২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে এসে ঢাকার রাজনীতিতে এখন একটাই আলোচনা। স্ট্রিম কানেক্ট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে সরকারের ভেতরে আরেকটি সরকার বানিয়ে ফেলেছে তলে তলে!
কাগজে-কলমে এটি একটি বেসরকারি কোম্পানি। কিন্তু এর ওয়েবসাইট খুললে মনে হয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাজারের পুরো নকশা তুলে রেখেছে তারা! খাদ্যশস্য, নিত্যপণ্য, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, আইসিটি, টেলিযোগাযোগ, এলএনজি, জ্বালানি অনুসন্ধান – কি নেই! প্রতিটি খাতে তারা আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর স্থানীয় প্রতিনিধি হতে চায়।
সমস্যাটা এখানেই। যে খাতগুলোতে তারা ব্যবসা করতে চায়, সেই খাতগুলোর নিয়ন্ত্রণ, নীতি আর ক্রয়ের সিদ্ধান্ত যাদের হাতে, তাদেরই অনেকেই এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
‘দ্য বে স্ট্রিম ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা হয় ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই। ট্রাস্টের চেয়ারম্যান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালকও ছিলেন। ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট যোগ দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার প্রায় এক বছর আগে।
ট্রাস্টের আরেক ট্রাস্টি রেহান এ. আসাদ। সরকারি পরিচয়ে তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। দায়িত্বে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। স্ট্রিম কানেক্টের আইসিটি ও টেলিযোগাযোগ ব্যবসার ঘোষণার পর এই নামটা এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
রেহানের ভূমিকা শুধু দেশের ভেতরেই থেমে নেই। ২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা সমঝোতায় বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে জ্যাকব হেলবার্গ। রেহান নিজেই স্বাক্ষরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মীর নাদিয়া নিভিন ট্রাস্টের আরেক ট্রাস্টি। ২০২৬ সালের ১৬ জুন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হন। আগে ছিলেন নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য।
গোলাম ইফতেখার মাহমুদ একই সঙ্গে ট্রাস্টের ট্রাস্টি, স্ট্রিম কানেক্টের পরিচালক এবং ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক। ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশের পরিচালক। স্ট্রিম কানেক্ট যখন জ্বালানি ও গ্যাস খাতে আগ্রহ দেখাচ্ছে, তখন রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ কোম্পানিতে তার অবস্থান প্রশ্ন তোলার মতো।
নাহিদুল এইচ খানকে স্ট্রিম কানেক্ট ও মিডিয়া স্ট্রিমের ওয়েবসাইটে চেয়ারম্যান বলা হয়েছে। কিন্তু দ্য বে স্ট্রিম ট্রাস্টের প্রকাশিত ট্রাস্টি তালিকায় তার নাম নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ফুয়েল কোম্পানি এলএলসি এবং জর্জিয়া ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ এলএলসি পরিচালনার কথা তার পরিচিতিতে আছে। জর্জিয়ার নিবন্ধন নথিতে ২০১৯ সালে জর্জিয়া ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ এলএলসি প্রতিষ্ঠার সময় তাকে নিবন্ধিত প্রতিনিধি ও সংগঠক হিসেবে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের বাণিজ্য চুক্তির পর এই সংযোগগুলোর ওজন বেড়েছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পাঁচ বছর ধরে বছরে অন্তত সাত লাখ মেট্রিক টন গম, নির্ধারিত পরিমাণ সয়াবিন ও সয়াপণ্য এবং তুলা কেনার চেষ্টা করবে। কৃষিপণ্যের আনুমানিক মূল্য ৩৫০ কোটি ডলার। একই নথিতে মার্কিন জ্বালানি কেনার আনুমানিক মূল্য ১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার এবং মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর কথা আছে।
খাদ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা – তিনটি খাতই স্ট্রিম কানেক্টের ঘোষিত ব্যবসার তালিকায়। প্রতিরক্ষা পাতায় আন্তর্জাতিক নির্মাতার প্রতিনিধিত্ব ও জাতীয় প্রতিরক্ষা ক্রয়ে কাজ করার পরিকল্পনা। আইসিটি পাতায় সরকারি প্রকল্পে কৌশলগত সমন্বয়ের দাবি। জ্বালানি পাতায় এলএনজি সরবরাহকারী ও টার্মিনাল পরিচালনাকারীদের স্থানীয় প্রতিনিধি হওয়ার কথা।
সরকারি নীতি, সরকারি ক্রয় আর বেসরকারি ব্যবসার মধ্যে দূরত্ব বলে কিছু থাকলে সেটা এখানে প্রশ্নের মুখে। কারণ যারা নীতি নির্ধারণে বসে, তারাই কোম্পানির নেতৃত্বে। যারা আন্তর্জাতিক চুক্তি সই করে, তারাই ট্রাস্টের ট্রাস্টি। যারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চালায়, তারাই কোম্পানির পরিচালক!
মনে হচ্ছে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি-জামাতের অপশাসনের সেই দুঃশাসনই আবার ফিরে এসেছে ২০২৬ সালে। তখন ছিল সরাসরি ক্ষমতার দাপট আর এখন আছে সরকারের ভেতরে সরকার হয়ে ওঠা এক সিন্ডিকেট। স্ট্রিম কানেক্টের ওয়েবসাইট আসলে সেই সিন্ডিকেটেরই পরিপূর্ণ মানচিত্র।

