ইসলামাবাদের চালাকি বাঙালির চেনা, চেনে না শুধু পাকি রূহানীপুত্রদ্বয় বিএনপি-জামায়াত!

মাসের শুরুতেই পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ার দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে জেতা সরকার এক সন্ধ্যার মধ্যে বাতিল হলো। মুখ্যমন্ত্রীতে তুলে নিয়ে গেলো পুলিশ। প্রদেশ চালানোর ক্ষমতা চলে গেলো ইসলামাবাদের বসানো গভর্নরের হাতে। কারণ হিসেবে দেখানো হলো কথিত “রাষ্ট্রীয়” নিরাপত্তা। এই গল্প পাকিস্তানের জন্য নতুন নয়। আমাদের জন্যও নয়। আমরা এই নাটক একবার নয়, বারবার দেখেছি, আর প্রতিবার দাম দিয়েছি নিজেদের বুকের রক্তে।

১৯৪৮ সালে তারা বলেছিল রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, আর যারা আপত্তি করবে তারা রাষ্ট্রের শত্রু। ১৯৫২ সালে সেই কথার জবাব ঢাকার রাস্তায় গুলি চালিয়ে দেওয়া হলো। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার মানুষ ভোটে জেতা লীগকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিল। যুক্তফ্রন্ট জিতল ২৩৭ আসনের মধ্যে ২২৩টিতে। দেড় মাসও টিকতে দেওয়া হলো না। আদমজীর দাঙ্গার দায় চাপানো হলো নির্বাচিত সরকারের ঘাড়ে, মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক হয়ে গেলেন দেশদ্রোহী, ৯২-ক ধারায় সরকার ভেঙে দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হলো ইস্কান্দার মির্জাকে। যে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব তুলেছিলেন, তাঁকেই শেখানো হলো পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য কাকে বলে!

এরপর একে একে এল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভয় কাটানোর কৌশল। পূর্ব বাংলা ছিল জনসংখ্যায় বেশি, তাই পশ্চিমের প্রদেশগুলোকে জুড়ে এক ইউনিট বানিয়ে “সমতা” আনা হলো। বাঙালির ভোটের জোর কেটে ছোট করার এর চেয়ে নির্লজ্জ উপায় আর কী হতে পারত? ১৯৫৮ সালে নির্বাচনের আগেই মার্শাল ল। আইয়ুব খান এলেন, মৌলিক গণতন্ত্রের নামে ভোটাধিকারই সীমিত হলো। ছয় দফা দিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, জবাবে এল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। অর্থাৎ যে দাবি তোলে, তাকেই বিচ্ছিন্নতাবাদী বানিয়ে ফেলো।

তারপর ১৯৭০। পাকিস্তানের ইতিহাসের প্রথম সত্যিকারের অবাধ নির্বাচন। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি আসনের ১৬০টি জিতল আওয়ামী লীগ, গোটা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল একাই। আইন অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। উল্টো অধিবেশন পিছিয়ে দিলেন ইয়াহিয়া, ভুট্টো বললেন “ইধার হাম, উধার তুম”, আলোচনার নামে সময় কাটানো হলো আর সেই ফাঁকে সৈন্য নামল। ২৫ মার্চের রাতে জনগণের নির্বাচিত নেতাকে বলা হলো রাষ্ট্রদ্রোহী, আর তাঁর ম্যান্ডেট যারা বহন করছিল তাদের ওপর অপারেশন সার্চলাইট। ছক একই। প্রথমে ম্যান্ডেট অস্বীকার, তারপর নেতার গায়ে দেশদ্রোহের ছাপ, শেষে নিরাপত্তার যুক্তিতে ক্ষমতা দখল। খাইবার পাখতুনখাওয়াতে আজ সেই তিন ধাপই হুবহু মিলছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ঘটনা ঢাকার ক্ষমতার ঘরে কোনো কাঁপুনি তুলেছে কি? বিএনপি সরকারে, জামায়াত সংসদে ক্ষমতার ভাগীদার। যে দেশ ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য আজও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি, যে দেশের হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট নিজের লোকেরাই বছরের পর বছর চেপে রেখেছিল, যে দেশ বাংলাদেশের প্রাপ্য সম্পদের হিসাব এখনো মেটায়নি, সেই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গরম করার প্রতিযোগিতায় নেমে ঢাকার ক্ষমতাসীনরা কি ইতিহাসের দায় সুবিধামতো ভুলে বসে আছে? ক্ষমা না চাওয়া রাষ্ট্রকে আলিঙ্গন করা আর ক্ষমা না চাওয়ার অধিকারটাকেই বৈধতা দেওয়া, এই দুইয়ের ফারাক কোথায়?

একাত্তরে জামাতে ইসলাম সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি দাঁড়িয়েছিল বাঙালিদের বিরুদ্ধে, যার অধীনে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস গড়ে উঠেছিল, যে দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী যুদ্ধাপরাধের বিচারে দণ্ডিত হয়েছেন, সেই দলের কাছে পাকিস্তানের ছক নিয়ে প্রশ্ন তোলা আশা করাই অবশ্য বোকামি। নিজের জন্মের অধ্যায়ের বিরুদ্ধে কে কবে কলম ধরে? তাদের কাছে পাকিস্তান শত্রু নয়, ভুল জায়গায় ভেঙে যাওয়া এক আদর্শের স্মৃতি।

আর বিএনপির ঝোঁকের উৎস খুঁজতে হলে যেতে হয় ১৯৭৫-এর পর। জিয়াউর রহমানের আমলেই জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠল, গোলাম আযমরা ফিরে এলেন রাজনীতির মঞ্চে, ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধান থেকে বাদ পড়ল, “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” নামে এক নতুন পরিচয় দাঁড় করানো হলো, যার ভেতরে বাঙালি পরিচয়ের চেয়ে মুসলিম পরিচয়ের ওজন বেশি। ২০০১ সালে সেই সম্পর্ক গাঁটছড়ায় রূপ নিল, নিজামী-মুজাহিদরা মন্ত্রী হলেন। যে দল একাত্তরের পরাজিত পক্ষের দলকে মন্ত্রিসভায় বসিয়েছিল, সেই দল আজ খাইবার পাখতুনখাওয়া নিয়ে নীরব থাকলে অবাক হওয়ার কী আছে?

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে এর আসল কারণ কোনো একক কূটনীতি নয়। কারণটা একটা রাজনৈতিক বংশধারা। ভারতবিরোধিতাকে পুঁজি করে পাকিস্তানকে স্বাভাবিক মিত্র ভাবার পুরনো অভ্যাস, ১৯৪৭-এর দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রতি মুগ্ধতা, আর একাত্তরকে পুরোপুরি “জাতীয় ঐকমত্য” হিসেবে মেনে নিতে অনীহা। এই তিনের মিশেলে যে মানসিকতা তৈরি হয়, সেখানে ইসলামাবাদের অপরাধ ক্ষমার যোগ্য, আর ইসলামাবাদের মিত্রতা গর্বের।

ইতিহাস অবশ্য কাউকে ছাড় দেয় না। ১৯৫৪ সালে যাঁকে ঢাকায় বসানো হয়েছিল সেই ইস্কান্দার মির্জাকে পরে সেই সেনাবাহিনীই লন্ডনে নির্বাসনে পাঠায়, যাদের তিনি নিজে ডেকে এনেছিলেন। পাকিস্তানের মিত্র হতে চাওয়াদের জন্য এটাই চিরকালের শিক্ষা। খাইবার পাখতুনখাওয়াতে আজ যা ঘটছে, সেটা সেই রাষ্ট্রের স্বভাব নামা গ্রন্থের নতুন একটা পৃষ্ঠা, আর ঢাকার ক্ষমতাসীনরা সেই পৃষ্ঠাটা পড়েও না পড়ার ভান ভরে বসে আছে।

মাসের শুরুতেই পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ার দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে জেতা সরকার এক সন্ধ্যার মধ্যে বাতিল হলো। মুখ্যমন্ত্রীতে তুলে নিয়ে গেলো পুলিশ। প্রদেশ চালানোর ক্ষমতা চলে গেলো ইসলামাবাদের বসানো গভর্নরের হাতে। কারণ হিসেবে দেখানো হলো কথিত “রাষ্ট্রীয়” নিরাপত্তা। এই গল্প পাকিস্তানের জন্য নতুন নয়। আমাদের জন্যও নয়। আমরা এই নাটক একবার নয়, বারবার দেখেছি, আর প্রতিবার দাম দিয়েছি নিজেদের বুকের রক্তে।

১৯৪৮ সালে তারা বলেছিল রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, আর যারা আপত্তি করবে তারা রাষ্ট্রের শত্রু। ১৯৫২ সালে সেই কথার জবাব ঢাকার রাস্তায় গুলি চালিয়ে দেওয়া হলো। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার মানুষ ভোটে জেতা লীগকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিল। যুক্তফ্রন্ট জিতল ২৩৭ আসনের মধ্যে ২২৩টিতে। দেড় মাসও টিকতে দেওয়া হলো না। আদমজীর দাঙ্গার দায় চাপানো হলো নির্বাচিত সরকারের ঘাড়ে, মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক হয়ে গেলেন দেশদ্রোহী, ৯২-ক ধারায় সরকার ভেঙে দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হলো ইস্কান্দার মির্জাকে। যে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব তুলেছিলেন, তাঁকেই শেখানো হলো পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য কাকে বলে!

এরপর একে একে এল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভয় কাটানোর কৌশল। পূর্ব বাংলা ছিল জনসংখ্যায় বেশি, তাই পশ্চিমের প্রদেশগুলোকে জুড়ে এক ইউনিট বানিয়ে “সমতা” আনা হলো। বাঙালির ভোটের জোর কেটে ছোট করার এর চেয়ে নির্লজ্জ উপায় আর কী হতে পারত? ১৯৫৮ সালে নির্বাচনের আগেই মার্শাল ল। আইয়ুব খান এলেন, মৌলিক গণতন্ত্রের নামে ভোটাধিকারই সীমিত হলো। ছয় দফা দিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, জবাবে এল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। অর্থাৎ যে দাবি তোলে, তাকেই বিচ্ছিন্নতাবাদী বানিয়ে ফেলো।

তারপর ১৯৭০। পাকিস্তানের ইতিহাসের প্রথম সত্যিকারের অবাধ নির্বাচন। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি আসনের ১৬০টি জিতল আওয়ামী লীগ, গোটা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল একাই। আইন অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। উল্টো অধিবেশন পিছিয়ে দিলেন ইয়াহিয়া, ভুট্টো বললেন “ইধার হাম, উধার তুম”, আলোচনার নামে সময় কাটানো হলো আর সেই ফাঁকে সৈন্য নামল। ২৫ মার্চের রাতে জনগণের নির্বাচিত নেতাকে বলা হলো রাষ্ট্রদ্রোহী, আর তাঁর ম্যান্ডেট যারা বহন করছিল তাদের ওপর অপারেশন সার্চলাইট। ছক একই। প্রথমে ম্যান্ডেট অস্বীকার, তারপর নেতার গায়ে দেশদ্রোহের ছাপ, শেষে নিরাপত্তার যুক্তিতে ক্ষমতা দখল। খাইবার পাখতুনখাওয়াতে আজ সেই তিন ধাপই হুবহু মিলছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ঘটনা ঢাকার ক্ষমতার ঘরে কোনো কাঁপুনি তুলেছে কি? বিএনপি সরকারে, জামায়াত সংসদে ক্ষমতার ভাগীদার। যে দেশ ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য আজও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি, যে দেশের হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট নিজের লোকেরাই বছরের পর বছর চেপে রেখেছিল, যে দেশ বাংলাদেশের প্রাপ্য সম্পদের হিসাব এখনো মেটায়নি, সেই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গরম করার প্রতিযোগিতায় নেমে ঢাকার ক্ষমতাসীনরা কি ইতিহাসের দায় সুবিধামতো ভুলে বসে আছে? ক্ষমা না চাওয়া রাষ্ট্রকে আলিঙ্গন করা আর ক্ষমা না চাওয়ার অধিকারটাকেই বৈধতা দেওয়া, এই দুইয়ের ফারাক কোথায়?

একাত্তরে জামাতে ইসলাম সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি দাঁড়িয়েছিল বাঙালিদের বিরুদ্ধে, যার অধীনে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস গড়ে উঠেছিল, যে দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী যুদ্ধাপরাধের বিচারে দণ্ডিত হয়েছেন, সেই দলের কাছে পাকিস্তানের ছক নিয়ে প্রশ্ন তোলা আশা করাই অবশ্য বোকামি। নিজের জন্মের অধ্যায়ের বিরুদ্ধে কে কবে কলম ধরে? তাদের কাছে পাকিস্তান শত্রু নয়, ভুল জায়গায় ভেঙে যাওয়া এক আদর্শের স্মৃতি।

আর বিএনপির ঝোঁকের উৎস খুঁজতে হলে যেতে হয় ১৯৭৫-এর পর। জিয়াউর রহমানের আমলেই জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠল, গোলাম আযমরা ফিরে এলেন রাজনীতির মঞ্চে, ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধান থেকে বাদ পড়ল, “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” নামে এক নতুন পরিচয় দাঁড় করানো হলো, যার ভেতরে বাঙালি পরিচয়ের চেয়ে মুসলিম পরিচয়ের ওজন বেশি। ২০০১ সালে সেই সম্পর্ক গাঁটছড়ায় রূপ নিল, নিজামী-মুজাহিদরা মন্ত্রী হলেন। যে দল একাত্তরের পরাজিত পক্ষের দলকে মন্ত্রিসভায় বসিয়েছিল, সেই দল আজ খাইবার পাখতুনখাওয়া নিয়ে নীরব থাকলে অবাক হওয়ার কী আছে?

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে এর আসল কারণ কোনো একক কূটনীতি নয়। কারণটা একটা রাজনৈতিক বংশধারা। ভারতবিরোধিতাকে পুঁজি করে পাকিস্তানকে স্বাভাবিক মিত্র ভাবার পুরনো অভ্যাস, ১৯৪৭-এর দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রতি মুগ্ধতা, আর একাত্তরকে পুরোপুরি “জাতীয় ঐকমত্য” হিসেবে মেনে নিতে অনীহা। এই তিনের মিশেলে যে মানসিকতা তৈরি হয়, সেখানে ইসলামাবাদের অপরাধ ক্ষমার যোগ্য, আর ইসলামাবাদের মিত্রতা গর্বের।

ইতিহাস অবশ্য কাউকে ছাড় দেয় না। ১৯৫৪ সালে যাঁকে ঢাকায় বসানো হয়েছিল সেই ইস্কান্দার মির্জাকে পরে সেই সেনাবাহিনীই লন্ডনে নির্বাসনে পাঠায়, যাদের তিনি নিজে ডেকে এনেছিলেন। পাকিস্তানের মিত্র হতে চাওয়াদের জন্য এটাই চিরকালের শিক্ষা। খাইবার পাখতুনখাওয়াতে আজ যা ঘটছে, সেটা সেই রাষ্ট্রের স্বভাব নামা গ্রন্থের নতুন একটা পৃষ্ঠা, আর ঢাকার ক্ষমতাসীনরা সেই পৃষ্ঠাটা পড়েও না পড়ার ভান ভরে বসে আছে।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ