বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহে ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে উঠতে যাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ খাতেই নয়, প্রযুক্তি উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকল্পের দীর্ঘ যাত্রা
ধারণাটি প্রথম আসে ১৯৬০-এর দশকে। বিভিন্ন সময় পরিকল্পনা হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করেন। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি এটিকে জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে এগিয়ে নেন। ২০১৩ সালের ২ অক্টোবর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। রাশিয়ার রোসাটমের সঙ্গে প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়। প্রকল্পে দুটি VVER-1200 রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে, প্রতিটির ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও তদারকি
প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুসরণ করে চলছে। International Atomic Energy Agency (IAEA) এর তদারকিতে পরিচালিত হচ্ছে। সরকার জানিয়েছে, পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোরভাবে আন্তর্জাতিক মান মেনে চলা হচ্ছে।
বর্তমান অগ্রগতি (মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত)
প্রথম ইউনিটের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। রিঅ্যাক্টর বিল্ডিংয়ের ভৌত কাজ ৯৮% সম্পন্ন। জ্বালানি লোডিং (ফুয়েল লোডিং) এপ্রিলের ৭ তারিখ থেকে শুরু হবে। পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন জুন-জুলাইয়ের মধ্যে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা। ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়িয়ে ডিসেম্বর নাগাদ পূর্ণ ১২০০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার লক্ষ্য। দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৭ সালের মধ্যে চালু হতে পারে। দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, যা দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় অবদান রাখবে।
উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি যুগে প্রবেশ করছে। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও জীবাশ্ম জ্বালানির দামের ওঠানামার মধ্যে এটি স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ উৎস হিসেবে কাজ করবে। ভবিষ্যতে আরও ইউনিট যুক্ত করার পরিকল্পনা আলোচনায় রয়েছে।
বিতর্ক ও অভিযোগ
প্রকল্প ঘিরে আর্থিক অনিয়ম বা ঘুষের অভিযোগ উঠেছে। তবে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ও রোসাটম এগুলো ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছে। সরকার জানিয়েছে, IAEA-এর তদারকিতে থাকায় স্বচ্ছতা বজায় রয়েছে। প্রকল্পের ব্যয়ও সংশোধিত হয়েছে, যা ঋণ থেকে মেটানো হবে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর প্রসঙ্গে অনেক বিশ্লেষক ও সমর্থক মনে করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী Sheikh Hasina-এর সময়েই দেশের বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি পেয়েছিল। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন প্রকল্পকে তারা তাঁর উন্নয়ন নীতির অংশ হিসেবে দেখেন।
সমর্থকদের একটি অংশের দাবি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে পরিকল্পিত প্রচারণা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যও ভূমিকা রেখেছে। তাদের মতে, দেশের উন্নয়ন ধারাবাহিক রাখতে স্থিতিশীল নেতৃত্ব প্রয়োজন এবং অনেক মানুষ এখনো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আস্থা রাখতে চান।

