সরকারের চার মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে তদবির সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও বদলিসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম একাধিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।অভিযোগ উঠেছে সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কোনো তদবির বা প্রশাসনিক কাজ অর্থের লেনদেন ছাড়া সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিভিন্ন সূত্রের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও একটি তদবির সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। তবে বর্তমান সরকারের আমলে নতুন করে একাধিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সিন্ডিকেটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তি, বিভিন্ন মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ এবং মন্ত্রী-সচিবদের আত্মীয়-স্বজনের সমন্বয়ে গঠিত কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কথা বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়।
সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সংস্থাপন, জনপ্রশাসন, স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে তদবির ও অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। এর মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে উল্লেখ করা হয়, কারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এই মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটি শক্তিশালী তদবির সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে, প্রতিদিন অফিস চলাকালে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী জনাব আব্দুল বারীর কক্ষে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন দর্শনার্থীর যাতায়াত হয়। আরও দাবি করা হয়, এসব দর্শনার্থীর একটি বড় অংশ রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তদবিরকারীদের নিয়ে গঠিত। সমালোচকদের মতে, অন্য মন্ত্রণালয়ের তুলনায় এ ধরনের উপস্থিতি অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
সুত্র জানায়, সহকারী সচিব থেকে শুরু করে সচিব পর্যায় পর্যন্ত বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে তদবির এবং আর্থিক লেনদেনের প্রভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ বা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত পাওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যেকোনো সিদ্ধান্ত সরাসরি দেশের সামগ্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তবে অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে বদলি, কাঙ্ক্ষিত পদায়ন বা পদোন্নতি পাওয়ার ক্ষেত্রে একশ্রেণির কর্মকর্তার বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যারা এভাবে বিপুল অর্থ ব্যয় করে চেয়ার লাভ করেন, মাঠপর্যায়ে গিয়ে তাঁদের কেউ কেউ সেই বিনিয়োগের টাকা উশুল করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। ফলে দিনশেষে সাধারণ জনগণ, ব্যবসায়ী এবং সেবা প্রত্যাশীদের চরম হয়রানি ও দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, অতীতের সরকারগুলোর সময়েও প্রশাসনের ভেতরে নানামুখী অনিয়মের অভিযোগ ছিল। তবে বর্তমান সময়ে তদবির-বাণিজ্য, পদায়ন সিন্ডিকেট এবং মাঠপর্যায়ে প্রকাশ্য চাঁদাবাজির দাপট যেন আরও সুসংগঠিত ও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
একই সাথে মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। ২০২৪ সালের জুলাই দাঙ্গার পর দেশজুড়ে বিএনপির একটা বড় অংশের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফুটপাত ও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এবং জোরপূর্বক দখলদারিত্বের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার, পদ-পদবি ও ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। প্রশাসনের এই স্থবিরতা এবং মাঠপর্যায়ে বিএনপির একাংশের এমন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের যৌথ যাতাকলে পড়ে সাধারণ জনগণের এখন যেন ‘নাভিশ্বাস’ ওঠার দশা হয়েছে।

