লীগের রাজনীতির বয়স সাড়ে সাত দশকেরও বেশি। এই দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগকে বহু চড়াই-উৎরাই পার করে আসতে হয়েছে। পচাত্তরের পর থেকে বারবার বিএনপি-জামায়াতের ‘আওয়ামী লীগ নিধন অভিযান’ মোকাবিলা করতে হয়েছে। গণমানুষের ভালোবাসায় সব বাধা-বিপত্তি মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগ এগিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে যাবে। ষড়যন্ত্রের বর্তমান কালো ছায়া কেটে যেতেও সময় লাগবে না। খুব শিগগির আওয়ামী লীগ আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে সগৌরবে ফিরে আসবে।

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক

এম নজরুল ইসলাম
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তাঁর পরিবারের অন্তসত্ত্বা গৃহবধূ, ছোট্ট শিশু কাউকে রেহাই দেওয়া হয়নি। ঢাকার রাস্তায় ট্যাংক দাপিয়ে বেড়ায়। রাতভর কার্ফ্যু চলতে থাকে। সারা দেশে সেনাবাহিনী নামানো হয়। আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়, বন্দী করা হয়। নিষ্ঠুরতা আর পৈশাচিকতা দেখে দেশের মানুষ স্তম্ভিত হয়ে যায়। দেশব্যাপী এমন এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয়, যাতে মানুষ বঙ্গবন্ধুর নাম, আওয়ামী লীগের নাম মুখে আনতেও ভয় পেত।

‘জয়বাংলা’ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। পত্রপত্রিকা বঙ্গবন্ধুর ছবি ছাপানো দূরে থাক, তাঁর নাম নিয়ে একটি বাক্য লেখারও সাহস পেত না। তখন কি কেউ ভেবেছিল, এই বাংলাদেশে আবারও আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে? আওয়ামী লীগ আবার এ দেশে রাজনীতি করবে এবং ক্ষমতায় আসবে? না, কেউ ভাবেনি। কারণ, ভাবার মতো পরিস্থিতি তখন ছিল না। কিন্তু সত্য হলো, ষড়যন্ত্রের আয়ু দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মীরজাফরের হয়নি, মোশতাকের হয়নি, ইঊনূসেরও হয়নি। পচাত্তর থেকে আজ পর্যন্ত এ দেশে আওয়ামী লীগ নিধনের অপচেষ্টা অনেক হয়েছে। আর এর প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। তারা বুঝতে চায় না, আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল, ষড়যন্ত্র সহিংসতা দিয়ে তাকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়।

আওয়ামী লীগ আদর্শের রাজনীতি করে। বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষ্যে রাজনীতি করে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য রাজনীতি করে। তাই কোনো ষড়যন্ত্র আওয়ামী লীগকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। পারবেও না। পাকিস্তানে আইয়ুব-ইয়াহিয়ারা পারেনি। পঁচাত্তরের পর মোশতাক-জিয়া গং পারেনি। চব্বিশের ষড়যন্ত্রকারীরাও পারবে না।

বাস্তব সত্য এই যে পঁচাত্তর-পরবর্তী সেই কঠিন সময় থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ২১ বছর পর মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ১৯৯৬ সালে আবারও বাংলাদেশের ক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ। একই সঙ্গে ফিরে আসে মুক্তিযুদ্ধের নির্বাসিত অর্জনগুলো। আবারও শুরু হয়, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলা। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরাও পিছু ছাড়েনি। জঙ্গিদের নামিয়ে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলতে থাকে।

২০০১ সালের নির্বাচনে পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে দেওয়া হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় বসেই আওয়ামী লীগ নিধন শুরু করে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে এই জোট হেরে যাবে বুঝতে পেরে শুরু হয় নতুন এক ষড়যন্ত্র, যা এক/এগারো নামে পরিচিত। আসে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেখানেও ইঊনূস ছিল এবং রাজনৈতিক দল বানাতে গিয়েছিল। পারেনি। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে জনগণ আবার রাস্তায় নেমে আসে। তুমুল গণ-আন্দোলনের মুখে তারা বাধ্য হয় ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন দিতে। সেই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিজয়ী হয়।

এরপর বাংলাদেশের ইতিহাস শুধুই এগিয়ে চলার ইতিহাস। ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিদ্যুতের দাবিতে মানুষ আন্দোলন করায় গুলি চালানো হয়েছিল, ২০ জনের প্রাণ গিয়েছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল মাত্র ১৬০০ মেগাওয়াট। পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা হয় চার হাজার ২০০ মেগাওয়াট। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট ও এক-এগারোর অবৈধ সরকারের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন না বেড়ে বরং আরো কমে যায়।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে তখন বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো তিন হাজার মেগাওয়াটেরও কম। ১৬ বছরে আওয়ামী লীগের সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে যায় ২৫ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ হাবের কাজ শেষ পর্যায়ে ছিল। সব মিলিয়ে সক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হতো। বঙ্গোপসাগরে বিপুল সমুদ্রসীমা অর্জিত হয়েছে। প্রমত্তা পদ্মার ওপর সেতু হবে, এটা কেউ কল্পনাও করেনি।

বিশ্বব্যাংকের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে নিজস্ব অর্থায়নে আওয়ামী লীগের সরকার সেই সেতু তৈরি করতে সক্ষম হয়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াত সুগম হয়। কর্ণফুলী নদীর নিচে দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল নির্মাণ করা হয়। যানজটে প্রায় অচল হয়ে পড়া ঢাকার রাস্তায় গতি আনতে মেট্রোরেল করা হয়। একাধিক এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করা হয়। একইভাবে চট্টগ্রামেও করা হয় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। বৈদেশিক বাণিজ্যে গতি আনতে পায়রা সমুদ্রবন্দর তৈরি করা হয়।

বন্দরঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিও চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপন করা হয়। ফলে সারা পৃথিবীর সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগ অনেক সহজ ও সাবলীল হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল করায় বিমানবন্দরের সক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। জাতীয় মহাসড়কগুলো আট লেন করাসহ ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে এই ১৬ বছরে। এমনি আরো অনেক উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে। মাথাপিছু আয় ৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ২৮০০ ডলার ছাড়িয়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সারা পৃথিবী বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল আখ্যায়িত করেছিল। ‘এশিয়ার উদীয়মান বাঘ’ আখ্যায়িত করা হয়েছিল। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করে।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়। চক্রান্তকারীরা সেই দেশটিকে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। নতুন বিনিয়োগ নাই। চালু কারখানাগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গ্যাসের অভাবে কারখানার উৎপাদন কমে যাচ্ছে। লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন। খেতে না পেয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ বহু মানুষ আত্মহত্যা করছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। সকল সূচকে বাংলাদেশ কেবলই পিছিয়ে যাচ্ছে। অথচ, চক্রান্তকারীরা দুই হাতে দেশকে লুটেপুটে খাচ্ছে। বিদেশে অর্থপাচার বেড়ে গেছে।

মেটিকুলাসলি ডিজাইন’ করা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করায় কি কোনো অপরাধ আছে? পুলিশের কাছে যে গুলি নাই স্নাইপার রাইফেলের সেই গুলি দিয়ে মানুষ হত্যা করে মানুষকে উত্তেজিত করায় কি কোনো দোষ আছে? পুলিশ বাহিনীর সাড়ে তিন হাজার সদস্যকে হত্যা করা কি কোনো অপরাধ? দেশ বিক্রির অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় আসা এবং ক্ষমতায় এসে গোপন চুক্তির মাধ্যমে অঙ্গীকার রক্ষা করছে যারা, তাদেরও কোনো দোষ হয় না।

মানবাধিকার ব্যবসায়ীরা আজ কোথায়? এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। নদী-খাল-বিল, মাঠ, বনবাদারে শত শত নেতাকর্মীর লাশ পাওয়া যাচ্ছে। সহায়-সম্পদ বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। চাঁদা না দিলে মারধর করা হচ্ছে, বাড়িঘরে হামলা-লুটপাট করা হচ্ছে, আগুন দেওয়া হচ্ছে। মধ্যরাতে সংখ্যালঘুদের ঘরে শিকল আটকে আগুন দেওয়া হচ্ছে। মিথ্যা অপবাদে পিটিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছে। ভীতি ছড়িয়ে তাদের দেশছাড়া করতে চাইছে। মানবাধিকার ব্যবসায়ীরা আজ মুখে কুলুপ এটে বসে আছে। তাদের টু শব্দটিও নেই।

আওয়ামী লীগের রাজনীতির বয়স সাড়ে সাত দশকেরও বেশি। এই দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগকে বহু চড়াই-উৎরাই পার করে আসতে হয়েছে। পচাত্তরের পর থেকে বারবার বিএনপি-জামায়াতের ‘আওয়ামী লীগ নিধন অভিযান’ মোকাবিলা করতে হয়েছে। গণমানুষের ভালোবাসায় সব বাধা-বিপত্তি মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগ এগিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে যাবে। ষড়যন্ত্রের বর্তমান কালো ছায়া কেটে যেতেও সময় লাগবে না। খুব শিগগির আওয়ামী লীগ আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে সগৌরবে ফিরে আসবে।

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক

আরো পড়ুন

সর্বশেষ