শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে ছয় মাসের রিসা মারা গেছে সকাল সাড়ে দশটায়। হাম থেকে রক্তে সংক্রমণ, সেপটিক শক, ফুসফুস অকার্যকর হয়ে যাওয়া। চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন কারণ। বাবা জাকির হোসেন নিজেও বলেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন রিসার মৃত্যু হামজনিত কারণেই হয়েছে। অথচ সরকারি বুলেটিন বলছে ওই চব্বিশ ঘণ্টায় হামে কেউ মারা যায়নি।
এটা কোনো হিসাবের ভুল নয়। এটা ইচ্ছাকৃত অস্বীকার। মৃত্যুকে লুকিয়ে ফেলার রাজনীতি।
রিসার পরের দিনই মারা গেছে সোয়া তিন মাসের আয়াত। তারও মৃত্যু হয়েছে হাম আর নিউমোনিয়ায়। দশ এপ্রিল ভোরে মারা গেছে দশ মাসের সোহা মনি। মাদারীপুর থেকে চারটি হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে এসে থামতে হয়েছে তাকে। হাসপাতালের নথিতে পরিষ্কার লেখা মৃত্যুর কারণ মিজেলস। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে সেদিনও লেখা ছিল দেশে হামে কোনো শিশু মারা যায়নি।
এই যে মৃত্যুকে অস্বীকার করা, এটা কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নয়। এটা একটা শাসনব্যবস্থার চরিত্র। যে ব্যবস্থা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে ভয় পায়। যে ব্যবস্থা সত্যকে ঢেকে রাখতেই সবচেয়ে বেশি শক্তি ব্যয় করে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল বলছে তারা নিয়মিত তথ্য পাঠায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএসে। অধিদপ্তরের পরিচালক বলছেন সময় কম, ক্রসচেক করা সম্ভব হয় না। কিন্তু প্রশ্নটা তো সময়ের নয়। প্রশ্নটা দায়িত্বের। একজন শিশু মারা গেলে তার মৃত্যুর তথ্য যদি সরকারি বুলেটিনে জায়গা না পায় তাহলে ওই বুলেটিনের কোনো মূল্য নেই। ওটা তথ্য নয়, প্রোপাগান্ডা।
আর এই প্রোপাগান্ডা যন্ত্রের পেছনে বসে আছে একটা রাজনৈতিক দল যার জন্মই হয়েছে সেনানিবাসের ভেতরে। জিয়াউর রহমান নামের এক স্বৈরশাসক যে কিনা সামরিক ফরমান জারি করে রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন, তার হাত ধরে গড়ে ওঠা এই দলটা আজও গণতন্ত্রের নামে ভাঁওতাবাজি করছে। জনগণের ভোটে নয়, পেটোয়া নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসে তারা এখন স্বাস্থ্য খাতের এই ভয়াবহ বাস্তবতাকে লুকিয়ে রাখতে ব্যস্ত।
হামের প্রকোপ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। হাসপাতালের আইসিইউ উপচে পড়ছে শিশুদের কান্নায়। বাবা মায়েরা সন্তানের লাশ কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। আর ক্ষমতাসীনদের বুলেটিন বলছে কেউ মারা যায়নি। মৃত্যুকে তারা শুধু পরিসংখ্যান থেকে মুছে ফেলছে না, মুছে ফেলছে জনগণের দুঃখকে, কষ্টকে, ক্ষোভকে।
এই যে মৃত্যু অস্বীকারের রাজনীতি, এটা একদিন টিকতে পারে না। সত্য কখনো চাপা থাকে না। রিসার বাবা বলেছেন, হামের কারণেই আমার মেয়ে মারা গেছে, ডাক্তাররাও তাই বলেছেন। সরকারি হিসাবে সেটা না থাকলে সেটা তাদের ব্যর্থতা। একজন বাবার এই সহজ কথাটুকুই যথেষ্ট পুরো সরকারি প্রচারণা যন্ত্রকে মুখোশ খুলে দেবার জন্য।
আজ রিসা নেই, আয়াত নেই, সোহা মনি নেই। কিন্তু তাদের মৃত্যুকে অস্বীকার করার এই অপরাধ থেকে যাবে ইতিহাসের পাতায়। যে সরকার নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে মৃত শিশুদেরও মুছে ফেলতে চায়, সেই সরকারের কাছ থেকে জনগণের আর কী প্রত্যাশা থাকতে পারে।
হামের ভাইরাস হয়তো একদিন নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু সত্যকে অস্বীকার করার এই মানসিকতার কোনো ভ্যাকসিন নেই। এর একটাই প্রতিকার। জবাবদিহিতা। যে জবাবদিহিতা আজকের এই শাসনব্যবস্থায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

