ছিনতাইয়ের স্বর্ণযুগ: ১০ শতাংশের দিন শেষ, ৩০ শতাংশের বাংলাদেশ

ফয়জুর রহমান নামে এক বৃদ্ধ ভোর পাঁচটায় রিকশা-ভ্যান নিয়ে সবজি আনতে বেরিয়েছিলেন। জুরাইনের গলিতে তিন যুবক ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে নিয়ে নিল তাঁর মোবাইল আর পাঁচ হাজার টাকা। এরপর তিনি থানায় যাননি। কারণটা সবাই জানে, থানায় গেলে আরও ভোগান্তি। এই একটা ঘটনাই বলে দেয় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার অবস্থাটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে।

ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ছিনতাই বেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। ডিএমপির থানায় রেকর্ড হয়েছে ৩০৮টি ঘটনা। কিন্তু যেহেতু বেশিরভাগ মানুষ মামলা বা জিডি করতে যান না, আসল সংখ্যাটা এর কয়েক গুণ। অর্থাৎ রাস্তায় যা হচ্ছে তার সামান্য একটা অংশই কাগজে উঠছে, বাকিটা চাপা পড়ে থাকছে মানুষের হতাশার নিচে।

এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা কী পরামর্শ দিচ্ছেন? বলছেন ছিনতাইকারী আসলে বাধা দেবেন না, চুপচাপ সব দিয়ে দিন, তারপর নিরাপদে গিয়ে ৯৯৯-এ ফোন করুন। এই পরামর্শটা পড়ে মাথা ঘুরে যায়। একটা রাষ্ট্র যখন নাগরিককে বলে যে ছিনতাইকারীর সামনে চুপ থাকো, কারণ রাষ্ট্র তোমাকে রক্ষা করতে পারবে না, তখন আর কী বলার থাকে?

এই রাষ্ট্র এখন চলছে কাদের হাতে, সেটা একটু মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। ১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন হয়েছে সেটা নির্বাচন ছিল না, ছিল একটা সাজানো নাটক। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, জনগণ বয়কট করা সেই ভোটে যারা ক্ষমতায় এসেছে তারা জনগণের প্রতিনিধি নয়। তারা নিজেদের বৈধতা তৈরি করেছে কাগজে, রাস্তায় নয়। এই তথাকথিত মন্ত্রিপরিষদ থেকে মানুষ কতটা নিরাপত্তা আশা করতে পারে, সেটা ফয়জুর রহমানের অভিজ্ঞতাই বলে দিচ্ছে।

আর বিএনপির কথা বলতে গেলে কোথা থেকে শুরু করব? জিয়াউর রহমান সেনাছাউনিতে যে দলটা বানিয়েছিলেন, সেই দল দেশের রাজনীতিতে দুর্নীতি আর মাস্তানির যে সংস্কৃতি ঢুকিয়েছে, আজকের ছিনতাইয়ের এই বাস্তবতা তার ফসল। ১০ শতাংশের কমিশনের যুগ থেকে এখন এসে পৌঁছেছি ৩০ শতাংশের যুগে। শুধু হার বেড়েছে, চরিত্র বদলায়নি। বিএনপির শাসনামলে রাস্তায় ছিনতাইকারীরা যেভাবে দাপিয়ে বেড়িয়েছে, সেটা ঢাকার মানুষ ভোলেনি। তখনকার সেই পেশিশক্তির চর্চা এখন একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। মোটরসাইকেলে ছিনতাই, সংঘবদ্ধ চক্র, ছদ্মবেশে টার্গেট করা, এগুলো পেশাদার অপরাধের ছক। এটা এমনি এমনি হয়নি, এই কাঠামো তৈরি হয়েছে বছরের পর বছর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়।

পুলিশের ডিসি বলছেন ছিনতাইকারীদের ধরে জেলে পাঠালেও তারা জামিনে বেরিয়ে আবার ছিনতাই করে। কথাটা সত্যি। কিন্তু এই আইনি দুর্বলতা কি আকাশ থেকে পড়েছে? এই দুর্বলতা তৈরি করা হয়েছে, পালন করা হয়েছে, কারণ এতে একটা বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তুতন্ত্র টিকে থাকে। ছিনতাইকারী মানে অনেক সময়ই একটা স্থানীয় নেটওয়ার্কের অংশ, যে নেটওয়ার্কের ওপর মহলে রাজনৈতিক ছায়া আছে।

নতুন আইজিপি কড়া নির্দেশ দিয়েছেন, রাতের টহল ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, এপিবিএন মোতায়েন করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ভালো, কিন্তু যে সরকার বৈধ জনরায় ছাড়া ক্ষমতায় বসে আছে, সেই সরকারের পক্ষে টেকসই আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সম্ভব না। কারণ ক্ষমতার বৈধতা না থাকলে রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তৃত্বও থাকে না। পুলিশ টহল দেয় ঠিকই, কিন্তু মানুষ পুলিশকে বিশ্বাস করে না, কারণ পুলিশের ওপরে যারা বসে আছে তাদেরকেও মানুষ নিজের মনে করে না।

মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, কারওয়ান বাজার, এই পুরো শহরটা এখন একটা হটস্পটের মানচিত্র। ভোরের আলো ফোটার আগে রাস্তায় বেরোনো মানুষ জানে না সে ফিরতে পারবে কিনা। সন্ধ্যার পর যাত্রাবাড়ী মোড়ে দাঁড়ানো মানে নিজেকে সাজেশন দেওয়া। ফ্লাইওভারের নিচে চাকু হাতে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তারা কি জানে না যে পুলিশ আছে? জানে। তবু দাঁড়িয়ে থাকে, কারণ তারাও জানে যে এই ব্যবস্থায় তারা নিরাপদ।

“আই হ্যাভ আ প্ল্যান” বলা মানুষটার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তবে সেটা যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল সেটা নয়। এই পরিকল্পনায় আছে অংশগ্রহণহীন ভোট, অবৈধ ক্ষমতা, আর সেই ক্ষমতার ছায়ায় রাস্তায় রাস্তায় ছিনতাইয়ের রাজত্ব। ফয়জুর রহমানের হারানো পাঁচ হাজার টাকা আর মোবাইল ফোন এই পরিকল্পনারই একটা ক্ষুদ্র পরিণতি।

ফয়জুর রহমান নামে এক বৃদ্ধ ভোর পাঁচটায় রিকশা-ভ্যান নিয়ে সবজি আনতে বেরিয়েছিলেন। জুরাইনের গলিতে তিন যুবক ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে নিয়ে নিল তাঁর মোবাইল আর পাঁচ হাজার টাকা। এরপর তিনি থানায় যাননি। কারণটা সবাই জানে, থানায় গেলে আরও ভোগান্তি। এই একটা ঘটনাই বলে দেয় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার অবস্থাটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে।

ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ছিনতাই বেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। ডিএমপির থানায় রেকর্ড হয়েছে ৩০৮টি ঘটনা। কিন্তু যেহেতু বেশিরভাগ মানুষ মামলা বা জিডি করতে যান না, আসল সংখ্যাটা এর কয়েক গুণ। অর্থাৎ রাস্তায় যা হচ্ছে তার সামান্য একটা অংশই কাগজে উঠছে, বাকিটা চাপা পড়ে থাকছে মানুষের হতাশার নিচে।

এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা কী পরামর্শ দিচ্ছেন? বলছেন ছিনতাইকারী আসলে বাধা দেবেন না, চুপচাপ সব দিয়ে দিন, তারপর নিরাপদে গিয়ে ৯৯৯-এ ফোন করুন। এই পরামর্শটা পড়ে মাথা ঘুরে যায়। একটা রাষ্ট্র যখন নাগরিককে বলে যে ছিনতাইকারীর সামনে চুপ থাকো, কারণ রাষ্ট্র তোমাকে রক্ষা করতে পারবে না, তখন আর কী বলার থাকে?

এই রাষ্ট্র এখন চলছে কাদের হাতে, সেটা একটু মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। ১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন হয়েছে সেটা নির্বাচন ছিল না, ছিল একটা সাজানো নাটক। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, জনগণ বয়কট করা সেই ভোটে যারা ক্ষমতায় এসেছে তারা জনগণের প্রতিনিধি নয়। তারা নিজেদের বৈধতা তৈরি করেছে কাগজে, রাস্তায় নয়। এই তথাকথিত মন্ত্রিপরিষদ থেকে মানুষ কতটা নিরাপত্তা আশা করতে পারে, সেটা ফয়জুর রহমানের অভিজ্ঞতাই বলে দিচ্ছে।

আর বিএনপির কথা বলতে গেলে কোথা থেকে শুরু করব? জিয়াউর রহমান সেনাছাউনিতে যে দলটা বানিয়েছিলেন, সেই দল দেশের রাজনীতিতে দুর্নীতি আর মাস্তানির যে সংস্কৃতি ঢুকিয়েছে, আজকের ছিনতাইয়ের এই বাস্তবতা তার ফসল। ১০ শতাংশের কমিশনের যুগ থেকে এখন এসে পৌঁছেছি ৩০ শতাংশের যুগে। শুধু হার বেড়েছে, চরিত্র বদলায়নি। বিএনপির শাসনামলে রাস্তায় ছিনতাইকারীরা যেভাবে দাপিয়ে বেড়িয়েছে, সেটা ঢাকার মানুষ ভোলেনি। তখনকার সেই পেশিশক্তির চর্চা এখন একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। মোটরসাইকেলে ছিনতাই, সংঘবদ্ধ চক্র, ছদ্মবেশে টার্গেট করা, এগুলো পেশাদার অপরাধের ছক। এটা এমনি এমনি হয়নি, এই কাঠামো তৈরি হয়েছে বছরের পর বছর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়।

পুলিশের ডিসি বলছেন ছিনতাইকারীদের ধরে জেলে পাঠালেও তারা জামিনে বেরিয়ে আবার ছিনতাই করে। কথাটা সত্যি। কিন্তু এই আইনি দুর্বলতা কি আকাশ থেকে পড়েছে? এই দুর্বলতা তৈরি করা হয়েছে, পালন করা হয়েছে, কারণ এতে একটা বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তুতন্ত্র টিকে থাকে। ছিনতাইকারী মানে অনেক সময়ই একটা স্থানীয় নেটওয়ার্কের অংশ, যে নেটওয়ার্কের ওপর মহলে রাজনৈতিক ছায়া আছে।

নতুন আইজিপি কড়া নির্দেশ দিয়েছেন, রাতের টহল ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, এপিবিএন মোতায়েন করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ভালো, কিন্তু যে সরকার বৈধ জনরায় ছাড়া ক্ষমতায় বসে আছে, সেই সরকারের পক্ষে টেকসই আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সম্ভব না। কারণ ক্ষমতার বৈধতা না থাকলে রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তৃত্বও থাকে না। পুলিশ টহল দেয় ঠিকই, কিন্তু মানুষ পুলিশকে বিশ্বাস করে না, কারণ পুলিশের ওপরে যারা বসে আছে তাদেরকেও মানুষ নিজের মনে করে না।

মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, কারওয়ান বাজার, এই পুরো শহরটা এখন একটা হটস্পটের মানচিত্র। ভোরের আলো ফোটার আগে রাস্তায় বেরোনো মানুষ জানে না সে ফিরতে পারবে কিনা। সন্ধ্যার পর যাত্রাবাড়ী মোড়ে দাঁড়ানো মানে নিজেকে সাজেশন দেওয়া। ফ্লাইওভারের নিচে চাকু হাতে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তারা কি জানে না যে পুলিশ আছে? জানে। তবু দাঁড়িয়ে থাকে, কারণ তারাও জানে যে এই ব্যবস্থায় তারা নিরাপদ।

“আই হ্যাভ আ প্ল্যান” বলা মানুষটার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তবে সেটা যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল সেটা নয়। এই পরিকল্পনায় আছে অংশগ্রহণহীন ভোট, অবৈধ ক্ষমতা, আর সেই ক্ষমতার ছায়ায় রাস্তায় রাস্তায় ছিনতাইয়ের রাজত্ব। ফয়জুর রহমানের হারানো পাঁচ হাজার টাকা আর মোবাইল ফোন এই পরিকল্পনারই একটা ক্ষুদ্র পরিণতি।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ