কুড়িগ্রামের আব্দুল খালেক ফারুক দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করছেন। প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তাঁকে হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে এক ব্রেন টিউমার রোগীর মৃত্যুর ঘটনায়, যে লোক জুলাই দাঙ্গার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত ছিলেন না, যাঁর চাচা কৌশলে তাঁকে “ছাত্র আন্দোলনকারী” বানিয়েছিলেন শুধু বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার জন্য।
সেই মৃত্যুতে মামলা হয়েছে, জুলাই শহীদের তালিকায় নাম উঠেছে, সরকারি অর্থ সহায়তাও গেছে। আর এই পুরো প্রহসনের শেষ অধ্যায়ে একজন সাংবাদিকের নাম উঠেছে হত্যা মামলার আসামি হিসেবে। কেন? কারণ মামলার বাদী, কুড়িগ্রাম পৌর ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি রুহুল আমিন, নিজেকে “জুলাইযোদ্ধা” বলেন এবং মনে করেন এটা তাঁর “দায়িত্ব” ছিল। সাংবাদিক ফারুক তাঁকে জিজ্ঞেস করতে গেলে তিনি বলেছেন, “আপনি তো স্বৈরাচারের দোসর।”
এই একটা বাক্যে পুরো সময়টার সারসংক্ষেপ আছে।
“স্বৈরাচারের দোসর” তকমাটা অন্তর্বর্তী সময়ে একটা সর্বজনীন অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। এর কোনো আইনি সংজ্ঞা নেই, কোনো প্রমাণ লাগে না, কোনো তদন্তের দরকার নেই। যাকে খুশি এই তকমা দাও, তারপর হত্যা মামলায় নাম ঢুকিয়ে দাও। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ ঠিকই বলেছেন, এটা আইনি ধারণা নয়, রাজনৈতিক হাতিয়ার। কিন্তু সেই হাতিয়ার দিয়ে বছরের পর বছর সাংবাদিকতা করা মানুষগুলোর জীবন তছনছ করে দেওয়া হয়েছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার এই পরিস্থিতি তৈরি করেনি হয়তো, কিন্তু এটা থামাতেও কিছু করেনি। বরং যে রাজনৈতিক পরিবেশে এই মামলা বাণিজ্য ফুলেফেঁপে উঠেছে, সেটা ওই সরকারের আমলেই তৈরি হয়েছে। যে সময়ে জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা এবং বিএনপির স্থানীয় নেতারা দেশের নানা প্রান্তে সাংবাদিকদের তালিকা তৈরি করে মামলায় নাম ঢুকিয়েছেন, সেই সময়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো সুরক্ষা ছিল না।
পটুয়াখালীতে বিএনপির স্থানীয় নেতার ছেলে আইনজীবী মশিউর রহমান নিহতের বাবাকে “সাহায্যের” প্রলোভন দিয়ে কাগজে সই করিয়ে মামলা করেছেন, শতশত মানুষকে আসামি বানিয়ে লাখ লাখ টাকা কামিয়েছেন। বাদী নিজেই বলছেন তিনি কিছু জানতেন না। অডিও রেকর্ডে ধরা পড়েছে টাকার ভাগ-বাটোয়ারার আলোচনা। এই লোককে পরে স্থানীয় বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বটে, কিন্তু যে ক্ষতি হওয়ার সেটা হয়ে গেছে।
জয়পুরহাটে একজন আহত মানুষ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন, তখন তৎকালীন ওসি হাসপাতালে গিয়ে তাঁর সই নিয়ে এসেছেন মামলার কাগজে। সেই মামলায় একশো উনিশজনকে আসামি করা হয়েছে, যার মধ্যে একাধিক সাংবাদিক। বাদী রাকিব হোসেন বলছেন, “আসামি বা সাক্ষী কাউকেই চিনি না।” পুলিশ অফিসার এখন অস্বীকার করছেন সব। এই প্যাটার্নটা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে একইভাবে দেখা গেছে। মানে এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, একটা সমন্বিত প্রক্রিয়া।
সবচেয়ে নির্মম বৈপরীত্য হলো অন্য জায়গায়। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে সাংবাদিক প্রদীপ কুমার ভৌমিককে আন্দোলনকারীরা পিটিয়ে-কুপিয়ে হত্যা করেছে। ময়নাতদন্ত হয়েছে। কিন্তু এই হত্যায় আজ পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তাঁর ছেলে বারবার আবেদন করেছেন জুলাই শহীদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে, ছাত্র সমন্বয়করা বিরোধিতা করেছেন। বলেছেন “আওয়ামী লীগের দোসর”। একজন সাংবাদিকের রক্ত মাটিতে মিশে গেছে, তাঁর পরিবার বিচার পাচ্ছেন না, আর যে “উৎসাহী” চক্র সারা দেশে হত্যা মামলা ঠুকে বেড়িয়েছে তারা এই ঘটনায় নিশ্চুপ। কারণটা স্পষ্ট, এই মৃত্যু থেকে মামলা বাণিজ্যের কোনো সুযোগ নেই।
এখন বিএনপি ক্ষমতায়। সম্পাদক পরিষদ ২৮২ জন অভিযুক্ত সাংবাদিকের তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী “ইতিবাচকভাবে” নিয়েছেন বলে জানা গেছে, তথ্যমন্ত্রী বলেছেন এটা নিয়ে কাজ হবে। কিন্তু “ইতিবাচকভাবে নেওয়া” আর “কাজ হবে” দিয়ে যাঁরা দুই বছর ধরে আত্মগোপনে আছেন, যাঁদের পরিবার গ্রামে চলে গেছে, যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন, তাঁদের জীবন ফেরে না। বগুড়ার জে এম রউফ প্রায় দুই বছর ধরে আত্মগোপনে। বলছেন ঘটনাস্থলে ছিলেনই না, তবু পুরনো রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে টার্গেট হয়েছেন। তাঁর কাছে সরকারের “ইতিবাচক মনোভাব” কতটুকু অর্থ বহন করে?

