গত দুই মাস ধরে বাংলাদেশের মানুষ বিদ্যুৎ কী জিনিস সেটা প্রায় ভুলতে বসেছে। গ্রামে গঞ্জে বারো থেকে চৌদ্দ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। শহরেও অবস্থা খুব একটা ভালো না। আর এই অন্ধকারের মাঝে বসে যারা দেশ চালাচ্ছেন, তারা বলছেন সব ঠিক আছে। লোডশেডিং আছে, তবে বেশি না।
বেশি না মানে কতটুকু? পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বলছে এক হাজার নয়শো মেগাওয়াট ঘাটতি। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বলছে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি। একই সময়ে দুটো সরকারি সংস্থার দুটো সম্পূর্ণ আলাদা হিসাব। এই হিসাবের ফারাকটা হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ভুল না, এটা পরিকল্পিত।
যে সরকার ফেব্রুয়ারির বারো তারিখে ক্ষমতায় এসেছে, তারা এসেছে এমন একটা নির্বাচনের মাধ্যমে যেখানে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নেয়নি। মানুষ ভোট দিতে যায়নি। যা হয়েছে সেটাকে নির্বাচন বলা মানে নির্বাচন শব্দটার অপমান করা। সেনানিবাসে জন্ম নেওয়া এই দলটি গণতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক শর্তটাই তারা পূরণ করেনি ক্ষমতায় আসতে গিয়ে।
সেই অবৈধ পথে আসা সরকারের মন্ত্রীরা এখন দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে মিথ্যা বলছেন। পিডিবির কর্তারা লোডশেডিংয়ের প্রকৃত তথ্য গোপন করছেন। চাহিদা কমিয়ে দেখালে ঘাটতিও কম দেখানো যায়, এই সহজ হিসাবে তারা সংখ্যা নিয়ে খেলছেন। কিন্তু ভোগান্তি তো কাগজে থাকে না, মানুষের গায়ে থাকে।
এসএসসি পরীক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান মেহেরপুরে বসে ঘামতে ঘামতে পড়তে চাইছে, বিদ্যুৎ নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষক সেচ দিতে পারছেন না, ধান মরে যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানার মালিক সময়মতো অর্ডার ডেলিভারি দিতে পারছেন না, বিদেশি ক্রেতা অর্ডার বাতিল করতে পারেন এই ভয়ে রাত কাটছে। এই মানুষগুলো কি পরিসংখ্যানের ভুল? না, এরা বাস্তবতা।
দেশে ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। মোট উৎপাদন ক্ষমতা উনত্রিশ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। অথচ সেই সক্ষমতার অর্ধেক সারাবছর বসে থাকে। এখন আবার জ্বালানি সংকটে আঠারোটি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ, পঁয়ত্রিশটির উৎপাদন কমে গেছে। এই অবস্থায় গ্রীষ্মে চাহিদা আঠারো হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে নিজেদের পূর্বাভাসেই বলা আছে। সেই তুলনায় উৎপাদন হচ্ছে চৌদ্দ থেকে পনেরো হাজার মেগাওয়াট। এই বিশাল ফাঁকটুকু মানুষ অন্ধকারে বসে পূরণ করছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ছয় থেকে আটটি তাপপ্রবাহ আসতে পারে, তার মধ্যে তিন থেকে চারটা তীব্র হবে। গরম বাড়লে চাহিদা বাড়বে, কিন্তু সরবরাহ বাড়ানোর কোনো লক্ষণ নেই।
এই সরকার শুধু বিদ্যুৎ দিতে পারছে না তা না, বিদ্যুৎ না দেওয়ার কথাটাও সত্যি করে বলতে পারছে না। সেটাই আসল সমস্যা। একটা সরকার যখন নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করার সাহস হারিয়ে ফেলে, তখন বুঝতে হয় সে সরকার আর জনগণের জন্য কাজ করছে না, করছে নিজেদের গদি টিকিয়ে রাখার জন্য। ফার্নেস অয়েলের দাম বেড়ে গেছে তাই তেলভিত্তিক উৎপাদন কমানো হয়েছে, পিডিবির কর্তারা এটুকু বলেছেন। কিন্তু লোডশেডিংয়ের তথ্যে গরমিল কেন, সেটা নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। কারণটা বোঝা কঠিন না।

