২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ, মাত্র তিন মাসে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর ১৩৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২৫ জন মানুষ খুন হয়েছেন। ৩৫টি মন্দির ভাঙা হয়েছে বা লুট হয়েছে। ৪ জন নারী ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান না, এগুলো মানুষের জীবন, মানুষের ঘর, মানুষের উপাসনার জায়গা। আর এই সময়টায় ক্ষমতায় আছে বিএনপি।
ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে যে নির্বাচন হয়েছে, সেটাকে নির্বাচন বলতে গেলে “নির্বাচন” শব্দটার প্রতিই অবিচার করা হয়। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো ছিল না, মানুষ ভোট দিতে যায়নি, মাঠে ছিল না কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নিজেরা নিজেদের জন্য একটা মঞ্চ বানিয়ে, সেই মঞ্চে উঠে নিজেরাই তালি দিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় যে সরকার তৈরি হয়েছে, তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের আছে।
কিন্তু বৈধতার প্রশ্নের বাইরেও একটা সহজ প্রশ্ন আছে, সরকার কী করছে? ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা থামানোর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। হামলাকারীদের গ্রেফতারের কোনো জোরালো খবর নেই। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর কোনো বার্তা নেই। মন্ত্রীরা বক্তৃতায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলেন, আর মাঠে মন্দির ভাঙে। এই ফারাকটা কাকতালীয় না, এটা একটা পরিচিত রাজনৈতিক কৌশল।
বিএনপির ইতিহাস এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। জিয়াউর রহমান সামরিক ছাউনিতে বসে যে দলটা তৈরি করেছিলেন, সেটা কখনো সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেনি। দেখার দরকারও মনে করেনি। কারণ সংখ্যালঘুদের ভোট তাদের হিসাবের মধ্যে কখনো বড় জায়গা পায়নি, আর সংখ্যাগরিষ্ঠের একটা অংশকে সন্তুষ্ট রাখতে সংখ্যালঘুদের ওপর চোখ বন্ধ করে থাকাটা তাদের কাছে লাভজনক মনে হয়েছে।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বলছে, তারা আশা করেছিল বিএনপি সরকার আসার পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এই আশাটা করাটাও একটা ভুল ছিল, কারণ বিএনপির অতীত সেই আশার কোনো ভিত্তি দেয় না। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর যা হয়েছিল, সেটা এই দেশের ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায়। সেই ঘটনার বিচার আজও হয়নি, আর সেই দলই আবার ক্ষমতায়।
ঐক্য পরিষদ সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশনসহ আট দফা দাবি জানিয়েছে। এই দাবিগুলো নতুন না। এগুলো বছরের পর বছর ধরে বলা হচ্ছে। প্রতিটি সরকার শুনেছে, মাথা নেড়েছে, তারপর ভুলে গেছে। বিএনপিও ভুলে যাবে, এটা ধরে নেওয়া অসঙ্গত হবে না।
যে রাষ্ট্রে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষ নিজের দেশে নিরাপদ না, নিজের উপাসনালয় রক্ষা করতে পারে না, নিজের জমি ধরে রাখতে পারে না, সে রাষ্ট্র কার? এপ্রিল ২০২৬ সালে এসেও যদি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটা শুধু একটি দলের না, সমস্যাটা রাষ্ট্রের চরিত্রের মধ্যে গেঁথে গেছে। আর সেই চরিত্র বদলানোর কোনো ইচ্ছা এই সরকারের আছে বলে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ নেই।

