ঢাকার পার্কগুলোর বর্তমান অবস্থা দেখলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সেই পাতানো নির্বাচনের পর বিএনপির সেনানিবাসী রাজনীতির বিষাক্ত ছোবল কত দ্রুত রাষ্ট্রের প্রতিটি শিরায় উপশিরায় ছড়িয়ে পড়েছে, তার একটি নিখুঁত চিত্র পাওয়া যায়। যে দলটির জন্মই হয়েছে জিয়াউর রহমানের সেনানিবাসের গর্ভে, রক্তাক্ত সত্তরের দশক আর একাত্তরের পরাজিত শক্তির আশ্রয়স্থল হিসেবে, সেই দলই আজ ক্ষমতায় ফিরে জনগণের সম্পদ লুটপাট করার পুরোনো সেই ২০০১-০৬ সালের অধ্যায় নতুন মলাটে শুরু করেছে। গুলশানের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক আর শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি পার্কের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; এগুলো পুরো ব্যবস্থার ভেতরে বাসা বাঁধা এক চক্রান্তের নমুনা।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্কের কথা ধরা যাক। জনগণের সাড়ে আট কোটি টাকায় নির্মিত এই পার্কটির পরিচালনার দায়িত্ব গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে দেওয়া হয়েছে। আইন কী বলে? ‘মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সব পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০’ এর ধারা ৫ একেবারে পরিষ্কার ভাষায় বলে রেখেছে, উন্মুক্ত স্থান বা উদ্যানের শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না, এবং কোনোভাবেই তা ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর করা যাবে না।
শুধু তাই নয়, ব্যাখ্যায় বলা আছে, কোনো উদ্যানের বৃক্ষরাজি নিধনকেও শ্রেণী পরিবর্তন হিসেবে গণ্য করা হবে। এ আইন এতটাই কড়া যে এটি কোনো রকম ফাঁকফোকর রাখেনি। অথচ সেই আইনের তোয়াক্কা না করে গুলশান ইয়ুথ ক্লাব পার্কের ভেতরে স্থাপন করেছে নিজেদের অফিস, ক্যাফে, পার্কিং এবং নির্মাণ করছে সুইমিং পুল। এগুলো পার্কের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের ওপর সরাসরি আঘাত।
অথচ রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম নির্লিপ্তভাবে বলেছেন, তারা নাকি শর্ত দিয়েছে বাণিজ্যিক ব্যবহার করা যাবে না, শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না। প্রশ্ন হলো, শ্রেণী পরিবর্তনের এই নির্মাণ কাজ তখন চলছিল কী করে? কার অনুমতিতে? আর রাজউকেরই বা চোখ ছিল কোথায়? ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ডা. ওয়াহিদুজ্জামানের বক্তব্যটাই আসল চেহারা ফাঁস করে দিচ্ছে, তিনি বলেছেন, “রাজউক কেন আমাদের পার্কটি দিয়েছে, কোন আইনের ভিত্তিতে দিয়েছে এটা তারাই ভালো বলতে পারবে।” অর্থাৎ, ক্লাব নিজেও জানে না তারা কীসের ভিত্তিতে এই সম্পদ পেয়েছে। তারা শুধু জানে, ক্ষমতা এখন তাদের লোকের হাতে, সুতরাং আইন তাদের জন্য নয়।
একই ছবি শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি পার্কে। তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলাম উদ্বোধনের সময় বলেছিলেন, এটি শুধু গুলশান বা নিকেতন সোসাইটির জন্য নয়, খেটে খাওয়া মানুষের জন্যও উন্মুক্ত থাকবে। অথচ এখন পার্কের চাবি ওঠে গেছে গুলশান সোসাইটি আর নিকেতন সোসাইটির হাতে। নির্দিষ্ট সময়ে পার্ক বন্ধ রাখা হচ্ছে, কোনো আইনগত কারণ ছাড়াই, শুধু বাইরের মানুষের প্রবেশ ঠেকাতে। নিরাপত্তাকর্মীদের বক্তব্য শুনুন, “সোসাইটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বন্ধ রাখতে।” এটা কার নির্দেশ? আইনের কত নম্বর ধারা মোতাবেক একটি পাবলিক পার্কে সাধারণ মানুষের প্রবেশে এভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়? উত্তর কারও জানা নেই। কারণ এখানে আইনের কোনো প্রয়োগ নেই, আছে শুধু একনায়কতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত, যে সিদ্ধান্তের রক্ষাকবচ এখন বিএনপির ক্ষমতা।
নগর পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে কথা বললেই স্পষ্ট হয়, এই পুরো প্রক্রিয়াটাই একটি সুচিন্তিত দখলের কৌশল। অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ যেমন বলেছেন, পার্ক-মাঠ স্থানীয় কমিউনিটি পরিচালনা করবে, কোনো অভিজাত ক্লাব বা সোসাইটি নয়। কিন্তু এখানে ঠিক উল্টোটা হচ্ছে। প্রথমে ‘ব্যবস্থাপনা’র দায়িত্ব দেওয়া হয়, তারপর ওই দায়িত্বকে ঢাল বানিয়ে স্থায়ী স্থাপনা গড়ে তোলা হয়, জমির ব্যবহার বদলে দেওয়া হয়, খেলার মাঠ ভাড়া দিয়ে বাণিজ্য শুরু হয়। একসময় ওই প্রতিষ্ঠান এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে তাদের উচ্ছেদ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে রাজউকের উচ্ছেদের নোটিশ থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত গিয়েও কোনো ফল হয়নি, বরং উল্টো রাজউক আবার তাদের কাছেই পার্ক ফিরিয়ে দিয়েছে। এটা নিছক ব্যর্থতা নয়, এটা এক ধরনের অপরাধীকে পুরস্কৃত করার নামান্তর।
বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কের চিত্রটা আরও সরাসরি। এখানে আর ক্লাব বা সোসাইটি নয়, সরাসরি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নিজেই পার্কটিকে ভাড়া দিচ্ছে ইফতার বাজার, ঈদের মেলা আর কনসার্টের জন্য। জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখার কথা বলে বছরের পর বছর পার্ক বন্ধ রেখে রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, এটা নিষিদ্ধ কিনা সম্পত্তি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানাবেন। একজন প্রশাসকের মুখে এটা কেমন কথা? তিনি নিজে যে আইন লঙ্ঘন করছেন, সেটা জানার জন্য তার অধীনস্থ কারও মতামতের প্রয়োজন হচ্ছে? এর চেয়ে বড় আইনের প্রতি অবজ্ঞা আর কী হতে পারে?
এখানেই বিএনপির চরিত্রটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুর্নীতি করা বা আইন ভাঙা একটা ঘটনা, কিন্তু পুরো আমলাতন্ত্র, সিটি করপোরেশন আর রাজউকের মতো সংস্থাকে ব্যবহার করে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এই কাজ চালিয়ে যাওয়া মানে পুরো রাষ্ট্রকাঠামোকে দুর্নীতির কারখানায় পরিণত করা। যে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব কখনো জিয়াউর রহমানের সামরিক ফরমান আর স্বৈরতন্ত্রের বাইরে গিয়ে ভাবতেই পারেনি, তারা জনগণের সম্পদ জনগণের কাছে রাখার পক্ষে কীভাবে হবে? ২০০১-০৬ মেয়াদে যেমন রাস্তা-ঘাট, চাঁদাবাজি আর খুন-গুমের সংস্কৃতি চালু ছিল, এবার তার চেহারা বদলে গেছে। এখন রাস্তার মাস্তানরা নয়, টাই পরা অভিজাত ক্লাব সদস্যরা জমি দখল করছে, আর সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো তাদের জমির দলিল বানিয়ে দিচ্ছে। পদ্ধতি বদলেছে, চরিত্র বদলায়নি।

