জুলাই দাঙ্গায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেয়ে লুটপাটের উৎসবে মেতেছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও ইরান যুদ্ধের দোহাই দিয়ে ধাপে ধাপে বাড়ানো হচ্ছে জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম। আর এই দাম বৃদ্ধির চেইন রিঅ্যাকশনে এখন সাধারণ মানুষের পকেটে টান দিতে প্রস্তুত পরিবহন খাতের সিন্ডিকেটগুলো।
রোববার থেকে সারাদেশে কার্যকর হয়েছে জ্বালানি তেলের পুনঃনির্ধারিত মূল্য। নতুন তালিকা অনুযায়ী: অকটেন ১৪০ টাকা (আগে ১২০ টাকা); পেট্রোল ১৩৫ টাকা (আগে ১১৬ টাকা) ডিজেল ১১৫ টাকা (আগে ১০০ টাকা); কেরোসিন ১৩০ টাকা (আগে ১১২ টাকা)।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই পরিবহন মালিকরা ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে মাঠে নেমেছেন। পরিবহন মালিক সমিতি ঢাকা ও চট্টগ্রামে বাস ভাড়া ৬৪ শতাংশ এবং দূরপাল্লার বাসে ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নৌপথে লঞ্চের ভাড়া ৩৬ থেকে ৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে লঞ্চ মালিকরা। আজ সন্ধ্যায় ভাড়া নির্ধারণ কমিটির বৈঠকে এই জনবিরোধী সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি গ্রাহক পর্যায়ে এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের দামও আবারও বাড়িয়েছে বিইআরসি। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১,৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এপ্রিল মাসেই এটি দ্বিতীয় দফা মূল্যবৃদ্ধি। গত মার্চ মাসে যে সিলিন্ডারের দাম ছিল ১,৩৪১ টাকা, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তা ৫৯৯ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরকে তপ্ত করে তুলেছে।
সরকার জ্বালানি মজুত থাকার দাবি করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। রাজধানীর মোড়ে মোড়ে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখা গেছে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছেন না মোটরসাইকেল চালক থেকে শুরু করে সাধারণ পরিবহন চালকরা। পাম্পগুলোতে সরবরাহ ১০-১৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ায় চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিরাপত্তার অভাব এবং তেল সরবরাহ না পাওয়ায় যেকোনো সময় সারাদেশের ফিলিং স্টেশনগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তেল নিতে আসা গ্রাহকদের সাথে পাম্প কর্মীদের বাদানুবাদ এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ পেট্রোল ও অকটেনে আগে থেকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল এবং অতীতে এগুলো রপ্তানিও করা হয়েছে। অথচ বর্তমান সরকারের অদক্ষতা ও সিন্ডিকেট তোষণের কারণে দেশীয় সম্পদেও আজ সংকট তৈরি করা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ উঠেছে, এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে ২ বিলিয়ন ডলার (২৪ হাজার কোটি টাকা) ঋণ নেওয়ার ফন্দি করছে সরকার। সমালোচকরা এই বিশাল ঋণের প্রচেষ্টাকে বিএনপির ‘লুটপাটের নতুন প্রজেক্ট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে দেশের চারটি বড় সরকারি সার কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে গার্মেন্টস খাতের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অজুহাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একদিকে মুদ্রাস্ফীতি আর অন্যদিকে ঋণের বোঝা—সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেও তাদের লুটপাটের মনোভাব ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অভাবে দেশ অচিরেই একটি স্থায়ী ঋণের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ এখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

