বাংলাদেশে এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলা রাষ্ট্রদ্রোহ

গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষ যে অগ্রগতির সোপান তৈরি করেছে, স্বাধীনতার পক্ষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিগুলো যে আত্মত্যাগের ভিত রচনা করেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই সব কিছুর ওপর যেন পরিকল্পিতভাবে বুলডোজার চালানো হয়েছে। একটি সুচিন্তিত অপতৎপরতার অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানি ভাবাদর্শের উপনিবেশে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। এই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের জন্য সরাসরি দায়ী অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা ইউনুস, যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামী এবং সামরিক গোয়েন্দাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা বিএনপির নব্য নেতৃত্ব।

যে বিএনপি নেতা মনিরুল ইসলাম রবি টেলিভিশনের টক শোতে বসে প্রকাশ্যে আক্ষেপ করছেন বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে, তার এই বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা সেই চক্রান্তেরই বহিঃপ্রকাশ যার মাধ্যমে আস্তে আস্তে জাতির অবচেতন মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে পাকিস্তান ভাঙা ছিল একটি ভুল। রবির কথায় স্পষ্ট, তিনি মনে করেন পাকিস্তানের অংশ থাকলে আমরা পারমাণবিক শক্তির মালিক হতে পারতাম, সারা পৃথিবী আমাদের স্যালুট দিত। অথচ এই লোকটি ভুলে যান, পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবেও গণ্য করত না। আজ বাংলাদেশ যখন মাথাপিছু আয়, নারী শিক্ষার হার, শিশু মৃত্যুহার কমানো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সহ মানব উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে পাকিস্তানকে ফেলনা প্রমাণ করেছে, তখন একজন রাজনৈতিক নেতা হয়ে পাকিস্তানের অংশ না হতে পারার জন্য আফসোস করা নিছক মূর্খতা নয়, এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা।

জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী যখন প্রকাশ্য সভায় দাঁড়িয়ে বলেন এটা গোলাম আযমের বাংলাদেশ, এটা মতিউর রহমান নিজামীর বাংলাদেশ, তখন আমাদের বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে। গোলাম আযম, নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত ও ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো অপরাধী। তাদের নামে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করার অর্থ হচ্ছে একাত্তরের গণহত্যা, ধর্ষণ আর বুদ্ধিজীবী হত্যার গৌরবগাথা রচনা করা। এই বক্তব্যের পরেও যদি রাষ্ট্র চুপ থাকে, তাহলে বুঝতে হবে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব এখন কার হাতে।

জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম যখন পাকিস্তান সফরে যান এবং সেখানে তাকে স্বাগত জানানো হয় একটি উর্দু গানের মাধ্যমে যেখানে মুক্তিবাহিনীকে গুণ্ডা আর আলবদর বাহিনীকে সংগ্রামী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়, এটি ছিল আমাদের জাতীয় চেতনার গালে জুতোর আঘাত। অথচ এই সাদ্দাম দেশে ফিরে আবার রাজনীতি করছে, সরকারি সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। কোন মুখে আমরা বলবো আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ?

পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে যখন দেখি রাষ্ট্রের অভিভাবক হওয়ার কথা যে সামরিক বাহিনী, তারা নীরব থেকে পরোক্ষভাবে এই সমস্ত অপরাজনীতিকে বৈধতা দিচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বিদেশি রাষ্ট্রের অর্থায়ন ও উসকানিতে যে দাঙ্গা বাঁধিয়ে গণঅভ্যুত্থানের নাম দিয়ে ক্ষমতা দখল করা হলো, তার পেছনে ছিল একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র। ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে ছাত্র আন্দোলনের আড়ালে সহিংসতা সংঘটিত করেছে। সেই সহিংসতার আগুনে পুড়েছে রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে, নিরীহ নাগরিক খুন হয়েছে। আর সেই সুযোগে ক্ষমতার মসনদে বসানো হয় গ্রামীণ ব্যাংকের সুদী মহাজন ইউনুসকে। এই ইউনুস কোনোদিনও রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করেননি, কিন্তু তার পেছনে দাঁড়িয়েছিল আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারী শক্তি, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে বদ্ধপরিকর।

ইউনুসের নির্দেশে আর জামায়াতের নকশায় মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞাই বদলে দেওয়া হলো জাতীয় সংসদে। আইন পাস করে বলা হলো, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগীরা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। এখানে তৎকালীন শব্দটি যোগ করার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো বর্তমান জামায়াত ও তাদের সহযোগী রাজাকার সন্তানদের গা বাঁচানো। অথচ যে মতিউর রহমান নিজামী, যে গোলাম আযম, যে আব্বাস আলী খান ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল, তাদের মতাদর্শের রাজনীতি আজও একই।

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান যখন সংসদে দাঁড়িয়ে দাবি করেন আইন থেকে জামায়াতের নাম বাদ দিতে হবে, কারণ একাত্তরে কার কী ভূমিকা ছিল তা একমাত্র আল্লাহ জানেন, তখন আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তারা চাচ্ছে একাত্তরের ইতিহাসকে ধূসর করে দিতে, যেখানে কোনো অপরাধীই অপরাধী নয়, যেখানে গণহত্যাকারী ও মুক্তিযোদ্ধা এক কাতারে দাঁড়িয়ে যাবে। আর এই ন্যাক্কারজনক বক্তব্য দিচ্ছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা। তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করার মতো সাহস কোন সরকারি দলের সদস্যের ছিল না, কারণ বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার এখন প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে জামায়াতের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।

বিএনপির ভূমিকা এখানে সবচেয়ে ঘৃণ্য ও ভয়ংকর। জিয়াউর রহমানের হাতে তৈরি এই দলটি জন্মলগ্ন থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী। জিয়া ক্ষমতায় এসেই রাজাকারদের পুনর্বাসন করেছেন, সংবিধান থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাদ দিয়েছেন, জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন। আর এখন তারই সেনানিবাসের ছত্রছায়ায় লালিত দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর বিএনপি প্রকাশ্যেই মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দোহাই দিয়ে তারা জামায়াতের সাথে জোট করেছে, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিসর্জন দিয়েছে।

২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা ক্ষমতায় বসেছে। তারপর থেকে যা ঘটছে তা জাতির জন্য গভীর লজ্জার। প্রায় সব জেলায় মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গাজীপুরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ভাস্কর্য, মেহেরপুরের মুজিবনগরে অস্থায়ী সরকারের শপথের স্মৃতিবিজড়িত শত শত স্থাপনা গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নীরবে, কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ঐতিহাসিক বাসভবন পর্যন্ত সিটি কর্পোরেশনের বুলডোজার দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা কোনো সাধারণ নগর উন্নয়নের প্রকল্প ছিল না, এটা ছিল প্রতীকীভাবে বাঙালি জাতির আত্মাকে ধ্বংস করা। এই বাড়িটি শুধু ইট কাঠ পাথরের কাঠামো ছিল না, এটি ছিল বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার তীর্থভূমি। সেটা ভেঙে ফেলা হলো জামায়াতের উসকানিতে আর বিএনপির ক্ষমতার দাপটে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলাকে এখন অপরাধ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিলনায়তনে মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান নিয়ে আলোচনা সভায় সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছে, সেখান থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে পুলিশ। এরা কি অপরাধ করেছিল? তারা তো শুধু স্বাধীনতার পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বক্তৃতা দিচ্ছিল। কিন্তু এই দেশে এখন সেটাই মহাপাপ।

অন্যদিকে জামায়াত সমর্থক ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির প্রকাশ্য টক শোতে বলছেন ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা দিবস নয়, এটা পরাধীনতার দিন। বলছেন মুক্তিযুদ্ধে নাকি মাত্র কয়েক হাজার মানুষ মারা গেছে, কিন্তু বিহারী হত্যা হয়েছে দুই লাখ। এই চরম মিথ্যাচার, ইতিহাস বিকৃতি, রাষ্ট্রদ্রোহিতার কোনো বিচার হয় না। বরং এই ব্যক্তিই এখন মূলধারার বুদ্ধিজীবী সাজছেন টেলিভিশনের পর্দায়।

এবি পার্টির আসাদুজ্জামান ফুয়াদ যখন বলেন আমি ১৬ ডিসেম্বর মানি না, নতুন দিবসের খোঁজ করছি, তখন তাকে কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জিজ্ঞাসাবাদ করে না। অথচ এটাই তো রাষ্ট্রদ্রোহিতা। এই বক্তব্য বাংলাদেশের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। কিন্তু রাষ্ট্রের অঙ্গ এখন পঙ্গু। কারণ যে সরকার ক্ষমতায়, সেই বিএনপি নেত্রী নিজেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করার রাজনীতি করে আসছেন। তাই তারা মুখ খুলতে সাহস পান না, কারণ তারা জানেন এই একই জামায়াত আর শিবিরের কাঁধে ভর দিয়ে তারা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চান।

এভাবে পাকিস্তানপন্থী বয়ানের উত্থান আকস্মিক নয়। এটা একটি সুসংহত, সুপরিকল্পিত ও রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট প্রজেক্ট। যার প্রধান হোতা জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতাকারী আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারী শক্তি। কিন্তু সবচেয়ে বেদনার বিষয় হলো, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল এবং এখন যারা দৃশ্যত শাসন করছে, সেই বিএনপি নেতৃত্ব এই সমস্ত অপশক্তির বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলে নি, বরং উল্টো তাদেরকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা দিয়ে লালন করছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের নামে তারা জামায়াতের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, কিন্তু এখন তারা সেই সম্পর্কের বন্দী। নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে বিএনপি পুরো বাংলাদেশের ইতিহাস ও অস্তিত্বকে জামায়াতের কাছে বন্দি করে ফেলেছে।

শেষ পর্যন্ত বীর মুক্তিযোদ্ধারা আর চুপ থাকতে পারেননি। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের কথায় গভীর বেদনা, তিনি বলেছেন বর্তমান বাংলাদেশ দেখে বোঝার উপায় নেই যে এখানে কখনো মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা মনোরঞ্জন ঘোষাল বলছেন রাজাকার সংসদে পৌঁছেছে, এটি জাতির জন্য লজ্জার বিষয়। আর প্রয়াত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তফা মনোয়ার তো মৃত্যুর আগে হাহাকার করে প্রশ্ন করে গেছেন মানুষ কি আমাদের সেই আত্মত্যাগ ভুলে যাচ্ছে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে উত্তর হলো হ্যাঁ, কিছু মানুষ সত্যিই ভুলতে বসেছে। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র এখন তাদের হাতে যারা কিনা আত্মত্যাগকে অস্বীকার করে, গণহত্যাকে গৌরবের সাথে স্মরণ করে, আর পাকিস্তানের গোলামীতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।

আমাদের আজ স্পষ্ট করে বুঝতে হবে, এটা নিছক কিছু ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন উক্তি নয়, এটা রাষ্ট্রকে পুনরায় পাকিস্তানি ভাবাদর্শের উপনিবেশে রূপান্তরের একটি ভয়াবহ নীলনকশা। যে দেশের জন্য তিরিশ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছে, দুই লাখ মা বোন তাদের ইজ্জত হারিয়েছে, সেই দেশকে এখন সেই রাজাকার, আলবদর আর তাদের উত্তরসূরিরাই নতুন করে গড়তে চাইছে তাদের বর্বর দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে। আর ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তার নীরব সমর্থন ও প্রকাশ্য দুর্বলতার মাধ্যমে সেই ষড়যন্ত্রকে সফল করার পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছে। আমরা জাতি হিসেবে আজ এক ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি।

গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষ যে অগ্রগতির সোপান তৈরি করেছে, স্বাধীনতার পক্ষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিগুলো যে আত্মত্যাগের ভিত রচনা করেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই সব কিছুর ওপর যেন পরিকল্পিতভাবে বুলডোজার চালানো হয়েছে। একটি সুচিন্তিত অপতৎপরতার অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানি ভাবাদর্শের উপনিবেশে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। এই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের জন্য সরাসরি দায়ী অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা ইউনুস, যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামী এবং সামরিক গোয়েন্দাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা বিএনপির নব্য নেতৃত্ব।

যে বিএনপি নেতা মনিরুল ইসলাম রবি টেলিভিশনের টক শোতে বসে প্রকাশ্যে আক্ষেপ করছেন বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে, তার এই বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা সেই চক্রান্তেরই বহিঃপ্রকাশ যার মাধ্যমে আস্তে আস্তে জাতির অবচেতন মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে পাকিস্তান ভাঙা ছিল একটি ভুল। রবির কথায় স্পষ্ট, তিনি মনে করেন পাকিস্তানের অংশ থাকলে আমরা পারমাণবিক শক্তির মালিক হতে পারতাম, সারা পৃথিবী আমাদের স্যালুট দিত। অথচ এই লোকটি ভুলে যান, পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবেও গণ্য করত না। আজ বাংলাদেশ যখন মাথাপিছু আয়, নারী শিক্ষার হার, শিশু মৃত্যুহার কমানো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সহ মানব উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে পাকিস্তানকে ফেলনা প্রমাণ করেছে, তখন একজন রাজনৈতিক নেতা হয়ে পাকিস্তানের অংশ না হতে পারার জন্য আফসোস করা নিছক মূর্খতা নয়, এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা।

জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী যখন প্রকাশ্য সভায় দাঁড়িয়ে বলেন এটা গোলাম আযমের বাংলাদেশ, এটা মতিউর রহমান নিজামীর বাংলাদেশ, তখন আমাদের বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে। গোলাম আযম, নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত ও ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো অপরাধী। তাদের নামে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করার অর্থ হচ্ছে একাত্তরের গণহত্যা, ধর্ষণ আর বুদ্ধিজীবী হত্যার গৌরবগাথা রচনা করা। এই বক্তব্যের পরেও যদি রাষ্ট্র চুপ থাকে, তাহলে বুঝতে হবে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব এখন কার হাতে।

জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম যখন পাকিস্তান সফরে যান এবং সেখানে তাকে স্বাগত জানানো হয় একটি উর্দু গানের মাধ্যমে যেখানে মুক্তিবাহিনীকে গুণ্ডা আর আলবদর বাহিনীকে সংগ্রামী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়, এটি ছিল আমাদের জাতীয় চেতনার গালে জুতোর আঘাত। অথচ এই সাদ্দাম দেশে ফিরে আবার রাজনীতি করছে, সরকারি সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। কোন মুখে আমরা বলবো আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ?

পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে যখন দেখি রাষ্ট্রের অভিভাবক হওয়ার কথা যে সামরিক বাহিনী, তারা নীরব থেকে পরোক্ষভাবে এই সমস্ত অপরাজনীতিকে বৈধতা দিচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বিদেশি রাষ্ট্রের অর্থায়ন ও উসকানিতে যে দাঙ্গা বাঁধিয়ে গণঅভ্যুত্থানের নাম দিয়ে ক্ষমতা দখল করা হলো, তার পেছনে ছিল একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র। ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে ছাত্র আন্দোলনের আড়ালে সহিংসতা সংঘটিত করেছে। সেই সহিংসতার আগুনে পুড়েছে রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে, নিরীহ নাগরিক খুন হয়েছে। আর সেই সুযোগে ক্ষমতার মসনদে বসানো হয় গ্রামীণ ব্যাংকের সুদী মহাজন ইউনুসকে। এই ইউনুস কোনোদিনও রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করেননি, কিন্তু তার পেছনে দাঁড়িয়েছিল আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারী শক্তি, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে বদ্ধপরিকর।

ইউনুসের নির্দেশে আর জামায়াতের নকশায় মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞাই বদলে দেওয়া হলো জাতীয় সংসদে। আইন পাস করে বলা হলো, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগীরা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। এখানে তৎকালীন শব্দটি যোগ করার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো বর্তমান জামায়াত ও তাদের সহযোগী রাজাকার সন্তানদের গা বাঁচানো। অথচ যে মতিউর রহমান নিজামী, যে গোলাম আযম, যে আব্বাস আলী খান ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল, তাদের মতাদর্শের রাজনীতি আজও একই।

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান যখন সংসদে দাঁড়িয়ে দাবি করেন আইন থেকে জামায়াতের নাম বাদ দিতে হবে, কারণ একাত্তরে কার কী ভূমিকা ছিল তা একমাত্র আল্লাহ জানেন, তখন আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তারা চাচ্ছে একাত্তরের ইতিহাসকে ধূসর করে দিতে, যেখানে কোনো অপরাধীই অপরাধী নয়, যেখানে গণহত্যাকারী ও মুক্তিযোদ্ধা এক কাতারে দাঁড়িয়ে যাবে। আর এই ন্যাক্কারজনক বক্তব্য দিচ্ছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা। তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করার মতো সাহস কোন সরকারি দলের সদস্যের ছিল না, কারণ বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার এখন প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে জামায়াতের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।

বিএনপির ভূমিকা এখানে সবচেয়ে ঘৃণ্য ও ভয়ংকর। জিয়াউর রহমানের হাতে তৈরি এই দলটি জন্মলগ্ন থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী। জিয়া ক্ষমতায় এসেই রাজাকারদের পুনর্বাসন করেছেন, সংবিধান থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাদ দিয়েছেন, জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন। আর এখন তারই সেনানিবাসের ছত্রছায়ায় লালিত দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর বিএনপি প্রকাশ্যেই মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দোহাই দিয়ে তারা জামায়াতের সাথে জোট করেছে, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিসর্জন দিয়েছে।

২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা ক্ষমতায় বসেছে। তারপর থেকে যা ঘটছে তা জাতির জন্য গভীর লজ্জার। প্রায় সব জেলায় মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গাজীপুরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ভাস্কর্য, মেহেরপুরের মুজিবনগরে অস্থায়ী সরকারের শপথের স্মৃতিবিজড়িত শত শত স্থাপনা গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নীরবে, কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ঐতিহাসিক বাসভবন পর্যন্ত সিটি কর্পোরেশনের বুলডোজার দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা কোনো সাধারণ নগর উন্নয়নের প্রকল্প ছিল না, এটা ছিল প্রতীকীভাবে বাঙালি জাতির আত্মাকে ধ্বংস করা। এই বাড়িটি শুধু ইট কাঠ পাথরের কাঠামো ছিল না, এটি ছিল বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার তীর্থভূমি। সেটা ভেঙে ফেলা হলো জামায়াতের উসকানিতে আর বিএনপির ক্ষমতার দাপটে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলাকে এখন অপরাধ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিলনায়তনে মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান নিয়ে আলোচনা সভায় সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছে, সেখান থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে পুলিশ। এরা কি অপরাধ করেছিল? তারা তো শুধু স্বাধীনতার পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বক্তৃতা দিচ্ছিল। কিন্তু এই দেশে এখন সেটাই মহাপাপ।

অন্যদিকে জামায়াত সমর্থক ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির প্রকাশ্য টক শোতে বলছেন ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা দিবস নয়, এটা পরাধীনতার দিন। বলছেন মুক্তিযুদ্ধে নাকি মাত্র কয়েক হাজার মানুষ মারা গেছে, কিন্তু বিহারী হত্যা হয়েছে দুই লাখ। এই চরম মিথ্যাচার, ইতিহাস বিকৃতি, রাষ্ট্রদ্রোহিতার কোনো বিচার হয় না। বরং এই ব্যক্তিই এখন মূলধারার বুদ্ধিজীবী সাজছেন টেলিভিশনের পর্দায়।

এবি পার্টির আসাদুজ্জামান ফুয়াদ যখন বলেন আমি ১৬ ডিসেম্বর মানি না, নতুন দিবসের খোঁজ করছি, তখন তাকে কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জিজ্ঞাসাবাদ করে না। অথচ এটাই তো রাষ্ট্রদ্রোহিতা। এই বক্তব্য বাংলাদেশের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। কিন্তু রাষ্ট্রের অঙ্গ এখন পঙ্গু। কারণ যে সরকার ক্ষমতায়, সেই বিএনপি নেত্রী নিজেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করার রাজনীতি করে আসছেন। তাই তারা মুখ খুলতে সাহস পান না, কারণ তারা জানেন এই একই জামায়াত আর শিবিরের কাঁধে ভর দিয়ে তারা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চান।

এভাবে পাকিস্তানপন্থী বয়ানের উত্থান আকস্মিক নয়। এটা একটি সুসংহত, সুপরিকল্পিত ও রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট প্রজেক্ট। যার প্রধান হোতা জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতাকারী আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারী শক্তি। কিন্তু সবচেয়ে বেদনার বিষয় হলো, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল এবং এখন যারা দৃশ্যত শাসন করছে, সেই বিএনপি নেতৃত্ব এই সমস্ত অপশক্তির বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলে নি, বরং উল্টো তাদেরকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা দিয়ে লালন করছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের নামে তারা জামায়াতের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, কিন্তু এখন তারা সেই সম্পর্কের বন্দী। নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে বিএনপি পুরো বাংলাদেশের ইতিহাস ও অস্তিত্বকে জামায়াতের কাছে বন্দি করে ফেলেছে।

শেষ পর্যন্ত বীর মুক্তিযোদ্ধারা আর চুপ থাকতে পারেননি। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের কথায় গভীর বেদনা, তিনি বলেছেন বর্তমান বাংলাদেশ দেখে বোঝার উপায় নেই যে এখানে কখনো মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা মনোরঞ্জন ঘোষাল বলছেন রাজাকার সংসদে পৌঁছেছে, এটি জাতির জন্য লজ্জার বিষয়। আর প্রয়াত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তফা মনোয়ার তো মৃত্যুর আগে হাহাকার করে প্রশ্ন করে গেছেন মানুষ কি আমাদের সেই আত্মত্যাগ ভুলে যাচ্ছে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে উত্তর হলো হ্যাঁ, কিছু মানুষ সত্যিই ভুলতে বসেছে। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র এখন তাদের হাতে যারা কিনা আত্মত্যাগকে অস্বীকার করে, গণহত্যাকে গৌরবের সাথে স্মরণ করে, আর পাকিস্তানের গোলামীতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।

আমাদের আজ স্পষ্ট করে বুঝতে হবে, এটা নিছক কিছু ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন উক্তি নয়, এটা রাষ্ট্রকে পুনরায় পাকিস্তানি ভাবাদর্শের উপনিবেশে রূপান্তরের একটি ভয়াবহ নীলনকশা। যে দেশের জন্য তিরিশ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছে, দুই লাখ মা বোন তাদের ইজ্জত হারিয়েছে, সেই দেশকে এখন সেই রাজাকার, আলবদর আর তাদের উত্তরসূরিরাই নতুন করে গড়তে চাইছে তাদের বর্বর দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে। আর ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তার নীরব সমর্থন ও প্রকাশ্য দুর্বলতার মাধ্যমে সেই ষড়যন্ত্রকে সফল করার পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছে। আমরা জাতি হিসেবে আজ এক ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ