ট্যাংকারে তেল উপচে পড়ছে, কিন্তু পাম্পে পাওয়া যাচ্ছে না। দেশীয় কোম্পানিগুলোর কাছে পেট্রোল ও অকটেনের পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও রহস্যজনক কারণে তা গ্রহণ করছে না সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। অভিযোগ উঠেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে জনপকেট কাটার দীর্ঘমেয়াদী চক্রান্তের অংশ হিসেবেই সরকার পরিকল্পিতভাবে এই ‘কৃত্রিম সংকট’ জিইয়ে রেখেছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশে পেট্রোল ও অকটেনের মোট চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশই পূরণ করে স্থানীয় পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি’র ট্যাংকারগুলো এখন তেলে টইটম্বুর। কিন্তু বিপিসি গত ৮ এপ্রিল এক চিঠিতে তাদের কাছ থেকে তেল গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়।
সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণব কুমার সাহা জানান, এপ্রিল মাসে ৩৭ হাজার টন তেল সরবরাহের জন্য তাদের প্রস্তুত থাকতে বলা হলেও শেষ মুহূর্তে বিতরণ কোম্পানিগুলো তেল নেওয়া বন্ধ করে দেয়। একদিকে দেশীয় অকটেন মজুতের সক্ষমতা ৫৩ হাজার টন ছাড়িয়ে বর্তমানে ৫৫ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে সরবরাহ রেশনিং করে বাজারে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দাম বাড়ানোর ক্ষেত্র প্রস্তুত করতেই এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। আজ রোববার থেকে সেই ‘চক্রান্ত’ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী করা হয়েছে:
অকটেন প্রতি লিটার ১৪০ টাকা (২০ টাকা বৃদ্ধি); পেট্রোল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা (১৯ টাকা বৃদ্ধি); ডিজেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা (১৫ টাকা বৃদ্ধি)। জ্বালানি তেলের পাশাপাশি এলপিজি গ্যাসের দামও এপ্রিল মাসে দ্বিতীয় দফায় বাড়ানো হয়েছে। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এখন ১,৯৪০ টাকা, যা গত মাসের তুলনায় ৫৯৯ টাকা বেশি।
তেলের দাম বাড়ানোর ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই পরিবহন খাতের সিন্ডিকেটগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বাস মালিক সমিতি ঢাকা ও চট্টগ্রামে ভাড়ায় ৬৪ শতাংশ এবং দূরপাল্লার বাসে ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি তুলেছে। লঞ্চের ভাড়াও ৩৬ থেকে ৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আজ সন্ধ্যায় ভাড়া নির্ধারণ কমিটির বৈঠকে এই জনবিরোধী সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, দেশে পেট্রোল ও অকটেনের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অজুহাত দেখিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে ২ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা) ঋণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি সরকার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে ‘লুটপাটের নতুন প্রজেক্ট’। কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে এই বিশাল ঋণের বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার নীল নকশা করা হচ্ছে।
পাম্পগুলোতে তেলের জন্য মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইন আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা এখন নিত্য চিত্র। অন্যদিকে গ্যাসের অভাবে চারটি বড় সার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, লোডশেডিংয়ে গার্মেন্টস খাত ধুঁকছে।
পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সতর্ক করে দিয়েছে যে, তেলের সরবরাহ ও নিরাপত্তার অভাবে যেকোনো সময় সারাদেশের পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতেই জনগণের ওপর চড়াও হওয়া এই সরকারের লুটপাটের মানসিকতা দেশকে এক দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

