মহেশখালীতে বঙ্গোপসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল অবকাঠামো। ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন, ছয়টা বিশাল তেলের ট্যাংক, পাম্পিং স্টেশন, সব আছে। দুই লাখ টন তেল ধরার ক্ষমতা আছে। শুধু নেই একটা অপারেটর। আর সেই অপারেটর না থাকার কারণে প্রায় দুই বছর ধরে আট হাজার কোটি টাকার এই অবকাঠামো রোদে পুড়ছে, বৃষ্টিতে ভিজছে, কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।
এই যে ব্যর্থতা, এই যে অব্যবস্থাপনা, এর দায় কার? বিএনপি আর তার মন্ত্রিসভা যারা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটা নির্বাচনের নামে প্রহসন করে ক্ষমতায় বসেছে, তারা এখন এই প্রশ্নের সামনে চুপ করে আছে।
বিষয়টা একটু পরিষ্কার করা দরকার। এসপিএম প্রকল্পের নির্মাণ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালে। মার্চ মাসেই পরীক্ষামূলকভাবে তেল খালাস ও পরিবহন সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তিগতভাবে সব ঠিকঠাক। শুধু একটা অপারেটর ঠিকাদার দরকার যারা এটা চালাবে। এই একটা কাজ করতে দুই বছরের বেশি লেগে গেছে। আর এই দুই বছরে দেশে তেল সংকট হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বেড়েছে, এবং প্রতিদিন পুরনো পদ্ধতিতে লাইটার জাহাজে করে তেল আনতে গিয়ে কোটি কোটি টাকা গচ্চা গেছে।
হিসাবটা সহজ। পাইপলাইন চালু থাকলে বছরে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়ার কথা। দুই বছরে সেটা প্রায় ১৬০০ কোটি টাকা। এই টাকাটা কোথায় গেছে? লাইটারেজ ব্যবসায়ীদের পকেটে। এই লাইটারেজ ব্যবসায় কারা আছে, সেটা নিয়ে আলাদাভাবে তদন্ত হওয়া দরকার।
বিএনপির মন্ত্রিসভার যুগ্ম সচিব বলেছেন, “খুব বেশি দিন লাগবে না।” মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বৈঠক করেছেন, ব্রিফিং নিয়েছেন। কিন্তু কবে চালু হবে সেটা কেউ সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছেন না। এটা অদক্ষতা, নাকি অনিচ্ছা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো হিসাব আছে সেটা বোঝা দরকার।
একটা সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তার কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকে যে অন্তত তৈরি হয়ে থাকা জিনিসটুকু চালু করবে। এখানে পাইপলাইন তৈরি হয়ে আছে, ট্যাংক তৈরি হয়ে আছে, শুধু একটা ঠিকাদার নিয়োগ দিলেই কাজ শুরু হয়ে যায়। এই একটা কাজও বিএনপি সরকার করতে পারছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেছেন একটু উদ্ভাবনী চিন্তা করলে এতদিনে এটা চালু হয়ে যেত। কথাটা ঠিক। কিন্তু উদ্ভাবনী চিন্তা করার মানুষ থাকতে হয়। যে সরকার একটা নির্বাচনী নাটক মঞ্চস্থ করে ক্ষমতায় বসেছে, যেখানে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো অনুপস্থিত ছিল, জনগণের একটা বড় অংশ ভোট দেওয়ার প্রয়োজনই মনে করেনি, সেই সরকারের কাছ থেকে উদ্ভাবনী চিন্তার প্রত্যাশা করাটা হয়তো বাড়াবাড়ি।
দুই লাখ টনের মজুত সক্ষমতা শুধু ব্যবসায়িক সুবিধার বিষয় না, এটা জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন ওঠানামা করে, যখন সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটে, তখন এই মজুত সক্ষমতা দেশকে সুরক্ষিত রাখে। কিন্তু এই মৌলিক বোঝাপড়াটুকুও যদি সরকারের না থাকে, তাহলে সমস্যা গভীর।
বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম প্রশ্ন তুলেছেন, কার গাফিলতিতে এটা পড়ে আছে। এই প্রশ্নটা এখন আর শুধু বিশেষজ্ঞের প্রশ্ন না, এটা সাধারণ মানুষের প্রশ্ন হওয়া উচিত। আট হাজার কোটি টাকার সম্পদ অলস পড়ে থাকলে সেটার দায় নিতে হবে। দায় নেওয়ার সংস্কৃতি না থাকলে রাষ্ট্র চলে না।
বিএনপি সরকার এখন বলছে প্রক্রিয়া চলছে, মূল্যায়ন হচ্ছে। দরপত্র শেষ হলে হবে। কিন্তু এই একই কথা কতদিন ধরে বলা হচ্ছে? দেশের মানুষ দেখছে, তেলের দাম বেশি, সংকট আছে, আর কক্সবাজারের মহেশখালীতে কোটি কোটি টাকার পাইপলাইন কিছুই না করে দাঁড়িয়ে আছে। এই ব্যর্থতার কোনো যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা নেই।

