২০০১ সাল। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল, সঙ্গে জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। তারপরের পাঁচ বছর দেশ মনে রেখেছে ভিন্নমতের ওপর নিপীড়ন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা আর আইনশৃঙ্খলার চূড়ান্ত ভেঙে পড়া হিসেবে। পঁচিশ বছর পর, ২০২৬ সালে, বিএনপি আবার ক্ষমতায়। জামায়াত এবার সরকারে নেই ঠিকই, কিন্তু সংসদের ভেতরে তাদের উপস্থিতি বিশাল, প্রভাব প্রশ্নাতীত। আর সরকার গঠনের সাত মাস পার হতেই দেশের সামনে যে চিত্র উঠে এসেছে, সেটা দেখলে যে কারো গা শিউরে ওঠার কথা।
শুধু জানুয়ারি থেকে জুলাই, এই সাত মাসেই হত্যা মামলা হয়েছে দুই হাজার ছিয়াত্তরটি। গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল উনিশশো সাতচল্লিশ। মানে খুনের সংখ্যা বেড়েছে, কমেনি। একটা সরকার যখন বলে তারা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এনেছে, তখন এই সংখ্যাটা তাদের মুখের ওপর একটা চড়ের মতো লাগে।
নারী আর কিশোরীদের ওপর নির্যাতনের হিসাব আরও ভয়ংকর। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসের হিসাবে বছরের প্রথম ছয় মাসেই এক হাজার ছয়শো একুশ জন নারী ও কিশোরী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার চারশো চারজন, যাদের মধ্যে দুইশো আটত্রিশজনই শিশু আর কিশোরী। আটাশি জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। সতেরো জন ধর্ষণের পর খুন হয়ে গেছেন। আরেকটি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে সাত মাসে ধর্ষণের শিকার নারীর সংখ্যা চারশো, আর ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন সাঁইত্রিশ জন। পারিবারিক সহিংসতায় তিনশো বিশজন নারী প্রাণ হারিয়েছেন, দুইশো এগারো জন আহত হয়েছেন। যৌতুকের বলি হয়েছেন উনিশজন নারী।
শিশুরাও রেহাই পায়নি। ছয় মাসে এক হাজার সাতাত্তরজন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, আর তিনশো পাঁচজন শিশু মারা গেছে। যে দেশে সরকার প্রতিদিন উন্নয়নের গল্প শোনায়, সেই দেশে প্রতিদিন গড়ে দেড়টির বেশি শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বা মারা যাচ্ছে, এই বাস্তবতা কোনো প্রেস ব্রিফিং দিয়ে ঢাকা যায় না।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থা নিয়ে কথা বললে ২০০১-০৬ এর স্মৃতি আরও জোরালোভাবে ফিরে আসে। ছয় মাসে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা দুইশো সাতান্নটি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দুইশো একষট্টি জন, নিহত হয়েছেন চুয়াল্লিশ জন। বাষট্টিটি উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর আর লুটপাট হয়েছে। সাতচল্লিশটি বাড়ি আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট আর আগুন দেওয়া হয়েছে। পনেরোটি উপাসনালয়ের জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। যে দলগুলো ভোটের আগে সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে টানতে বিশেষ সেল খুলেছিল, প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি দিয়েছিল, তাদেরই শাসনামলে মন্দিরে হামলা আর ঘরবাড়ি পোড়ানোর এই সংখ্যাগুলো একটা প্রশ্ন তুলে দেয়, প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে দূরত্বটা কতটা।
আইনের শাসন বলে যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে, সেটাও এই সাত মাসে বড় ধাক্কা খেয়েছে। মব সহিংসতায় সাত মাসে মারা গেছেন একশো চৌত্রিশ জন। এইচআরএসএসের হিসাবে ছয় মাসে দুইশো একষট্টিটি মব সহিংসতার ঘটনায় নিহত একশো তেত্রিশ জন, আহত দুইশো ছাপ্পান্ন জন। বিচার ব্যবস্থার বদলে রাস্তায় জনতার হাতে বিচার আর শাস্তির এই প্রবণতা বলে দেয়, রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের চোখে।
রাজনৈতিক সহিংসতার হিসাবও কম ভয়াবহ না। সাত মাসে চারশো ঘটনায় নিহত সাতাত্তর জন, আহত প্রায় তিন হাজার। আওয়ামী লীগের লক্ষাধিক নেতাকর্মীকে মিথ্যা মামলায় আটক করা হয়েছে বলে প্রমাণ মিলেছে। সাংবাদিকদের হয়রানি আর সাইবার আইনে মামলা, গ্রেপ্তারের অভিযোগও কম নয়। যে সরকার ক্ষমতায় এসেছিল তথাকথিত সংস্কার আর সবার আগে বাংলাদেশের স্টান্টবাজি করে, সেই সরকারের আমলেই বিরোধী মত দমনের পুরনো চিত্র এভাবে ফিরে আসাটা কাকতালীয় মোটেও না।
কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যাটাও নীরবে বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে সাত মাসে একাত্তর জন কারাগারে মারা গেছেন। রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা একজন মানুষের নিরাপত্তা, চিকিৎসা আর মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, অথচ এই মৃত্যুগুলোর স্বচ্ছ তদন্তের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।
সব মিলিয়ে সাত মাসের হিসাব দাঁড়ায় এমন, দুই হাজার ছিয়াত্তর খুনের মামলা, চারশো ধর্ষণ, ধর্ষণের পর সাঁইত্রিশজনের মৃত্যু, মব সহিংসতায় একশো চৌত্রিশজনের প্রাণহানি, রাজনৈতিক সহিংসতায় সাতাত্তর জনের মৃত্যু আর প্রায় তিন হাজার আহত, কারাগারে একাত্তরটি মৃত্যু। সঙ্গে ছয় মাসে এক হাজার ছয়শো একুশজন নারী-কিশোরী নির্যাতনের শিকার, এক হাজার সাতাত্তরটি শিশু নির্যাতনের ঘটনা, তিনশো পাঁচটি শিশুর মৃত্যু, আর দুইশো সাতান্নটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় চুয়াল্লিশজনের প্রাণহানি। এই সংখ্যাগুলো কোনো বিরোধী পক্ষের বানানো গল্প না, সরকারি সূত্র আর স্বীকৃত মানবাধিকার সংস্থার হিসাব থেকে নেওয়া।
জামায়াত এবার মন্ত্রিসভায় নেই ঠিকই, কিন্তু সংসদের ভেতরে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য আর আদর্শিক প্রভাব যেভাবে বিস্তৃত হচ্ছে, তাতে ২০০১-০৬ এর সেই জোটবদ্ধ শাসনের সাংস্কৃতিক আর রাজনৈতিক ছায়া থেকে দেশ কতটা মুক্ত, সেই প্রশ্নটা থেকেই যায়। ক্ষমতার চেয়ার এক না হলেও রাজনৈতিক আবহাওয়াটা যেন পঁচিশ বছর আগের সেই দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
নারী আর শিশু ঘরে কতটা নিরাপদ। সাধারণ মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে কতটা নিরাপদ বোধ করেন। সংখ্যালঘু পরিবার নিজের বাড়িতে বা উপাসনালয়ে কতটা নিরাপদ। এই প্রশ্নগুলোর কোনো সন্তোষজনক জবাব সরকারের কাছে এখনো নেই। আর যতদিন এই জবাব না আসছে, ততদিন সাত মাস আগের প্রতিশ্রুতি আর আজকের বাস্তবতার মধ্যে ফারাকটা মানুষের মনে প্রতিদিনই নতুন করে প্রশ্ন তুলবে।

