নাটোরের নলডাঙ্গায় একটা স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুকে ধানের শীষের নকশায় বানানো স্বর্ণের কোট-পিন পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। খরচ হয়েছে ২৮ হাজার টাকা। আর সেই টাকা এসেছে স্কুলের ফান্ড থেকে। অর্থাৎ যে টাকা ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার কাজে লাগার কথা, সেই টাকায় একজন ক্ষমতাসীন দলের নেতার গলায় সোনা ঝুলিয়ে দেওয়া হলো।
প্রধান শিক্ষক নিজেই স্বীকার করেছেন, “হুইপকে সন্তুষ্ট করার জন্য এটি দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা প্রয়োজন হয়।” এই একটা বাক্যের মধ্যে গোটা ব্যবস্থার চেহারাটা পরিষ্কার হয়ে যায়। ক্ষমতাবানকে খুশি রাখো, নইলে টিকে থাকা যাবে না। এই ভয়ের সংস্কৃতি বাংলাদেশে নতুন না, কিন্তু বিএনপি যতবারই ক্ষমতায় এসেছে, এই সংস্কৃতিটা একটু বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
তেল মারতে চাও, মারো। কিন্তু নিজের পকেটের টাকায় মারো। কোনো নেতাকে স্বর্ণের গহনা দিয়ে খুশি করতে চাইলে সেটা তোমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। স্কুলের ফান্ড কোনো দলীয় নেতার পদলেহনের খরচ বহন করার জায়গা না। ওই ২৮ হাজার টাকায় কয়টা বই কেনা যেত, কয়টা গরিব ছাত্রের বেতন মওকুফ হতো, একটু ভাবলে লজ্জায় মাথা নত হওয়ার কথা।
আর যে দলের নেতার গলায় এই সোনা উঠলো, সেই দলটার ইতিহাস একটু মনে করা দরকার। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ যে নির্বাচন হলো, সেখানে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নেয়নি। জনগণের বিশাল একটা অংশ ভোট দেয়নি। যে ভোটে মানুষ না গেলেই নিরাপদ মনে করলো, সেই ভোটের ফলাফলে তৈরি সরকারের একজন হুইপ আজকে স্কুলের টাকায় কেনা সোনার পিন বুকে লাগিয়ে ঘুরছেন। এই দৃশ্যটা আসলে পুরো পরিস্থিতির একটা ক্ষুদ্র প্রতিফলন।
বিএনপির মন্ত্রিসভা বা তাদের জনপ্রতিনিধিরা এই ধরনের ঘটনায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। হুইপ দুলুর ফোনে একাধিকবার কল করা হয়েছে, তিনি ধরেননি। এই না ধরাটাই আসলে তাদের জবাবদিহির ধরন। ক্ষমতায় থাকলে চুপ, বিরোধী দলে থাকলে চিৎকার। এই দলের চরিত্রে এর বাইরে খুব একটা কিছু কখনো দেখা যায়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজেই বলেছেন বিষয়টা “অ্যাপ্রোপ্রিয়েট নয়।” অর্থাৎ যে কাজ হয়েছে সেটা যে ঠিক হয়নি, এটা ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তিরাও জানেন। তারপরও হয়েছে। কারণ ক্ষমতার সামনে বিবেকবোধ থেকে যায় পেছনে।
এদিকে দেশের কৃষকরা সেচের পানির অভাবে ধান বাঁচাতে পারছেন না। জ্বালানি তেলের দাম, সেচের খরচ, সব মিলিয়ে চাষাবাদ করতে গিয়ে লোকসানে পড়ছেন তারা। একটা স্কুলের ২৮ হাজার টাকায় হয়তো কোনো একজন কৃষকের সেচের খরচ মিটতো। সেই টাকা গেল একজন হুইপের বুকে সোনা লাগাতে।
এই ছবিটা আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। এটা একটা ব্যবস্থার স্বাভাবিক ফলাফল, যেখানে ক্ষমতাবানকে খুশি রাখাটাই টিকে থাকার একমাত্র উপায় বলে মানুষ শিখে নিয়েছে।

