ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে রাষ্ট্রায়ত্ত আরপিসিএলের ২১০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি বন্ধ তো আছেই, পাল্লা দিয়ে চলছে স্থানীয়দের দুর্ভোগ। দেড় হাজার কোটি টাকার স্থাপনা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে ২৬ দিন। কর্তৃপক্ষের এক কথা, গ্যাসের চাপ নেই। অথচ এই অঞ্চলেই একই কোম্পানির আরও ছোট ছোট কেন্দ্র চলছে, কিছু আবার চালু রাখা হচ্ছে বেসরকারি চুক্তিতে। তাহলে গ্যাস কাদের জন্য? কোথায় যাচ্ছে সরবরাহ? কার চুক্তিতে, কার সুপারিশে?
প্রশ্ন শুধু সংকটের না, বণ্টনের। কারণ একই গ্রিডে বসে থাকা বেসরকারি কেন্দ্র যদি গ্যাস পায়, আর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় গ্যাস নেই, তাহলে সেটি সরল ঘাটতি নয়, সিদ্ধান্তগত পক্ষপাত। এই পক্ষপাতের শিকার সাধারণ মানুষ। ময়মনসিংহ শহর থেকে ফুলপুর, হালুয়াঘাট, ভালুকা, ত্রিশালের গ্রামে লোডশেডিং এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। কৃষকের সেচ বন্ধ, খামারে মাছ-মুরগি মরছে, ছোট কারখানার শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে। অথচ কেন্দ্রটা বসে আছে মৃত ইট-লোহার স্তূপের মতো।
এই চিত্রটা অবশ্য নতুন নয়। ২০০১-০৬ মেয়াদে বিদ্যুৎ খাত ছিল চুক্তিনির্ভর দালালি আর সিন্ডিকেটের জিম্মায়। কারখানা চলত রেন্টাল পাওয়ারের ভাড়া গুনে, মানুষের কষ্ট ছিল পণ্য। তখনও সংকটের নামে চলত চুক্তি। এখন আবারও সেই একই কায়দায় জামাত-নির্ভর জোট ক্ষমতায় বসে বিদ্যুৎ খাতকে ব্যক্তিস্বার্থে ঠেলে দিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বেসরকারি উৎপাদকের পকেট ভরানোর খেলা চলছে নাকি দিনের আলোয়? সেই প্রশ্ন এখন ময়মনসিংহের আনাচে-কানাচে।
আরপিসিএলের এমডি যা বললেন, তাতে দায় এড়ানোর ভাষাই স্পষ্ট। ২৬ দিন উৎপাদন শূন্য থাকার পরও তিনি কোনো জরুরি মহড়া, বিকল্প গ্যাস চুক্তি বা মন্ত্রণালয়ের চিঠির উল্লেখ পর্যন্ত করলেন না। এত বড় কেন্দ্র বন্ধ থাকলে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার পক্ষ থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চাপের কথা বলাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই চাপের কথা কেউ বলছেন না। বলছেন শুধু গ্যাস সংকট। অথচ জ্বালানি বিভাগের বরাদ্দ তালিকা প্রকাশ্যে এলে বোঝা যাবে, এই ২৬ দিনে কে পেল কত গ্যাস, আর কে শুধু প্রতিশ্রুতি পেল।
ময়মনসিংহের মানুষ এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছে, এই নীরবতা কোনো সাধারণ অব্যবস্থাপনা না। দেড় হাজার কোটি টাকার করের টাকায় নির্মিত অবকাঠামোকে অচল করে মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার পেছনে রয়েছে গভীর সিদ্ধান্তগত ব্যর্থতা। আর এই ব্যর্থতার মাশুল দিচ্ছে সেই পরিবার, যার ছেলে পড়ছে লণ্ঠনের আলোয়, যার মেয়ের অসুখে দরকার অক্সিজেন, যার পুকুরে ভোররাতে মাছ মরে ভেসে উঠছে।
বিএনপি-জামাতের এই ফেরা মানে শুধু সরকার বদল না, পুরোনো লুটপাটের নেটওয়ার্কের পুনর্বাসন। যারা বিদ্যুৎ খাতকে চুক্তির কারখানা বানিয়েছিল, তারাই আবার বসেছে সিদ্ধান্তের টেবিলে। তাদের কাছ থেকে সুশাসন আশা করা বোকার স্বর্গে বাস করার শামিল। ময়মনসিংহের এই ২৬ দিনের অন্ধকার শুধু একটি কেন্দ্রের বন্ধ থাকা না, গোটা বিদ্যুৎ খাতের রাজনৈতিক দখলদারির রূপরেখা।

