৪৬ হাজার কোটি টাকা। এপ্রিল মাসে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে এই পরিমাণ তুলেছে সরকার। শুনতে বড় লাগছে, তাই না? কিন্তু একটু ভেতরে ঢুকলেই দেখা যাচ্ছে এর মধ্যে ৩২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা চলে গেছে আগের ট্রেজারি বিলের দেনা মেটাতে। মানে নতুন ঋণ নিয়ে পুরনো ঋণ শোধ হচ্ছে। হাতে থাকছে ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এটা অর্থনীতি চালানো না, এটা একটা ডুবন্ত নৌকায় বসে গামলা দিয়ে পানি সেচা।
বিএনপি এখন যে সরকার চালাচ্ছে সেটার বৈধতার প্রশ্ন তুললে তারা রেগে যায়। কিন্তু ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের ভোটের কথা দেশের মানুষ ভোলেনি। আওয়ামী লীগ নেই, জাতীয় পার্টি নেই, বাম ঘরানার কোনো বড় দল নেই, ভোটার নেই বললেই চলে, তবু “নির্বাচন” হয়েছে আর বিএনপি “জিতেছে।” জিয়াউর রহমান একসময় এভাবেই ক্ষমতা পাকা করেছিলেন, হ্যাঁ বা না ভোটের নাটক সাজিয়ে। ছেলে বাপের পথই ধরেছে, শুধু পদ্ধতিটা একটু আধুনিক করা হয়েছে।
সেই সরকার এখন অর্থনীতি নিয়ে কী করছে সেটা দেখুন। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। এটা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এনবিআরকে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটির, আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার কোটির কিছু বেশি। শুধু মার্চেই লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক আদায় করতে পারেনি সরকার। এই ব্যর্থতার জন্য কোনো মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন? কেউ সংসদে দাঁড়িয়ে জবাব দিয়েছেন? না। কারণ যে সংসদে বসার কথা ছিল বিরোধীদের, তারা ভোটেই যায়নি। ফলে জবাবদিহির জায়গাটাই নেই।
রাজস্ব আসছে না, তাই ঋণ নিতে হচ্ছে। এটা বুঝলাম। কিন্তু গত বছরের জানুয়ারিতে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ছিল ৪ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এক বছর পরে সেটা হয়েছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশ। এই দুটো সংখ্যা একসাথে পড়লেই বোঝা যায় কী হচ্ছে। ব্যাংকগুলো সরকারকে টাকা দিচ্ছে, কারণ ১০ শতাংশের বেশি সুদে নিশ্চিত মুনাফা আসছে। ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাকে ঋণ দিলে ঝুঁকি আছে, কষ্ট আছে, খেলাপির ভয় আছে। সরকারকে দিলে কোনো ঝামেলা নেই। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ শুকাচ্ছে, কর্মসংস্থান থমকে আছে, আর ব্যাংক মালিকরা নিশ্চিন্তে মুনাফা গুনছেন।
এপ্রিল-জুন তিন মাসে সরকার আরো ১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। ট্রেজারি বিল থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি, বন্ড থেকে ৩৯ হাজার কোটি। সুদের হার ১০ শতাংশের উপরে। এই সুদ শেষ পর্যন্ত কে দেবে? রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে দেওয়া হবে, মানে ট্যাক্স দেওয়া মানুষের পকেট থেকে। যে মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগও পায়নি, তার পকেট থেকে টাকা কেটে সরকার ব্যাংকের সুদ শোধ করছে। এর চেয়ে নির্লজ্জ ব্যবস্থা আর কী হতে পারে?
বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় দলটির সাথে দুর্নীতির সম্পর্কটা জন্মের পর থেকেই। সেনানিবাসে বসে রাজনৈতিক দল বানানো হয়েছিল, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে দলকে দাঁড় করানো হয়েছিল। সেই ঐতিহ্য থেকে এই দল কখনো বের হতে পারেনি। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের শাসনামলের কথা মনে আছে? হাওয়া ভবন, গ্যাস রপ্তানির দরকষাকষি, দশ ট্রাক অস্ত্র, শেয়ার বাজার লুট। সেই দলটিই এখন আবার ক্ষমতায়, এবার একটা ভোটারশূন্য নির্বাচনের মাধ্যমে।
২৪ লাখ কোটি টাকার মোট ঋণ নিয়ে দেশটা এখন দাঁড়িয়ে আছে। দেশীয় ঋণ ১২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি, বিদেশী ঋণ ৯৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান না, এগুলো আগামী প্রজন্মের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া বোঝার হিসাব। এখন মে মাস চলছে, এই মাসেই ট্রেজারি বিল আর বন্ডের মাধ্যমে আরো ২১ হাজার কোটি টাকা তোলা হয়ে গেছে। সুদের হার ১০ শতাংশের উপরে।
যে সরকারের জনগণের কাছে জবাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, সে সরকার ঋণ নিতে থাকবে, সুদ দিতে থাকবে, আর বলতে থাকবে সব ঠিক আছে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে ব্যয় বাড়া স্বাভাবিক। হ্যাঁ, স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাসের সর্বোচ্চ রাজস্ব ঘাটতির মাঝে, মূল্যস্ফীতির চাপে নাকানি-চুবানি খাওয়া মানুষের মাঝে, এই “স্বাভাবিক” শব্দটা ব্যবহার করার সাহস একমাত্র তারাই পায় যারা জানে তাদের কেউ জবাব চাইতে আসবে না।

