ভাটারার পুলিশ হাউজিং সোসাইটির তিনতলা বাড়িটার অনলাইন বিজ্ঞাপনে ক্রেতাদের আশ্বাস দেওয়া ছিল, এখানে পুলিশ রেইডের কোনো সম্ভাবনা নেই। আশ্বাসের পেছনের কারন হলো বাড়ির মালিক খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জাহির। ২০২৫ সাল থেকে সেখানে মাসে বিশ-বাইশটা পার্টি হয়েছে, ডিবি নিশ্চিত করেছে, আয়ের ৭০% যেত তাঁর পকেটে। ১৯ অক্টোবর মধ্যরাতে সেই বাড়িতেই ডিবি ঢুকল। আটক হলো ৫৮ জন পুরুষ আর ২৬ জন নারী। বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত মামলা হয়নি, তাঁকে শুধু পুলিশ সদর দপ্তরের আরেক শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলছেন, নিজের বাসা ভাড়া দিয়েছি, এতেঅপরাধ কোথায়?
অপরাধ কার, সেটা বুঝতে ব্রিফিংয়ের পরের অংশটা দেখা দরকার। ডিবির উপকমিশনার সাংবাদিকদের বললেন, ধোঁয়াচ্ছন্ন ঘরে গান ছেড়ে নাচ হচ্ছিল, নারীদের বেশির ভাগের বয়স কুড়ি থেকে বাইশ, কেউ কেউ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। জব্দ তালিকায় কনডমও উঠল। পরদিনের পত্রিকার শিরোনাম ওই কথাগুলো দিয়েই সাজানো। অথচ ডিবির কয়েকজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জব্দ তালিকাটা দেখতে বলেছেন গণমাধ্যমকে। চুরাশি জনের পার্টিতে মিলেছে একটা খালি বোতল, তিনটা আধাভরা বোতল, একটা ইয়াবা আর অল্প গাঁজা। ব্রিফিং আর তালিকার মধ্যে এই দূরত্ব ডিবির ভেতরের লোকেরাই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন। এর ওপর ২০১৫ সালের হাইকোর্টের রায় আছে, যেখানে আটক ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করতে মানা। বয়স আর পড়ার জায়গা প্রকাশ করার আগে সেটা কারও মনে পড়েনি।
সাজার হিসাবটাও অদ্ভুত। আটকের প্রায় আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে ডিএমপির সংক্ষিপ্ত বিচারে পুরুষদের এক মাস জেল ও এক হাজার টাকা জরিমানা, নারীদের পনেরো দিন ও পাঁচশো টাকা। কোন আইনের কোন ধারায় এই রায়, আর একই আইনে নারী-পুরুষের মেয়াদ আলাদা হয় কোন যুক্তিতে, তা কোনো আলাপ নেই।
এসব সম্ভব হচ্ছে কারণ আইনটাই সেভাবে লেখা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ২৩ ধারা অনুযায়ী উপপরিদর্শক বা তার ওপরের যেকোনো কর্মকর্তা লাইসেন্সবিহীন যেকোনো জায়গায় দিনরাত ওয়ারেন্ট ছাড়া ঢুকতে পারেন। শুধু ঢোকার আগে নিজের সন্দেহের কারণটা নিজের কাছে লিখে রাখতে হয়। ঢুকে বাধা পেলে ভাঙা যায়, উপস্থিত সবাইকে তল্লাশি করা যায়। ফৌজদারি কার্যবিধিতে তল্লাশির কারণ দেখাতে হয় এবং পরে ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হয়, মাদক আইনে সেই বাধ্যবাধকতা নেই। একটা বোতল থাকতে পারে, এই বিশ্বাসই কারও ফ্ল্যাটে মধ্যরাতে ঢোকার জন্য যথেষ্ট। সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ ঘরকে সুরক্ষা দিয়েও জনগণের নৈতিকতার দোহাইয়ে যুক্তিসংগত বাধার সুযোগ রেখেছে, আর যুক্তিসংগত কি না তা মাপার ভারটা বাস্তবে পড়ে সেই কর্মকর্তার ওপরই, যিনি ঢুকছেন।
বারে অভিযানের কারণ হিসেবে লেখা হয় লাইসেন্স, শুল্ক, রাজস্ব। ধরা পড়ে কিন্তু কাস্টমাররা। অক্টোবরে গুলশানের আর ক্যানভাস ও মিডিয়া ক্লাব থেকে ১০৯ জনকে পারমিট ছাড়া মদ পানের দায়ে আটক করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, দুই দিন পর আমারির বার থেকে সাতজনকে। এপ্রিলে উত্তরার কম্বে বারে ধরা হয় ৫৭ নারীসহ ১৪০ জনকে, সেখানে একফোঁটা মদও জব্দ হয়নি। বারটা লাইসেন্স ছাড়াই চলত, কারণ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় পুলিশ মাসোহারা পেত। যাঁরা মাসোহারা খেয়ে বারটা চালু রাখলেন, তাঁরাই একদিন সেখানে বসা মানুষদের ধরে নিয়ে গেলেন।
পারমিট ব্যবস্থার চেহারা দেখলে বোঝা যায় এই ধরপাকড় কেন এত নির্বিঘ্ন! অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পুরো দেশে বিদেশি মদের পারমিট প্রায় তেরো হাজার জনের, দেশি মদের আটাশ হাজারের কাছাকাছি, যা মদ খাওয়া মানুষের সংখ্যার তুলনায় ছিটেফোঁটা। চিকিৎসা সনদ জোগাড় করা যায় বারের মাধ্যমে, দুই হাজার টাকা ফিতে, কয়েক দিনে। পারমিট ছাড়া যাঁরা খান তাঁদের কাছ থেকে চেকপোস্টে টাকা নেয় পুলিশ। ফলে ঢাকার একটা বারে এক সন্ধ্যায় বসা মানুষদের বড় অংশ আইনের চোখে অপরাধী, আর কোন রাতে কাকে তুলে আনা হবে সেই বাছাই পুরোপুরি পুলিশের। সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পুলিশের দুর্নীতির যে নয় ধরন তালিকাভুক্ত করেছিল, তার একটার নাম “গ্রেপ্তার ও অভিযান বাণিজ্য”। যে আইনে প্রায় সবাই আসামি, সেখানে বাছাই করে ধরার ক্ষমতা মানে দরদামের ক্ষমতা।
আবাসিক হোটেলের ঘটনায় তো আইনের ধারাটাও উধাও। প্রায় প্রতি সপ্তাহে অসামাজিক কার্যকলাপের নামে নারী-পুরুষ আটকের খবর আসে, অথচ প্রাপ্তবয়স্ক দুজন মানুষের একসঙ্গে ঘরে থাকা কোনো আইনে অপরাধ নয়। ডিএমপি অধ্যাদেশের অশালীন আচরণের ধারা আর দণ্ডবিধির ২৯৪ ধারা প্রকাশ্য স্থানের জন্য, তালা দেওয়া কামরার জন্য নয়। তাই বিচার প্রায় হয়ই না। হয় ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা, নয়তো থানায় অভিভাবকের মুচলেকা। যে পরিবার লজ্জায় মেয়েকে চুপচাপ ছাড়িয়ে আনল, সে আদালতে গিয়ে জানতে চাইবে না কোন ধারায় ধরা হয়েছিল। ডিএমপি অধ্যাদেশের ৫১ ও ৫২ ধারায় বেআইনি প্রবেশ ও হয়রানিমূলক তল্লাশির জন্য কর্মকর্তাদের শাস্তির বিধান আছে, কিন্তু এই ধারায় কারও শাস্তি হয়েছে বলে কোথাও পাওয়া যায় না।
এই নীরবতা নিয়ে যাঁরা ব্যবসা করেন, তাঁদের তালিকায় শুধু পুলিশ নেই। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামে ডিবির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, এক আটক ব্যক্তিকে তারা দুই প্যাকেজ দিয়েছিল, এক লাখে চারশো ইয়াবা দেখিয়ে মামলা, দুই লাখে মামলাই নেই। ভয়ের এই বাজারে ভুয়া লোকও ঢুকেছে। জুলাইয়ে ডিবি পরিচয়ে কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর মাকে ফোন করে বলা হয়, মেয়ে হোটেলে ধরা পড়েছে, ছাড়াতে লাগবে এক লাখ বিশ হাজার টাকা। সেপ্টেম্বরে হালিশহরে কয়েকজন তিন নারীর ভিডিও করে অসামাজিক কাজের অভিযোগে এক লাখ টাকা চায়। এরা পুলিশ নয়, কিন্তু যে ভয় তারা বিক্রি করছে সেটা পুলিশের অভিযানেই তৈরি।
এবার আসি আসল প্রশ্নে, এই কাঠামো টিকিয়ে রাখার রাজনৈতিক ঠিকাদারি ঠিক কার হাতে? শুরুটা দিরাইয়ের হাতিয়া গ্রামেই দেখা যায়। প্রবাসীর মেয়ের জন্মদিনে দুই নারী বাউলশিল্পীর গান হওয়ার কথা ছিল। মাদ্রাসা ও আলেমদের কথা টেনে দুজন বাসিন্দা থানায় আবেদন করলেন, গানের নামে অশ্লীলতা হতে পারে। হতে পারে মানে ঘটেনি। ওসি নিজেই বলছেন আয়োজনটা ঘরোয়া বাউলগানের, তবু থানা থেকে ফোন গেল, আসর বাতিল হলো। ফোনটা কোন আইনে, সে প্রশ্নের জবাব কেউ দেয়নি। ধর্মীয় আপত্তি তুললেই রাষ্ট্র পা বাড়ায়, এই বার্তা নিয়মিত পৌঁছে দিচ্ছে ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো। তাদের আপত্তিতে তারাগঞ্জে ইউএনওর ১৪৪ ধারায় মেয়েদের ফুটবল বন্ধ হয়েছে। তৌহিদী জনতা আট ঘণ্টা শাহবাগ থানা ঘেরাও রাখার পর হয়রানির অভিযুক্ত জামিন পেয়েছেন। লালমাটিয়ায় সিগারেট খাওয়ার কারণে দুই তরুণীর ওপর হামলার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, তাঁরা সিগারেট খাচ্ছিলেন, আর প্রকাশ্যে ধূমপান নারী-পুরুষ দুজনের জন্যই অপরাধ। হামলাকারীর নাম সেদিন তাঁর মুখে আসেনি।
বিএনপি সরকার এই ধারাকে থামায়নি, উলটো নিজের ভোটের হিসাবে বসিয়ে পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর ১৮ তারিখেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, মব সংস্কৃতির দিন শেষ। এইচআরএসএসের হিসাবে শুধু মার্চেই অন্তত ২৫টা মব হামলায় ১৩ জন প্রাণ হারান। জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী মদ ও জুয়া নিষিদ্ধের যে বিল এনেছিলেন, আইনমন্ত্রীর আপত্তির পর ৯ জুলাই সেটা প্রত্যাহার হয়। যুক্তি ছিল, মদ নিয়ন্ত্রণের বিধান আইনে আছেই। এক মাস পর ৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হেফাজতের নেতাদের বললেন, আমরা একসঙ্গে থাকতে চাই, আর তাদের নয় দফা ধাপে ধাপে পূরণের আশ্বাস দিলেন। সেই নয় দফার ভেতরে ধর্ম অবমাননা আইন, আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা, বাধ্যতামূলক ইসলাম শিক্ষা আর আলেমদের মামলা প্রত্যাহার। মদ, বার বা পার্টির নাম নেই। তবু সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে ঢাকার বারে ধারাবাহিক অভিযান শুরু। এক হাতে হেফাজতকে আশ্বাস, অন্য হাতে জামায়াতের দাবির জবাবে বলা হলো আইন আছে আর সেই আইনের প্রয়োগ চোখের সামনে।
এদের দলের ছেলেরা কীভাবে আইন নিজের হাতে নেয়, সেটা নরসিংদীতে দেখা গেছে। ১৯ সেপ্টেম্বর একটা লাইসেন্সপ্রাপ্ত মদের দোকানের কর্মচারীকে বিনা পয়সায় মদ না দেওয়ায় আগুনে পোড়ানো হলো। ছয় দিন পর জেলা যুবদল ও ছাত্রদলের সভাপতি গিয়ে সেই দোকানে তালা ঝোলালেন। পুলিশকেই শেষে বলতে হলো, দোকান বন্ধ বা সরানোর এখতিয়ার শুধু লাইসেন্স কর্তৃপক্ষের। শাসক দলের দুই অঙ্গসংগঠন একটা বৈধ ব্যবসা বন্ধ করে দিল, অথচ সেই ক্ষমতা তাদের কাছে ছিল না।
লাগাম টানার ব্যবস্থাগুলো একে একে সরে গেছে। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গড়ার অধ্যাদেশ এপ্রিলের ১১ তারিখে মেয়াদ ফুরিয়ে বাতিল হয়েছে। জুলাইয়ে সংসদ মাদক আইন সংশোধন করে অধিদপ্তরকে অস্ত্র ও নিজস্ব হাজতখানা দিয়েছে, লাইসেন্স ভাঙার জরিমানা বাড়িয়েছে, কিন্তু রাতের তল্লাশিতে কোনো শর্ত জোড়েনি। নৈতিকতা কী, কে ঠিক করবে, সেই ক্ষমতা তাই এখন যাঁর হাতে, তিনি একই সঙ্গে ধরেন, ছাড়েন, ব্রিফিং দেন আর পকেটে কী যায় সেটা জানেন। মানবাধিকারের কথা উঠলে এই ব্যবস্থায় একটাই উত্তর মেলে, “কাগজে আছে”।

