বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির বর্তমান চিত্র একটি কাফকায়েস্ক দুঃস্বপ্নের মতো। একদিকে মানবসভ্যতা যখন চাঁদের মাটি ছুঁয়ে মহাকাশের সীমানা প্রসারিত করছে, অন্যদিকে এখানে জনগণকে পেট্রোল পাম্পে সারারাত মশারির ভেতর বসে রাত কাটাতে হচ্ছে এক গ্যালন ডিজেলের আশায়। এটি কোনো সাধারণ দুর্দশা নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় অক্ষমতার নির্মম বহিঃপ্রকাশ, যার নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ চার দশকের সুচতুর রাজনৈতিক ভণ্ডামি আর সুবিধাবাদী জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত আত্মহনন।
যে সরকার আজ দেশ চালাচ্ছে, তার জন্মই হয়েছে বন্দুকের নল আর সেনানিবাসের পেট থেকে। ২০২৬ সালের সেই তথাকথিত নির্বাচন একটি প্রহসন ছাড়া কিছুই ছিল না। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে যখন কোণঠাসা করে রাখা হলো, জনগণ যখন বয়কটের পথ বেছে নিল, ঠিক তখনই একদল মুখোশধারী নিজেদের মধ্যে ভোটাভুটি করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর চূড়ায় বসে গেল। এই যে চেহারাগুলো আজ সংসদ ভবনের চেয়ারগুলো গরম করছে, এরা কার্যত ক্ষমতার লুটেরা মাত্র। এদের রাজনৈতিক দর্শন বা রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই। আছে শুধু প্রাসাদ ষড়যন্ত্র আর বিদেশি প্রভুদের পায়ে লুটিয়ে পড়ার এক অদ্ভুত দক্ষতা।
রাষ্ট্র পরিচালনার এই ব্যর্থতা এখন আর গোপন নেই। জ্বালানি তেল নেই, বিদ্যুৎ নেই, শিশুদের টিকা পর্যন্ত বন্ধ। একজন প্রধানমন্ত্রী যিনি দীর্ঘ সতেরো বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন, তিনি আজ দেশের মানুষের দুঃখ বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি হয়তো ভাবেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় মানেই ‘প্রাথমিক বিশ্ববিদ্যালয়’। যে মানুষটি শিশুমৃত্যুর মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে হাসপাতালে না গিয়ে সিনেমা হলে ছবি দেখতে যান, তার কাছে দেশের মানুষের আর্তনাদ বোধগম্য হওয়ার কথা নয়। তার উপদেষ্টারা ফটোশপে কৃষি কার্ড বিতরণের ছবি বানিয়ে যে বিভ্রম ছড়ান, তা শুধু তাদের নির্লজ্জতা ও জনগণকে বোকা বানানোর প্রবণতাকেই প্রকট করে।
কিন্তু দায় কি শুধু এই ভণ্ড নেতাদের? নিঃসন্দেহে বড় দায়ভার বর্তায় সেই জনগোষ্ঠীর ওপর, যাদের সম্পর্কে বলা যায়, ‘উপরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট’। এই জাতি সুবিধাবাদের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ক্ষমতা যখন যার হাতে, এরা তখন তারই পায়ে তালি বাজায়। ধর্মের দোহাই দিয়ে নারী নেতৃত্বকে একদিন হারাম ফতোয়া দেয়া জামায়াত, পরদিন খালেদা জিয়ার আঁচলতলে আশ্রয় নেয়।
একই গোষ্ঠী সকালে ভারতকে গালাগালি করে, বিকেলে আবার ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনের ডিজেলের জন্য হাত পাতে। এই আত্মসম্মানহীন পরজীবী মানসিকতা জাতিকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে, তা আজ পেট্রোল পাম্পে মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো রিফাত ও আমীর হোসেনদের দিকে তাকালেই বোঝা যায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘অর্গানাইজড হিপোক্রেসি’। দিনে এক কথা, রাতে আরেক কথা। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমান যে রাজনীতির খাল কেটেছিলেন, সেই খাল দিয়েই তিনি জামায়াত-শিবিরের মতো কুমির এনেছিলেন। আজ সেই কুমিরই গোটা রাষ্ট্রটাকে গিলে খাচ্ছে। এরা সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহ লিখে পবিত্রতা দাবি করলেও রাষ্ট্রীয় মদের লাইসেন্স বিলিতে এদের দ্বিধা নেই। এমন ভণ্ডামির রাজনীতির কাছে একটি জাতির ভবিষ্যৎ জিম্মি হয়ে আছে।
এই পঙ্গপালের দল ভোট দিয়ে নিজেদের ভাগ্যে যা বরণ করে নিয়েছে, তার সুফল এখন ভোগ করছে। কিন্তু এটা তো কেবল সূচনা মাত্র। ষোড়শ শতাব্দীর দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন যাকে বলেছিলেন ‘রিভেঞ্জ অফ নেচার’, প্রকৃতির সেই প্রতিশোধ বাংলাদেশ এখন প্রতিটি ইঞ্চিতে টের পাচ্ছে। একদিন যে জাতির ভাগ্যে শেখ হাসিনার মতো দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক জুটেছিল, সে জাতি আজ তার যোগ্য শিক্ষাই পাচ্ছে। সংসদে বসা ওই ফোলানো মুখগুলো মিলেও তার এক জুতার মর্যাদার সমকক্ষও হবে না। এ যেন এক উন্মাদ উটের পিঠে চড়ে চলা এক স্বদেশ, যার গন্তব্য অজানা অন্ধকারে।

