১৩৪ কোটি টাকা। এই টাকা দিয়ে সাভারের প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে আফ্রিকা থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছিল ২২টা উটপাখি। বিলাসী এই আমদানির পেছনে সরকারি যে দলিল, তাতে লেখা ছিল দেশের মাংসের চাহিদা মেটানো, গরু-খাসির বিকল্প তৈরি আর খামারিদের নতুন প্রযুক্তি দেওয়ার উচ্চাভিলাষী সব কথা। এখন ২০২৬ সালের জুলাই। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ। ফলাফল? শূন্য।
শুধু শূন্যই নয়, বরং উপহাস। ১৫টা উটপাখি জবাই করে খেয়ে ফেলা হয়েছে, ৩টা মারা গেছে, ২টা হারিয়ে গেছে, বাকি ২টা কোনোরকমে শেডে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোনো জাত উদ্ভাবিত হয়নি, কোনো প্রযুক্তি খামারিদের কাছে যায়নি, কোনো বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ তো দূরের কথা, একটা টেকসই গবেষণাপত্রও বের হয়নি। প্রশ্ন একটাই : এই টাকা গেল কোথায়?
উত্তরটা মেলে প্রকল্প পরিচালক ড. সাজেদুল করিম সরকারের দিকে তাকালে। এই মানুষটির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যগুলো যেন ২০০১-০৬ মেয়াদের বিএনপি-জামাত জোট সরকারের অন্ধকার দিনগুলোর হুবহু প্রতিচ্ছবি। তখন যেমন সরকারি প্রকল্প মানেই ছিল দলীয় অনুগত আর স্বজনদের পকেট ভরানোর ছুতো, এখানেও তাই। গবেষণার নামে ল্যাবরেটরির দামি যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, কিন্তু সেটির ইনচার্জ বানানো হয়েছে তার স্ত্রীকে। নিয়োগের কোনও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নয়, সরাসরি স্বজনপ্রীতি। তালিকায় আছেন শ্যালক, ভাগ্নিজামাই, বোনের ভাসুরের ছেলে, ভাতিজির জামাতা, ভাগিনা, মামাতো ভাইয়ের স্ত্রী, চাচাতো ভাই আর স্ত্রীর বোনের দেবর। প্রায় ১৮ জন নিকটাত্মীয় এই একটি প্রকল্পেই চাকরি পেয়েছেন। এটা গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নাকি সাজেদুল করিমের পারিবারিক ট্রাস্ট?
তদন্তকারী সাংবাদিক যখন সরাসরি জানতে চান, গবেষণার নামে ১৫টা উটপাখি জবাই করা হলো কেন, তখন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার উত্তর, “মাংসের স্বাদ পরীক্ষা করতে হয়েছে।” এটা শুনে বিজ্ঞানী মহলে হাসির রোল পড়ার কথা। ১৫টা অপ্রাপ্তবয়স্ক উটপাখি জবাই করে মাংসের স্বাদ পরীক্ষা? এই ঢালাও জবাইয়ের পেছনে গবেষণার কোনো নীতিমালা নেই, কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নেই, নেই কোনো নৈতিক অনুমোদনের রেকর্ড। বরং সাধারণ জ্ঞান বলে, একটি পূর্ণবয়স্ক উটপাখি একসঙ্গে ১০০ থেকে ১৫০ কেজি মাংস দেয়।
১৫টা পাখি থেকে প্রাপ্ত মাংসের পরিমাণ দাঁড়ায় কয়েক টন। এই বিপুল পরিমাণ মাংসের ভাগ্য কী হয়েছিল? বাজারে বিক্রি হয়েছে নাকি প্রভাবশালীদের প্লেটে গরম মাংসের সালুন হয়ে উঠেছে? এর কোনো হিসাব নেই। প্রকল্প পরিচালককে বারবার ফোন করা, অফিসে যাওয়া, হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেওয়া হলেও তিনি আত্মগোপন করে আছেন। যে লোক একসময় ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি উড়িয়েছেন বাণিজ্যিক মাংস বাজারজাত করার, সেই লোকই এখন জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে নারাজ।
সবচেয়ে পীড়াদায়ক ব্যাপার হলো, বিএলআরআইয়ের সাময়িক মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক নিজেই এই স্বজনপ্রীতি আর অনিয়মের কথা স্বীকার করেছেন। প্রতিষ্ঠানপ্রধান যখন দুর্নীতি মেনে নিচ্ছেন, তখন বোঝা যায় তদারকির পুরো কাঠামোটাই ধসে পড়েছে। এই ধস শুধু একটি প্রকল্পের নয়, এটা রাষ্ট্রের গবেষণা খাতের প্রতি বিএনপি-জামাতের মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। যে জোট উন্নয়ন বাজেটকে লুটের খাত হিসেবে দেখে, গবেষণাকে দেখে দলীয় ক্যাডারদের বসানোর জায়গা হিসেবে, সেখান থেকে নতুন প্রযুক্তি বা খাদ্যনিরাপত্তা আশা করা বোকামি।
১৩৪ কোটি টাকা জনগণের করের টাকা। এই টাকা দিয়ে কয়টি স্কুলে ল্যাব বসানো যেত, কতজন খামারিকে প্রকৃত প্রশিক্ষণ দেওয়া যেত, কতগুলো প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে ওষুধ কেনা যেত তার কোনো হিসাব বিএনপি-জামাতের পোষা এই গবেষকরা দিতে চান না। তারা চান বিতর্ক চাপা পড়ুক, সময়ের ধুলোয় ঢাকা পড়ুক ১৫টা জবাই করা উটপাখির কঙ্কাল আর ১৮ জন আত্মীয়ের চাকরির ফাইল।

