মাঝরাতে ২৫০ জন মানুষ, দেশি অস্ত্র হাতে, একটা টিকাদান কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিয়ে গেল, আর রাষ্ট্রের কোনো বাহিনী তাদের রুখতে পারল না। এইটাই ২০২৬ সালের বাংলাদেশ, যেখানে ক্ষমতায় বিএনপি, পাশে বসে জামায়াত, আর মাঝখানে পিষে যাচ্ছে মিরপুরের গরিব মা আর শিশুরা।
মিরপুর ১ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার পঞ্চাশ বছর ধরে বিনা পয়সায় সেবা দিয়ে এসেছে এলাকার দরিদ্র মানুষকে। প্রসূতি সেবা, শিশুর টিকা, পরিবার পরিকল্পনা, যা রাষ্ট্র নিজে ঠিকমতো দিতে পারে না, সেই কাজটাই করে আসছিল এই কেন্দ্র। আর একরাতে সেই কেন্দ্রকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো, লুট হয়ে গেল আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, ভ্যাকসিন, নগদ টাকা, এমনকি সরকারি ইপিআই টিকার রেজিস্টার পর্যন্ত। যে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল পরদিন থেকে, সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। শিশুরা টিকা পাবে না, কারণ কারও জমির লোভ মেটাতে হবে।
আর এই পুরো ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা কী? থানার ওসি নিজেই স্বীকার করছেন, খবর পেয়ে রাতে গিয়ে দেখেছেন শুধু উৎসুক জনতা দাঁড়িয়ে আছে। মানে আড়াইশ মুখোশধারী মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে একটা প্রতিষ্ঠান ভেঙে, লুট করে, দখল করে চলে গেল, আর রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ দেখল। এই যদি হয় আইনের শাসনের নমুনা, তাহলে বুঝতে বাকি থাকে না কাদের ছত্রছায়ায় এই সাহস তৈরি হয়েছে।
এই দৃশ্য নতুন না। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ঠিক এই ছবিটাই বারবার দেখেছে বাংলাদেশ। জমি দখল, মাস্তানতন্ত্র, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই তরফের সাধারণ মানুষের ওপর সমান নিপীড়ন, আর প্রশাসনের নীরব দর্শকের ভূমিকা, এসবই সেই সময়ের পরিচিত বাস্তবতা। জোটের নেতাকর্মীদের নাম জড়িয়ে যাওয়া চাঁদাবাজি আর দখলবাজির অভিযোগ তখন এতটাই সাধারণ হয়ে উঠেছিল যে মানুষ ধরেই নিয়েছিল, ক্ষমতার আশপাশে যারা আছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও লাভ নেই। এখন কুড়ি বছর পর আবার সেই একই বাংলাদেশ ফিরে এসেছে, শুধু সাল বদলেছে, চরিত্র বদলায়নি।
একটা প্রতিষ্ঠানকে গুঁড়িয়ে তার জায়গায় রাতারাতি একটা দোকানদার সমিতির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া, এইটা কোনো এলোমেলো অপরাধ না। এইটা সংগঠিত, পরিকল্পিত, এবং বেপরোয়া। এত মানুষ জড়ো করে, অস্ত্র নিয়ে, নিরাপত্তাকর্মী জিম্মি করে, ভবন ভেঙে দখল নেওয়ার সাহস এমনি এমনি আসে না। এই সাহসের উৎস কোথায়, সেই প্রশ্নটাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ঘুরেফিরে চোখ যায় ক্ষমতার বারান্দার দিকেই।
জাতীয় সংসদে বিএনপির সঙ্গে ক্ষমতার ভাগীদার জামায়াতে ইসলামীও এই দায় এড়াতে পারে না। যে জোট রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, রাজধানীর বুকে একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা যদি তাদের নাকের ডগায় ঘটে যায় এবং কেউ ধরাও না পড়ে, তাহলে জবাবদিহিতা তাদেরই করতে হবে। ক্ষমতা মানেই দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব থেকে পালানোর কোনো সুযোগ নেই।
গরিব মানুষের চিকিৎসাসেবা, শিশুর টিকা, প্রসূতি মায়ের নিরাপত্তা, এসব আজ কারও জমি দখলের লোভের কাছে জিম্মি। আর যে রাষ্ট্র এই জিম্মিদশা থামাতে পারে না, সেই রাষ্ট্র কার স্বার্থে চলছে, সেই প্রশ্নটা এখন সময়ের দাবি।

