BRICS থেকে দূরত্ব: বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ কি বিসর্জনের পথে?

রৌদ্র রুদ্র:
বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা অর্থনৈতিক কাঠামো, অন্যদিকে চীন, ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিলসহ উদীয়মান শক্তিগুলোর নেতৃত্বে Global South-এর প্রভাব বাড়ছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম BRICS।

নয়াদিল্লিতে ১২–১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলন। বাংলাদেশ BRICS-এর সদস্য নয়। তবে BIMSTEC-এর বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশকে সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ঢাকা সেই সুযোগ গ্রহণ করেনি এবং সম্মেলনে বাংলাদেশের কোনো সরকারি প্রতিনিধিত্বও থাকছে না। প্রশ্ন হলো—এটি কি কেবল একটি কূটনৈতিক প্রটোকলের বিষয়, নাকি দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত?

বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকসের উত্থান: BRICS-এর বর্তমান সদস্যদের সম্মিলিত শক্তি এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। ভারত সরকারের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ১১ সদস্যের BRICS বিশ্বের প্রায় ৪৯.৫ শতাংশ জনসংখ্যা, ৪০ শতাংশ বৈশ্বিক GDP এবং ২৬ শতাংশ বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিনিধিত্ব করে।

এই শক্তির সবচেয়ে বাস্তব প্রমাণ তাদের পারস্পরিক বাণিজ্যে। ২০০৩ সালে BRICS দেশগুলোর মধ্যকার পণ্য বাণিজ্য ছিল মাত্র ৮৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.১৭ ট্রিলিয়ন ডলারে—অর্থাৎ দুই দশকে প্রায় ১৩ গুণ। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক জোট নয়; এটি ক্রমবর্ধমান বাজার, বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থা ও উন্নয়ন অর্থায়নের একটি বড় অর্থনৈতিক পরিসর।

আমন্ত্রণ পেয়েও ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশ অনুপস্থিত: বাংলাদেশকে BIMSTEC চেয়ারম্যান হিসেবে BRICS সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেনি। সরকারের অবস্থান ছিল, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর দ্বিপক্ষীয় হওয়া উচিত এবং আমন্ত্রণটি মূলত BIMSTEC চেয়ারম্যানের উদ্দেশে ছিল।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—একটি আঞ্চলিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়, সেটিকে কি কেবল প্রটোকলের চাদরে ঢেকে হাতছাড়া করা উচিত?

BRICS সম্মেলনে উপস্থিত হওয়া মানে BRICS-এর সদস্য হওয়া নয়, কোনো পক্ষের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়াও নয়। বরং এর অর্থ ছিল ভারত, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিলসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান অর্থনীতির নেতৃত্বের সঙ্গে একই মঞ্চে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ তুলে ধরার সুযোগ পাওয়া।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত ও কৌশলগত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের নেতারা BRICS-এর একই মঞ্চ ব্যবহার করছেন। ২০২৬ সালের সম্মেলনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিং বৈঠকও করেছেন এবং বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা ও সীমান্ত শান্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। বড় শক্তিগুলো নিজেদের বিরোধের মধ্যেও যখন বহুপাক্ষিক মঞ্চকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে, তখন বর্তমান সরকারের খামখেয়ালিতে বাংলাদেশ কেন সেই মঞ্চ থেকে দূরে থাকবে—এই প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই।

শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা: ব্রিকসের অর্থনৈতিক কাঠামোয় বাংলাদেশের প্রবেশ: বাংলাদেশ সরাসরি BRICS-এর সদস্য না হলেও, এই জোটের সৃষ্ট New Development Bank (NDB)-এর সদস্য। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০২৩ সালের জুনে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতির বৈঠকের পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসের সদস্য হওয়ার জন্য ‘লেটার অব ইন্টারেস্ট’ বা আগ্রহপত্র জমা দিয়েছিল। তবে তার আগেই ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে NDB-এর সদস্যপদ লাভ করেছিল।

অর্থাৎ তৎকালীন সফল রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ এমন একটি বিকল্প উন্নয়ন অর্থায়ন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, যার মূল উদ্যোক্তা ছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এর গুরুত্ব আজ আরও স্পষ্ট।

NDB ইতোমধ্যে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত NDB-এর অনুমোদিত প্রকল্প ৩টি, যার মোট অনুমোদিত অর্থায়ন ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ শেখ হাসিনার সরকারের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তটি কোনো প্রতীকী কূটনৈতিক পদক্ষেপ ছিল না; এটি বাংলাদেশের জন্য বিকল্প বৈদেশিক অর্থায়নের এক সুদূরপ্রসারী দরজা খুলে দিয়েছিল।

প্রটোকল নাকি চরম কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব?: প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর দ্বিপক্ষীয় হওয়া উচিত—এটি সরকারের একটি সীমিত রাজনৈতিক বিবেচনা হতে পারে। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক কূটনীতি পরস্পরের বিকল্প নয়। বরং বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন একই সঙ্গে সব কূটনৈতিক মঞ্চ সমানভাবে ব্যবহার করা।

যে সম্মেলনে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এবং বৈশ্বিক GDP-এর প্রায় ৪০ শতাংশ প্রতিনিধিত্বকারী দেশগুলো একত্রিত হচ্ছে, সেখানে উপস্থিত থেকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সংযোগ নিয়ে যোগাযোগ তৈরি করার সুযোগকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।

ডি-ডলারাইজেশনের নতুন বাস্তবতা: BRICS-এর আর্থিক আলোচনায় স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, সীমান্তপারের পেমেন্ট এবং বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এটিকে সরাসরি “ডলারের পতন” হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৬ সালের সম্মেলনে কোনো অভিন্ন BRICS মুদ্রা চালুর সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সদস্য দেশের পেমেন্ট ও মেসেজিং ব্যবস্থার সংযোগ নিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো বৈদেশিক মুদ্রা ও জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি সংগ্রহের এই পরিবর্তনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বর্তমান প্রশাসনের উদাসীনতা ও অদূরদর্শী নীতির কারণে বৈশ্বিক এই পরিবর্তনশীল আর্থিক কাঠামো থেকে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও সাশ্রয়ী বাণিজ্যের সুযোগ হাতছাড়া: ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলো বিশ্ববাজারের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎপাদক ও নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি। রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর এই জ্বালানি বাজার থেকে কম দামে তেল সংগ্রহ করে ভারত ও চীন নিজেদের অর্থনীতি ও শিল্প খাতকে সচল রেখেছে। অথচ ব্রিকস সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকার কারণে বাংলাদেশ বৈশ্বিক এই সাশ্রয়ী জ্বালানি সংগ্রহের নেটওয়ার্ক থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে।

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য: স্লোগান নয়, নির্মম বাস্তবতা: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভারতের গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাণিজ্যের পরিসংখ্যানে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ১০.৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ১.৭৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি প্রায় ৯.২১ বিলিয়ন ডলার।

এই বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক আবেগ বা দ্বিপক্ষীয় সফরের সংকীর্ণ প্রটোকলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, সীমান্ত এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা—সবকিছুকে একসঙ্গে নিখুঁত হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে।

এনডিবির সুযোগ কি বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারছে?: এখানেই বর্তমান প্রশাসনের বড় ব্যর্থতা ফুটে ওঠে। একদিকে NDB-এর সামগ্রিক প্রকল্প অর্থায়ন প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলার; অন্যদিকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে অনুমোদিত প্রকল্প ৩টি, মোট ৪৫০ মিলিয়ন ডলার।

এটি প্রমাণ করে যে বর্তমান প্রশাসন শুধু ব্রিকস সম্মেলন বয়কটই করছে না, বরং পূর্বের অর্জিত অর্থনৈতিক সুযোগগুলোর পূর্ণ সদ্ব্যবহারেও চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন ও জলবায়ু-সহনশীল প্রকল্পে এই অর্থায়নের পরিসর আরও বাড়ানো সম্ভব হলেও হঠকারী নীতির কারণে তা থমকে আছে।

বহুমুখী কূটনীতিই বাংলাদেশের প্রকৃত স্বার্থ: আধুনিক কূটনীতির মূল শক্তি হলো—একটি পক্ষ বেছে নিয়ে অন্য পক্ষকে দূরে ঠেলে দেওয়া নয়; বরং জাতীয় স্বার্থে যত বেশি সম্ভব দরজা খোলা রাখা।

ভারত নিজেই BRICS-এর পাশাপাশি পশ্চিমা ও এশীয় বিভিন্ন বহুপাক্ষিক কাঠামোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এমনকি ভারত-চীন সম্পর্কের গভীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও দুই দেশ BRICS-এর মঞ্চ ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশেরও প্রয়োজন ছিল একই ধরনের বাস্তববাদী কূটনীতি—ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং Global South—সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। BRICS-এর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো মানে কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়।

একটি সম্মেলন, নাকি সবচেয়ে বড় সুযোগ হারানো?: BRICS সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতিকে কেবল একটি সাধারণ কূটনৈতিক দূরত্ব বলা ভুল হবে; এটি বর্তমান প্রশাসনের খামখেয়ালি ও আত্মঘাতী নীতির বড় প্রমাণ। যে বিশ্ব দ্রুত বহুমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, সেখানে কূটনৈতিক প্রটোকল ও রাজনৈতিক হীনম্মন্যতার কারণে সম্ভাবনার দরজাগুলো নিজেই সংকুচিত করে বাংলাদেশ আজ বিশ্বমঞ্চের সবচেয়ে বড় ‘লুজার’ বা ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই আত্মঘাতী বিচ্ছিন্নতা অব্যাহত থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে ছিটকে পড়ে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এক গভীর ও অপূরণীয় সংকটের মুখে পড়তে পারে—যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো জাতিকে এক চরম মূল্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।I

লেখাঃ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

রৌদ্র রুদ্র:
বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা অর্থনৈতিক কাঠামো, অন্যদিকে চীন, ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিলসহ উদীয়মান শক্তিগুলোর নেতৃত্বে Global South-এর প্রভাব বাড়ছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম BRICS।

নয়াদিল্লিতে ১২–১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলন। বাংলাদেশ BRICS-এর সদস্য নয়। তবে BIMSTEC-এর বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশকে সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ঢাকা সেই সুযোগ গ্রহণ করেনি এবং সম্মেলনে বাংলাদেশের কোনো সরকারি প্রতিনিধিত্বও থাকছে না। প্রশ্ন হলো—এটি কি কেবল একটি কূটনৈতিক প্রটোকলের বিষয়, নাকি দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত?

বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকসের উত্থান: BRICS-এর বর্তমান সদস্যদের সম্মিলিত শক্তি এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। ভারত সরকারের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ১১ সদস্যের BRICS বিশ্বের প্রায় ৪৯.৫ শতাংশ জনসংখ্যা, ৪০ শতাংশ বৈশ্বিক GDP এবং ২৬ শতাংশ বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিনিধিত্ব করে।

এই শক্তির সবচেয়ে বাস্তব প্রমাণ তাদের পারস্পরিক বাণিজ্যে। ২০০৩ সালে BRICS দেশগুলোর মধ্যকার পণ্য বাণিজ্য ছিল মাত্র ৮৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.১৭ ট্রিলিয়ন ডলারে—অর্থাৎ দুই দশকে প্রায় ১৩ গুণ। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক জোট নয়; এটি ক্রমবর্ধমান বাজার, বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থা ও উন্নয়ন অর্থায়নের একটি বড় অর্থনৈতিক পরিসর।

আমন্ত্রণ পেয়েও ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশ অনুপস্থিত: বাংলাদেশকে BIMSTEC চেয়ারম্যান হিসেবে BRICS সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেনি। সরকারের অবস্থান ছিল, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর দ্বিপক্ষীয় হওয়া উচিত এবং আমন্ত্রণটি মূলত BIMSTEC চেয়ারম্যানের উদ্দেশে ছিল।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—একটি আঞ্চলিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়, সেটিকে কি কেবল প্রটোকলের চাদরে ঢেকে হাতছাড়া করা উচিত?

BRICS সম্মেলনে উপস্থিত হওয়া মানে BRICS-এর সদস্য হওয়া নয়, কোনো পক্ষের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়াও নয়। বরং এর অর্থ ছিল ভারত, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিলসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান অর্থনীতির নেতৃত্বের সঙ্গে একই মঞ্চে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ তুলে ধরার সুযোগ পাওয়া।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত ও কৌশলগত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের নেতারা BRICS-এর একই মঞ্চ ব্যবহার করছেন। ২০২৬ সালের সম্মেলনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিং বৈঠকও করেছেন এবং বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা ও সীমান্ত শান্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। বড় শক্তিগুলো নিজেদের বিরোধের মধ্যেও যখন বহুপাক্ষিক মঞ্চকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে, তখন বর্তমান সরকারের খামখেয়ালিতে বাংলাদেশ কেন সেই মঞ্চ থেকে দূরে থাকবে—এই প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই।

শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা: ব্রিকসের অর্থনৈতিক কাঠামোয় বাংলাদেশের প্রবেশ: বাংলাদেশ সরাসরি BRICS-এর সদস্য না হলেও, এই জোটের সৃষ্ট New Development Bank (NDB)-এর সদস্য। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০২৩ সালের জুনে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতির বৈঠকের পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসের সদস্য হওয়ার জন্য ‘লেটার অব ইন্টারেস্ট’ বা আগ্রহপত্র জমা দিয়েছিল। তবে তার আগেই ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে NDB-এর সদস্যপদ লাভ করেছিল।

অর্থাৎ তৎকালীন সফল রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ এমন একটি বিকল্প উন্নয়ন অর্থায়ন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, যার মূল উদ্যোক্তা ছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এর গুরুত্ব আজ আরও স্পষ্ট।

NDB ইতোমধ্যে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত NDB-এর অনুমোদিত প্রকল্প ৩টি, যার মোট অনুমোদিত অর্থায়ন ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ শেখ হাসিনার সরকারের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তটি কোনো প্রতীকী কূটনৈতিক পদক্ষেপ ছিল না; এটি বাংলাদেশের জন্য বিকল্প বৈদেশিক অর্থায়নের এক সুদূরপ্রসারী দরজা খুলে দিয়েছিল।

প্রটোকল নাকি চরম কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব?: প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর দ্বিপক্ষীয় হওয়া উচিত—এটি সরকারের একটি সীমিত রাজনৈতিক বিবেচনা হতে পারে। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক কূটনীতি পরস্পরের বিকল্প নয়। বরং বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন একই সঙ্গে সব কূটনৈতিক মঞ্চ সমানভাবে ব্যবহার করা।

যে সম্মেলনে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এবং বৈশ্বিক GDP-এর প্রায় ৪০ শতাংশ প্রতিনিধিত্বকারী দেশগুলো একত্রিত হচ্ছে, সেখানে উপস্থিত থেকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সংযোগ নিয়ে যোগাযোগ তৈরি করার সুযোগকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।

ডি-ডলারাইজেশনের নতুন বাস্তবতা: BRICS-এর আর্থিক আলোচনায় স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, সীমান্তপারের পেমেন্ট এবং বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এটিকে সরাসরি “ডলারের পতন” হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৬ সালের সম্মেলনে কোনো অভিন্ন BRICS মুদ্রা চালুর সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সদস্য দেশের পেমেন্ট ও মেসেজিং ব্যবস্থার সংযোগ নিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো বৈদেশিক মুদ্রা ও জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি সংগ্রহের এই পরিবর্তনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বর্তমান প্রশাসনের উদাসীনতা ও অদূরদর্শী নীতির কারণে বৈশ্বিক এই পরিবর্তনশীল আর্থিক কাঠামো থেকে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও সাশ্রয়ী বাণিজ্যের সুযোগ হাতছাড়া: ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলো বিশ্ববাজারের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎপাদক ও নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি। রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর এই জ্বালানি বাজার থেকে কম দামে তেল সংগ্রহ করে ভারত ও চীন নিজেদের অর্থনীতি ও শিল্প খাতকে সচল রেখেছে। অথচ ব্রিকস সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকার কারণে বাংলাদেশ বৈশ্বিক এই সাশ্রয়ী জ্বালানি সংগ্রহের নেটওয়ার্ক থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে।

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য: স্লোগান নয়, নির্মম বাস্তবতা: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভারতের গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাণিজ্যের পরিসংখ্যানে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ১০.৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ১.৭৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি প্রায় ৯.২১ বিলিয়ন ডলার।

এই বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক আবেগ বা দ্বিপক্ষীয় সফরের সংকীর্ণ প্রটোকলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, সীমান্ত এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা—সবকিছুকে একসঙ্গে নিখুঁত হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে।

এনডিবির সুযোগ কি বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারছে?: এখানেই বর্তমান প্রশাসনের বড় ব্যর্থতা ফুটে ওঠে। একদিকে NDB-এর সামগ্রিক প্রকল্প অর্থায়ন প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলার; অন্যদিকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে অনুমোদিত প্রকল্প ৩টি, মোট ৪৫০ মিলিয়ন ডলার।

এটি প্রমাণ করে যে বর্তমান প্রশাসন শুধু ব্রিকস সম্মেলন বয়কটই করছে না, বরং পূর্বের অর্জিত অর্থনৈতিক সুযোগগুলোর পূর্ণ সদ্ব্যবহারেও চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন ও জলবায়ু-সহনশীল প্রকল্পে এই অর্থায়নের পরিসর আরও বাড়ানো সম্ভব হলেও হঠকারী নীতির কারণে তা থমকে আছে।

বহুমুখী কূটনীতিই বাংলাদেশের প্রকৃত স্বার্থ: আধুনিক কূটনীতির মূল শক্তি হলো—একটি পক্ষ বেছে নিয়ে অন্য পক্ষকে দূরে ঠেলে দেওয়া নয়; বরং জাতীয় স্বার্থে যত বেশি সম্ভব দরজা খোলা রাখা।

ভারত নিজেই BRICS-এর পাশাপাশি পশ্চিমা ও এশীয় বিভিন্ন বহুপাক্ষিক কাঠামোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এমনকি ভারত-চীন সম্পর্কের গভীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও দুই দেশ BRICS-এর মঞ্চ ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশেরও প্রয়োজন ছিল একই ধরনের বাস্তববাদী কূটনীতি—ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং Global South—সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। BRICS-এর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো মানে কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়।

একটি সম্মেলন, নাকি সবচেয়ে বড় সুযোগ হারানো?: BRICS সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতিকে কেবল একটি সাধারণ কূটনৈতিক দূরত্ব বলা ভুল হবে; এটি বর্তমান প্রশাসনের খামখেয়ালি ও আত্মঘাতী নীতির বড় প্রমাণ। যে বিশ্ব দ্রুত বহুমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, সেখানে কূটনৈতিক প্রটোকল ও রাজনৈতিক হীনম্মন্যতার কারণে সম্ভাবনার দরজাগুলো নিজেই সংকুচিত করে বাংলাদেশ আজ বিশ্বমঞ্চের সবচেয়ে বড় ‘লুজার’ বা ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই আত্মঘাতী বিচ্ছিন্নতা অব্যাহত থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে ছিটকে পড়ে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এক গভীর ও অপূরণীয় সংকটের মুখে পড়তে পারে—যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো জাতিকে এক চরম মূল্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।I

লেখাঃ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ