বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বহুবার দেখা গেছে—ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণেও নাটকীয় পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে বিএনপি ক্ষমতায় এলেই পুলিশের একাংশ যেন দানবীয় রূপ ধারণ করে—এমন অভিযোগ নতুন নয়। সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত ও ঘটনার প্রেক্ষাপটে সেই পুরনো বিতর্ক আবারও সামনে চলে এসেছে।
সম্প্রতি দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছর পর আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা মো. কোহিনূর মিয়ার বরখাস্তের আদেশ বাতিল করা হয়েছে। ফলে তিনি শুধু চাকরিতেই ফিরছেন না, বরং গত দেড় দশকের বকেয়া বেতন-ভাতাসহ সব সরকারি সুবিধাও ফিরে পাচ্ছেন। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমাজের বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে—যে কর্মকর্তার নাম অতীতে একাধিক বিতর্কিত ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল, তাকে পুনর্বহাল করার নৈতিক ভিত্তি কী?
বিসিএস ১২ ব্যাচের এই কর্মকর্তা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। ২০০২ সালের ২৩ জুলাই গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে আন্দোলনরত ছাত্রীদের ওপর পুলিশের নৃশংস হামলার ঘটনায় তার নাম প্রধান অভিযুক্তদের তালিকায় উঠে আসে। সেই ঘটনার স্মৃতি এখনও দেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তীতে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ময়মনসিংহের নান্দাইলে নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় জোড়া খুনের মামলায়ও তাকে আসামি করা হয়েছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশে সেই বরখাস্তের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু একজন কর্মকর্তার পুনর্বহাল নয়—বরং অতীতের বিতর্কিত পুলিশি সংস্কৃতিকে আবারও বৈধতা দেওয়ার শঙ্কা তৈরি করছে।
এদিকে একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাকে ঘিরে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ক্যাম্পাসের কিছু অংশ উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর প্রভাববলয়ে পড়ে ‘মব জাস্টিস’-এর অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি ভোররাতে সেহরি খেতে বসা পাভেল নামে এক যুবককে একদল উগ্রপন্থী তুলে নিয়ে নির্মমভাবে মারধর করে শাহবাগ থানার সামনে ফেলে রেখে যায়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল—তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ পোস্ট করেছিলেন। পরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার শরীরের ক্ষতচিহ্নগুলো ক্যাম্পাসে আদর্শিক প্রতিহিংসার ভয়াবহ চিত্রই তুলে ধরেছে।
৭ মার্চকে ঘিরে সহিংসতার আরেকটি ঘটনা ঘটে শাহবাগ থানার সামনেই। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারের চেষ্টা করায় ইমি ও আব্দুল্লাহ আল মামুন নামে দুই শিক্ষার্থীকে টেনেহিঁচড়ে থানার ভেতরে নিয়ে গিয়ে মারধরের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু ঘটনার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো—হামলার শিকার হওয়া এই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধেই পরবর্তীতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও পুলিশের হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এক ফেসবুক লাইভে ইমি দাবি করেছেন, তাকে থানার ভেতরে নির্যাতন করা হয়েছে এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে গুরুতর আহত পাভেল এখনও হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছেন।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতে, ভিন্নমতের কারণে শারীরিক নির্যাতন, মব হামলা এবং পুলিশের নীরবতা—সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ আজ গভীর সংকটে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী ক্যাম্পাসকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর স্টিমরোলার চালাচ্ছে। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্র কি আবারও এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণও দলীয় স্বার্থের অনুগামী হয়ে পড়ে? যদি সেই পুরনো চক্র আবার ফিরে আসে, তবে তা শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা একটি ঘটনার সমস্যা নয়—বরং পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্যই বড় সতর্কবার্তা।

