বাংলাদেশ ভারতে সর্বশেষ টি-২০ বিশ্বকাপ খেলতে যায়নি। সেদিন দেশবাসীকে বলা হয়েছিল, সিদ্ধান্তটা নাকি ক্রিকেট বোর্ড আর খেলোয়াড়দের। আর আজ, এতোদিন পর বিসিবি জানাচ্ছে, সিদ্ধান্তটা ছিল তৎকালীন অ-সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একার। তিনি নিজেও সেটা স্বীকার করেছেন।
অর্থাৎ যেদিন কোটি মানুষকে বলা হলো “এটা বোর্ড আর খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্ত”, সেদিন কথাটা ছিল পুরোপুরি মিথ্যা। মানুষ তখন কষ্ট পেয়েও মেনে নিয়েছিল, কারণ ভেবেছিল সিদ্ধান্তটা সবার। বিশ্বাসটাই ভাঙা হয়েছে, ক্ষতির আগে সেটাই প্রথম অপরাধ। যাঁরা বছরের পর বছর রাজনীতিবিদদের মিথ্যাবাদী বলে গালি দিয়েছেন, ক্ষমতার চেয়ারে বসে তাঁরা নিজেরা কী করলেন, সেটা এখন সবার সামনে।
নিরাপত্তাহীনতার যুক্তিটা একটু ঘেঁটে দেখা যাক এবার। ভারত বিশ্বকাপের আয়োজক। অন্য সব দেশের দল সেখানে খেলেছে, নিরাপত্তাও পেয়েছে। বাংলাদেশের দলের বেলায় ব্যতিক্রম ঘটত, এমন কোনো প্রমাণ কেউ দেখায়নি। যুক্তিটা আরও দুর্বল হয়ে যায় একটা সহজ হিসাবে। একটা দলের গায়ে আঁচ লাগলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হতো আয়োজক ভারতেরই। এরপর বছরের পর বছর কোনো দেশ ওখানে খেলতে যেতে চাইত না।
ভারতের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোও নিজের দেশকে অনিরাপদ হিসেবে পরিচিত করতে চাইবে, এমন ভাবা কঠিন। নিরাপত্তা নিয়ে এতই উদ্বেগ ছিল তো সরকার ভারতের কাছ থেকে লিখিত নিশ্চয়তা আদায়ের কূটনৈতিক চেষ্টা করল না কেন? বর্জন তো শেষ উপায়। এখানে সেটাকেই প্রথম উপায় বানানো হলো।
আসল সমস্যা আসলে আরও গভীরে। একটা জাতীয় দল বিশ্বকাপে খেলবে কি না, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের আবেগ, খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার, দেশের ক্রীড়া অর্থনীতি। এমন সিদ্ধান্ত একজন মানুষ একা নিতে পারেন কীভাবে? কোনটা জাতিগত অবমাননা, কোনটা নয়, সেটা ঠিক করার এখতিয়ার একা কাউকে কে দিয়েছে? বিষয়টা তাঁর ব্যক্তিগত হলে কথা ছিল না। কিন্তু এটা রাষ্ট্রীয়, আর রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত সম্মিলিতভাবে নেওয়াই গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্ত। একা বসে একা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নাম স্বৈরতন্ত্র, তার গায়ে যত সুন্দর লেবেলই থাকুক না কেনো।
ক্ষতির হিসাবটাও নেহায়েত কম নয়। বিশ্বকাপ কয়েক বছর পর পর আসে। এবার যাঁরা ফর্মের চূড়ায় ছিলেন, পরের বার তাঁদের বয়স বা ফর্ম থাকবে, এই নিশ্চয়তা কে দেবে? বিশ্বকাপে ভালো খেললে বিদেশি লিগের প্রস্তাব আসে, বিজ্ঞাপনের চুক্তি আসে, পুরস্কারের অর্থ আসে, পরিবার-পরিজনের সামাজিক সম্মান বাড়ে। পরের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তাঁদের দেখে স্বপ্ন দেখে। একজন ক্রিকেটারের সারা জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ ছিল এই বিশ্বকাপ। সেই মঞ্চ এক কলমের খোঁচায় কেড়ে নেওয়া হলো।
অন্যদিকে পতাকা, জার্সি আর টুপি বেচে যেসব ছোট ব্যবসায়ী এই সময়টায় একটু বাড়তি আয় করেন, রেস্তোরাঁ আর খাবার সরবরাহকারীরা যে বাড়তি অর্ডার পান, তাঁদের কথা বিবেচনায় ছিল কি না, জানা নেই। আর কঠিন পরিবেশে খেলে নিজেকে তৈরি করার যে অভিজ্ঞতা, সেটাও গেল। শত্রুভাবাপন্ন গ্যালারিতে কীভাবে খেলতে হয়, সেটা শেখার সুযোগ একটা দল বারবার পায় না।
তাহলে কেন এই সিদ্ধান্ত? যে সরকারের দেখানোর মতো অর্জন নেই, তার হাতে সবচেয়ে সহজ অস্ত্র সস্তা জাতীয়তাবাদ। বাংলাদেশে ভারতবিরোধিতা সবচেয়ে সহজে বিক্রি হয়। এতে মানুষের মনোযোগ সরে যায়, সংবাদমাধ্যমের নজর ঘুরে যায়, আর নিজেকে দেশপ্রেমিক হিসেবে দাঁড় করানো যায়। ৫ আগস্টের পর যে ভারতবিরোধী আবহ তৈরি হয়েছিল, তাকে আরও উসকে দিয়ে নিজের অবস্থান পাকা করাই ছিল উদ্দেশ্য। দাম দিল ক্রিকেট।
এখন একটু পেছনে তাঁকানো দরকার। আসিফ নজরুল তো একজন উপদেষ্টা মাত্র, তিনি কার সরকারের অংশ ছিলেন? সে ছিলো বিদেশী রাষ্ট্রের টাকায়, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় আর সামরিক বাহিনীর সমর্থনে ২০২৪ সালে দেশব্যাপী জুলাই দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেশের নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলে দিয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা সুদী মহাজন ইউনুসের তথাকথিত অ-সরকারের। তার সরাসরি ক্ষমতা দখল করেছিলো, কোনো ভোটে জেতেননি, তাই ভোটারের কাছে জবাবদিহিতাও ছিলো না কোনো। জবাবদিহি নেই, তাই সংসদে প্রশ্ন জাগার ভয় নেই, মন্ত্রিসভায় বিতর্ক নেই। একজন উপদেষ্টা তখন নির্বিঘ্নে একটা জাতীয় সিদ্ধান্ত একাই নিয়ে ফেলতে পারেন, আর পরে প্রয়োজনমতো সত্যটা চেপেও যেতে পারেন। বিশ্বকাপ বর্জন কোনো একক ভুল নয়। অনির্বাচিত ক্ষমতার স্বাভাবিক চেহারাই এটা।
ইউনুস আজ আর ক্ষমতায় নেই। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে ক্ষমতায় বিএনপি। কিন্তু ক্ষমতা থেকে নেমে যাওয়া মানেই সকল হিসাব মিটে যাওয়া নয়। ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের কথা মানুষ যেভাবে ভুলে গেছে, এঁদের কথাও একদিন ভুলে যাবে, আর সেটাই অনির্বাচিত শাসকদের সবচেয়ে বড় সুবিধা। তাঁরা চলে যান, ক্ষতিটা থেকে যায়। এবারের বিশ্বকাপটা গেছে, কিন্তু তাঁরা আরও কত কিছু নিয়ে গেছেন, সেই হিসাব বাংলাদেশ আদৌ মেলাতে পারবে কি না, সন্দেহ আছে।

