শেখ হাসিনা : আলোর দিশারী, সাহসের ঠিকানা

সাইফুল্লাহ্ আল মামুন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যা কেবল একটি ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে না, বরং একটি জাতির সংগ্রাম, স্বপ্ন ও অগ্রযাত্রার প্রতীক হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনা তেমনই একটি নাম। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি নিজের যোগ্যতা, ত্যাগ ও দূরদর্শিতায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছেন।

ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র তাঁর অস্তিত্ববাদী দর্শনে বারবার বলেছেন- মানুষ তার কর্মের মধ্য দিয়েই নিজেকে গড়ে তোলে, আর সেই কর্মের দায়ভার শেষ পর্যন্ত তার নিজেরই। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এই দায় কেবল ব্যক্তিগত থাকে না, তা হয়ে ওঠে সমষ্টির নিয়তি। শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়- তিনি যেন একাধারে ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী, আঘাতের নির্মম লক্ষ্যবস্তু এবং ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি পেরিয়ে গড়ে ওঠা এক অদম্য রাজনীতির পথপ্রদর্শক।

১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া শিশুটি কালের আবর্তে পরিণত হয়েছেন ১৮ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীকে, প্রেরণা আর দুর্বার সাহসের ঠিকানায়। রাজনীতির আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা এই সন্তানের জীবন কোনো নেত্রীর গল্প নয় শুধু; এটি টিকে থাকার, বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর এবং একটি ভঙ্গুর জাতিকে বিশ্বমঞ্চে পুনর্প্রতিষ্ঠার মহাকাব্যিক আখ্যান।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে জাতির পিতাসহ পরিবারের প্রায় সবাইকে হারান শেখ হাসিনা। প্রবাসে থাকার কারণে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া দুই বোনের সামনে তখন শুধু অন্ধকার আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। অন্য যেকোনো মানুষের জন্য জীবন থমকে দাঁড়ানোই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু রোমান কবি ভার্জিল তাঁর ‘ঈনিদ’ কাব্যে লিখেছিলেন- “Tu ne cede malis, sed contra audentior ito” (বিপদের কাছে মাথা নোয়াবে না, বরং আরও সাহসের সঙ্গে তার মুখোমুখি হও)। প্রবাসজীবনের কঠিন সময় পেরিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে কালবৈশাখীর সন্ধ্যায় স্বৈরশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত ছিল ঠিক সেই সাহসেরই দৃষ্টান্ত। এই প্রত্যাবর্তন কেবল ব্যক্তির জন্মভূমিতে ফেরা ছিল না, ছিল বাংলাদেশের আপন কক্ষপথে ফেরার সূচনা।

দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি রাজপথে থেকেছেন, বারবার কারাবরণ করেছেন, জীবনে বহুবার প্রাণনাশের হুমকি ও হামলার মুখে পড়েছেন। তবু থেমে যাননি, থমকে যাননি। অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটে চলেছেন পিতার দেখানো পথে, পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে।

দেশের মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাসের ভরসায় শেখ হাসিনা প্রথমবার ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই মেয়াদেই বাংলাদেশ অর্জন করে যুগান্তকারী সাফল্য- পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটান, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়; একইসঙ্গে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদন করে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির ভিত মজবুত করেন। সেই থেকেই বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ শুরু করে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের আসল শক্তি প্রস্ফুটিত হয় পরবর্তী মেয়াদগুলোয়। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গঠনের রূপকল্প প্রথম পেশ করার সময় অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, ফ্রিল্যান্সিং, ই-গভর্ন্যান্স ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করে তুলেছিল।

শেখ হাসিনা মানে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, শেখ হাসিনা মানে অদম্য আত্মমর্যাদা- এর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত পদ্মা সেতু। আন্তর্জাতিক নানা জটিলতার মুখোমুখি হয়েও নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত বিশ্বকে দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশের সক্ষমতা। পরবর্তীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও থার্ড টার্মিনালের মতো একের পর এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তিনি প্রমাণ করেছেন- বাঙালি জাতি চাইলে নিজের শক্তিতে যেকোনো উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।

একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনার মেধা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃত। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষ নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সোচ্চার হয়ে তিনি বিশ্বমানের পরিবেশকামী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। লাখ লাখ মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সাময়িক আশ্রয় দিয়ে যে মানবতা প্রদর্শন করেন, তাতে বিশ্বমিডিয়া তাঁকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বা ‘মানবতার মা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে।

সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী তৈরি ও দারিদ্র্য বিমোচনেও তাঁর সরকারের পদক্ষেপ উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য রোল মডেল- বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীনদের গৃহদান তৃণমূল মানুষের সামাজিক অবস্থান উন্নত করেছে। বিনামূল্যে বই বিতরণ, মেয়েদের উপবৃত্তি এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক নতুন নারী সমাজ, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।

শুধু দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা কিংবা গণতন্ত্র সুরক্ষায় নয়, শেখ হাসিনা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশি-বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে মোকাবেলা করেছেন অসীম সাহসের সঙ্গে। নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেছেন, কিন্তু দেশের স্বার্থের প্রশ্নে সবসময় অটুট ও অবিচল থেকেছেন।

শেখ হাসিনার সাহসী দেশপ্রেম আর বাংলাদেশের এই অর্জন ও অগ্রগতি একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসর, দেশি-বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং বঙ্গবন্ধুর খুনি ও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের সহ্য হয়নি। মেটিকুলাস ষড়যন্ত্র করে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যার নীলনকশা করে তারা। বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া দুই আমানত- বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা- অল্পের জন্য সে যাত্রায় প্রাণে রক্ষা পান।

নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা সাফল্যে নয়, সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়ে থাকার সাহসেই। মার্কিন প্রাবন্ধিক র‍্যালফ ওয়াল্ডো এমার্সন তাঁর ‘সেলফ-রিলায়েন্স’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “To be great is to be misunderstood” (মহান হতে হলে অনেকের ভুল বোঝাবুঝির শিকার হতে হয়)। কথাগুলো বঙ্গবন্ধুকন্যার সঙ্গে একেবারে মিলে যায়। মেটিকুলাস গোষ্ঠী মিথ্যা আর গালগল্পে মানুষকে বিভ্রান্ত করে শেখ হাসিনার বিপক্ষে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মানুষ এখন তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। শেখ হাসিনা পরম ধৈর্য ও বিচক্ষণতা নিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখেও সত্যের পথে সাহস নিয়ে অটুট ছিলেন, এখনো আছেন এবং আমৃত্যু থাকবেন। এটাই শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বড় গুণ ও অসীম শক্তি।

আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁদের কাছে তিনি শুধু রাষ্ট্রনায়ক নন, অভিভাবকের মতো- শুধু অপার স্নেহ কিংবা প্রয়োজনীয় শাসনই নয়, সাংগঠনিক দুর্দিনে দলকে একত্র রাখা, তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করা এবং কঠিন সিদ্ধান্তে দৃঢ়চিত্ত থাকা তাঁকে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীসমর্থকদের কাছে সুমহান করেছে।

রোমান দার্শনিক সেনেকা তাঁর ‘দে ইরা’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, “veritatem dies aperit”- সময়ই সত্যকে উন্মোচন করে। মেটিকুলাস ষড়যন্ত্র আর অপপ্রচারে রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে আজ যে বিতর্কের মেঘ জমে থাকুক না কেন, ইতিহাসের আদালত যথাসময়ে তাঁকেই সুমহান স্থান দেবে, যিনি ঝড়ের দিনে হাল ছাড়েননি। তিনি আমাদের আবেগ, অনুভূতি, প্রেরণা ও সাহসের ঠিকানা জননেত্রী শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনা কেবলমাত্র একজন ব্যক্তি নন। তিনি বাংলাদেশের পতাকা, মানচিত্র, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, সংবিধান, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র সুরক্ষার আলোর দিশারী। উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার অদম্য সাহস। তিনি এক সংগ্রামী রাজনৈতিক যাত্রার স্মারক, যাতে জড়িয়ে আছে হাজারো নেতাকর্মীর আত্মত্যাগ ও একটি জাতির স্বপ্ন।

ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, তা আসে আর যায়; কিন্তু যে নাম মাটির সঙ্গে মিশে থাকে, যে ত্যাগ দেশের মানচিত্রে উৎকীর্ণ হয়ে থাকে, তাকে মোছা যায় না। ঝড় থামে, মেঘ কাটে- কিন্তু যে গাছ ঝড়ের রাতেও শিকড় আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে মাটি মনে রাখে চিরকাল। শেখ হাসিনা সেই শিকড়ের নাম।

তাঁর জন্মদিনে আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব শুধু শুভেচ্ছা জানানো নয়, বরং তাঁর আদর্শ ও নীতির প্রতি নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্ন- ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য- তা বাস্তবায়নে তাঁর নেতৃত্বের ভূমিকা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় কর্তব্য।

বাংলাদেশের ত্যাগের ইতিহাসে, সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ে, সাফল্য ও অর্জনের খেরোখাতায় এক চিরন্তন নাম শেখ হাসিনা- আলোর দিশারী, সাহসের ঠিকানা। তাই প্রজন্মের আকুল প্রার্থনা- শতায়ু হোন আমাদের শেখ হাসিনা, বাংলাদেশের যোগ্যতম নেতা।

লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটি।

সাইফুল্লাহ্ আল মামুন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যা কেবল একটি ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে না, বরং একটি জাতির সংগ্রাম, স্বপ্ন ও অগ্রযাত্রার প্রতীক হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনা তেমনই একটি নাম। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি নিজের যোগ্যতা, ত্যাগ ও দূরদর্শিতায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছেন।

ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র তাঁর অস্তিত্ববাদী দর্শনে বারবার বলেছেন- মানুষ তার কর্মের মধ্য দিয়েই নিজেকে গড়ে তোলে, আর সেই কর্মের দায়ভার শেষ পর্যন্ত তার নিজেরই। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এই দায় কেবল ব্যক্তিগত থাকে না, তা হয়ে ওঠে সমষ্টির নিয়তি। শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়- তিনি যেন একাধারে ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী, আঘাতের নির্মম লক্ষ্যবস্তু এবং ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি পেরিয়ে গড়ে ওঠা এক অদম্য রাজনীতির পথপ্রদর্শক।

১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া শিশুটি কালের আবর্তে পরিণত হয়েছেন ১৮ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীকে, প্রেরণা আর দুর্বার সাহসের ঠিকানায়। রাজনীতির আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা এই সন্তানের জীবন কোনো নেত্রীর গল্প নয় শুধু; এটি টিকে থাকার, বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর এবং একটি ভঙ্গুর জাতিকে বিশ্বমঞ্চে পুনর্প্রতিষ্ঠার মহাকাব্যিক আখ্যান।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে জাতির পিতাসহ পরিবারের প্রায় সবাইকে হারান শেখ হাসিনা। প্রবাসে থাকার কারণে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া দুই বোনের সামনে তখন শুধু অন্ধকার আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। অন্য যেকোনো মানুষের জন্য জীবন থমকে দাঁড়ানোই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু রোমান কবি ভার্জিল তাঁর ‘ঈনিদ’ কাব্যে লিখেছিলেন- “Tu ne cede malis, sed contra audentior ito” (বিপদের কাছে মাথা নোয়াবে না, বরং আরও সাহসের সঙ্গে তার মুখোমুখি হও)। প্রবাসজীবনের কঠিন সময় পেরিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে কালবৈশাখীর সন্ধ্যায় স্বৈরশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত ছিল ঠিক সেই সাহসেরই দৃষ্টান্ত। এই প্রত্যাবর্তন কেবল ব্যক্তির জন্মভূমিতে ফেরা ছিল না, ছিল বাংলাদেশের আপন কক্ষপথে ফেরার সূচনা।

দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি রাজপথে থেকেছেন, বারবার কারাবরণ করেছেন, জীবনে বহুবার প্রাণনাশের হুমকি ও হামলার মুখে পড়েছেন। তবু থেমে যাননি, থমকে যাননি। অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটে চলেছেন পিতার দেখানো পথে, পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে।

দেশের মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাসের ভরসায় শেখ হাসিনা প্রথমবার ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই মেয়াদেই বাংলাদেশ অর্জন করে যুগান্তকারী সাফল্য- পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটান, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়; একইসঙ্গে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদন করে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির ভিত মজবুত করেন। সেই থেকেই বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ শুরু করে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের আসল শক্তি প্রস্ফুটিত হয় পরবর্তী মেয়াদগুলোয়। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গঠনের রূপকল্প প্রথম পেশ করার সময় অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, ফ্রিল্যান্সিং, ই-গভর্ন্যান্স ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করে তুলেছিল।

শেখ হাসিনা মানে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, শেখ হাসিনা মানে অদম্য আত্মমর্যাদা- এর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত পদ্মা সেতু। আন্তর্জাতিক নানা জটিলতার মুখোমুখি হয়েও নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত বিশ্বকে দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশের সক্ষমতা। পরবর্তীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও থার্ড টার্মিনালের মতো একের পর এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তিনি প্রমাণ করেছেন- বাঙালি জাতি চাইলে নিজের শক্তিতে যেকোনো উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।

একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনার মেধা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃত। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষ নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সোচ্চার হয়ে তিনি বিশ্বমানের পরিবেশকামী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। লাখ লাখ মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সাময়িক আশ্রয় দিয়ে যে মানবতা প্রদর্শন করেন, তাতে বিশ্বমিডিয়া তাঁকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বা ‘মানবতার মা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে।

সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী তৈরি ও দারিদ্র্য বিমোচনেও তাঁর সরকারের পদক্ষেপ উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য রোল মডেল- বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীনদের গৃহদান তৃণমূল মানুষের সামাজিক অবস্থান উন্নত করেছে। বিনামূল্যে বই বিতরণ, মেয়েদের উপবৃত্তি এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক নতুন নারী সমাজ, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।

শুধু দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা কিংবা গণতন্ত্র সুরক্ষায় নয়, শেখ হাসিনা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশি-বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে মোকাবেলা করেছেন অসীম সাহসের সঙ্গে। নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেছেন, কিন্তু দেশের স্বার্থের প্রশ্নে সবসময় অটুট ও অবিচল থেকেছেন।

শেখ হাসিনার সাহসী দেশপ্রেম আর বাংলাদেশের এই অর্জন ও অগ্রগতি একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসর, দেশি-বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং বঙ্গবন্ধুর খুনি ও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের সহ্য হয়নি। মেটিকুলাস ষড়যন্ত্র করে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যার নীলনকশা করে তারা। বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া দুই আমানত- বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা- অল্পের জন্য সে যাত্রায় প্রাণে রক্ষা পান।

নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা সাফল্যে নয়, সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়ে থাকার সাহসেই। মার্কিন প্রাবন্ধিক র‍্যালফ ওয়াল্ডো এমার্সন তাঁর ‘সেলফ-রিলায়েন্স’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “To be great is to be misunderstood” (মহান হতে হলে অনেকের ভুল বোঝাবুঝির শিকার হতে হয়)। কথাগুলো বঙ্গবন্ধুকন্যার সঙ্গে একেবারে মিলে যায়। মেটিকুলাস গোষ্ঠী মিথ্যা আর গালগল্পে মানুষকে বিভ্রান্ত করে শেখ হাসিনার বিপক্ষে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মানুষ এখন তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। শেখ হাসিনা পরম ধৈর্য ও বিচক্ষণতা নিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখেও সত্যের পথে সাহস নিয়ে অটুট ছিলেন, এখনো আছেন এবং আমৃত্যু থাকবেন। এটাই শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বড় গুণ ও অসীম শক্তি।

আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁদের কাছে তিনি শুধু রাষ্ট্রনায়ক নন, অভিভাবকের মতো- শুধু অপার স্নেহ কিংবা প্রয়োজনীয় শাসনই নয়, সাংগঠনিক দুর্দিনে দলকে একত্র রাখা, তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করা এবং কঠিন সিদ্ধান্তে দৃঢ়চিত্ত থাকা তাঁকে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীসমর্থকদের কাছে সুমহান করেছে।

রোমান দার্শনিক সেনেকা তাঁর ‘দে ইরা’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, “veritatem dies aperit”- সময়ই সত্যকে উন্মোচন করে। মেটিকুলাস ষড়যন্ত্র আর অপপ্রচারে রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে আজ যে বিতর্কের মেঘ জমে থাকুক না কেন, ইতিহাসের আদালত যথাসময়ে তাঁকেই সুমহান স্থান দেবে, যিনি ঝড়ের দিনে হাল ছাড়েননি। তিনি আমাদের আবেগ, অনুভূতি, প্রেরণা ও সাহসের ঠিকানা জননেত্রী শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনা কেবলমাত্র একজন ব্যক্তি নন। তিনি বাংলাদেশের পতাকা, মানচিত্র, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, সংবিধান, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র সুরক্ষার আলোর দিশারী। উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার অদম্য সাহস। তিনি এক সংগ্রামী রাজনৈতিক যাত্রার স্মারক, যাতে জড়িয়ে আছে হাজারো নেতাকর্মীর আত্মত্যাগ ও একটি জাতির স্বপ্ন।

ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, তা আসে আর যায়; কিন্তু যে নাম মাটির সঙ্গে মিশে থাকে, যে ত্যাগ দেশের মানচিত্রে উৎকীর্ণ হয়ে থাকে, তাকে মোছা যায় না। ঝড় থামে, মেঘ কাটে- কিন্তু যে গাছ ঝড়ের রাতেও শিকড় আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে মাটি মনে রাখে চিরকাল। শেখ হাসিনা সেই শিকড়ের নাম।

তাঁর জন্মদিনে আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব শুধু শুভেচ্ছা জানানো নয়, বরং তাঁর আদর্শ ও নীতির প্রতি নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্ন- ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য- তা বাস্তবায়নে তাঁর নেতৃত্বের ভূমিকা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় কর্তব্য।

বাংলাদেশের ত্যাগের ইতিহাসে, সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ে, সাফল্য ও অর্জনের খেরোখাতায় এক চিরন্তন নাম শেখ হাসিনা- আলোর দিশারী, সাহসের ঠিকানা। তাই প্রজন্মের আকুল প্রার্থনা- শতায়ু হোন আমাদের শেখ হাসিনা, বাংলাদেশের যোগ্যতম নেতা।

লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটি।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ