আদাবরের একটা গলিতে এক বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে তিন লাখ টাকা নিয়ে গেল কয়েকজন। খবরটা ভাইরাল হলো, পুলিশ মাঠে নামল, আর তারপর ওসি নিজেই হামলার মুখে পড়ে রক্তাক্ত হলেন নিজের থানার এলাকায়। যাদের বিরুদ্ধে এই হামলার অভিযোগ, তারা কোনো অচেনা মুখ না। মোহাম্মদপুর-আদাবরের ‘কবজিকাটা আনোয়ার’ বাহিনীর সদস্য, যাদের নাম ডিএমপির নিজস্ব খাতায় আগে থেকেই লেখা ছিল। অর্থাৎ পুলিশ জানত কারা এই কাজ করতে পারে, কোথায় তাদের আস্তানা, কী তাদের ইতিহাস। তারপরও তারা রাস্তায় ছিল, আর ছিনতাই করছিল।
এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা না। ডিএমপির হাতে এই মুহূর্তে ১১৭টা পেশাদার অপরাধী দলের পূর্ণাঙ্গ তালিকা আছে, প্রতি দলে দশ থেকে বিশজন সদস্য, কে কোন এলাকায় খুন-ছিনতাই-চাঁদাবাজি চালায় তার বিস্তারিত বিবরণসহ। এমনকি কাদের ছায়ায় এই দলগুলো টিকে থাকে, সেই পৃষ্ঠপোষকদের নামও পুলিশের ফাইলে আছে বলে জানা যাচ্ছে। তারপরও গত একুশ মাসে ঢাকায় খুন হয়েছে ৫৯৭টা মামলার ভিত্তিতে, ডাকাতি-ছিনতাই ৭৭৩টা, আর খোদ পুলিশই আক্রান্ত হয়েছে ১৪২ বার। আলোচিত দশটা ছিনতাইয়ের একটারও তদন্ত শেষ হয়নি আজও। তথ্যের অভাব না এটা, ইচ্ছার অভাব।
রামপুরায় নিজের বাসার কাছে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলেন ‘কাইল্যা পলাশ’, এক মাস আগেই যিনি জামিনে বের হয়েছিলেন। নিউমার্কেটে গুলি করে মারা হলো আরেক সন্ত্রাসী নাঈমকে, দেড় মাস পার হয়ে গেছে, কাউকে ধরা যায়নি। পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নির্দেশদাতার নাম পর্যন্ত উঠে এসেছে তদন্তে, অথচ তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। নিহতের স্ত্রী নিজেই সাংবাদিকদের বলেছেন, ন্যায়বিচার পাবেন কিনা সেটা নিয়েই তার সন্দেহ আছে। একটা রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনীর কাছে যখন খুনের নির্দেশদাতার নাম থাকে, আর তবু সেই মানুষটা ধরাছোঁয়ার বাইরে ঘুরে বেড়ায়, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটা তদন্তের সক্ষমতায় না, সদিচ্ছায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজের মুখে বলেছিলেন, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি তার সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। চার মাস পেরিয়ে গেছে সেই প্রতিশ্রুতির। ফলাফল কী দাঁড়াল? খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্বীকার করলেন, মোহাম্মদপুর বছরের পর বছর ধরে অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে আছে। অথচ একই এলাকায় একই চক্র গত মাসেই অন্তত দশটা ছিনতাই করেছে বলে পুলিশের অনুসন্ধানেই বেরিয়ে এসেছে, যার একটারও মামলা হয়নি, কারণ ভুক্তভোগীরা ভয়ে থানায় যাননি, আর যেগুলো ভাইরাল হয়নি সেগুলো নিয়ে পুলিশেরও তাড়া নেই। এই সমীকরণটা স্পষ্ট, কোনো ঘটনা ফেসবুকে ছড়ালেই কেবল ঊর্ধ্বতনরা চাপ দেন, সংবাদ সম্মেলন হয়, সাফল্যের গল্প প্রচার হয়। তারপর তদন্ত যেখানে ছিল সেখানেই থেমে থাকে। ডিবির কর্মকর্তারাই নাম প্রকাশ না করে এই কথাগুলো বলছেন গণমাধ্যমকে।
মিরপুরে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে গুলি করে বাইশ লাখ টাকা, ধানমন্ডিতে বাহান্ন লাখ টাকা, কামরাঙ্গীরচরে পঞ্চাশ ভরি সোনা, এই তিনটা ঘটনায় একই চক্রের প্রধান জলিল মণ্ডলসহ পাঁচজন ধরা পড়েছিল। ভুক্তভোগীরা এখনো তাদের টাকা ফেরত পাননি, আর আসামিরা এর মধ্যেই জামিনে বাইরে। এটাই এখন বাস্তবতা, ধরা পড়লেও কিছু বদলায় না, কারণ মামলার গতি সেখানেই থেমে যায় যেখানে গণমাধ্যমের আগ্রহ ফুরিয়ে যায়।
বিষয়টা নতুন না, দুই দশক আগে এই একই দল যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন মাঠের সন্ত্রাসী ধরা পড়লেও তাদের রাজনৈতিক ছায়া কখনো তাদেরকে আদালত পর্যন্ত পৌঁছাতে দেয়নি। এখন সংসদে দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে বসা এই সরকারের আমলে আবার একই ছবি, খুনের নির্দেশদাতারা বিদেশে বসে নির্দেশ দিচ্ছেন, মাঠের শুটার ধরা পড়লেও মূল হোতার নাম ফাইলেই আটকে থাকছে। সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি জামায়াতও যেভাবে দ্রুত মাঠপর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করছে, সেখানেও পুরনো প্রশ্নটাই নতুন করে উঠছে, রাজনৈতিক ছায়া আর অপরাধী চক্রের দূরত্ব আসলে কতটা।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আবদুল কাইয়ুম নিজেই বলেছেন, জবাবদিহি আর তদারকির ঘাটতিতেই এই অবস্থা, নেতৃত্ব সক্রিয় না হলে পরিস্থিতি বদলাবে না। প্রশ্নটা তাহলে আসলে পুলিশকে নয়, যে সরকার ক্ষমতায় বসেই আইনশৃঙ্খলাকে প্রধান অগ্রাধিকার বলে ঘোষণা দিয়েছিল, তাদেরকেই করতে হবে। তালিকায় নাম আছে, ঠিকানা আছে, অপরাধের প্যাটার্ন আছে, কেবল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার সদিচ্ছাটাই নেই।

