মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর সম্প্রতি প্রকাশিত মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মানবধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, জুলাই মাসের তুলনায় আগস্টে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ৩০৬টি থেকে বেড়ে ৩২৭টিতে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ৬.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা ৫২টি থেকে লাফিয়ে ৯১টিতে গিয়ে ঠেকেছে, যা এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। সার্বিকভাবে আগস্ট মাসে জুলাইয়ের তুলনায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ৭২ শতাংশ, ধর্ষণ ও হত্যা ৬৭ শতাংশ, আত্মহত্যা ৩৯ শতাংশ, অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা ৮ শতাংশ, বেআইনি সালিশ ৩৩ শতাংশ এবং মাদক মামলায় আটক ১২৯ শতাংশ বেড়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই চরম অবনতির মাঝে দেশের স্থানীয় পর্যায়ের বিচারহীনতার চিত্র আরও ভয়াবহ। সম্প্রতি গাইবান্ধায় ধর্ষণের শিকার নারীকে অভিযুক্ত ব্যক্তির সাথেই ৭ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। নোয়াখালীতে ১১ বছরের এক শিশুকন্যাকে যৌন হয়রানির অভিযোগে অনিয়মতান্ত্রিক সালিশ ডেকে উল্টো শিশুটিকে ৫০ বেত্রাঘাত ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। শরীয়তপুরে ১২ বছরের এক শিশুকন্যা ধর্ষণের ঘটনা স্থানীয়ভাবে মাত্র ১ লাখ টাকায় মীমাংসার চেষ্টা চালানো হয়েছে। এমনকি আগস্ট মাসে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৩টি জীবিত নবজাতক উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছে এমএসএফ, যেখানে দায়ীদের শনাক্ত বা আইনের আওতায় আনার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
সামাজিক অপরাধ ও অরাজকতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অনলাইন জুয়া ঘিরেও নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়ছে। আগস্টে লালমনিরহাটে অনলাইন জুয়ার প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন একজন শিক্ষক এবং আহত হয়েছেন আরও একজন; এ সংক্রান্ত ঘটনায় নেত্রকোনা, যশোর, রংপুর ও ঢাকা থেকে চারজনকে আটক করা হয়। অন্যদিকে আগস্ট মাসে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ জনে এবং এতে আহত হন অন্তত ৭৪ জন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রেকর্ড ৭১টি অজ্ঞাত বা বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৪ জন নারী। এছাড়া রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতায় আহতের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে ১৮১ শতাংশ বেড়ে ২৬৭ জনে পৌঁছায়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ২৬টি হামলার ঘটনা ঘটে এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় অন্তত ৩৭ জন সাংবাদিক আক্রমণ, হয়রানি ও মামলার শিকার হন।
রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অকার্যকারিতা ও অপরাধীদের মনে শাস্তির ভয় না থাকাই এই চরম নৈরাজ্যের প্রধান কারণ। সমাজবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন যে, আইনের শাসন শিথিল হয়ে পড়লে দেশে বিচারহীনতার এক মারাত্মক সংস্কৃতি জন্ম নেয়, যা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। সালিশের নামে আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘন ও বিচারিক ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার মানসিকতা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোকে ধসিয়ে দিচ্ছে, যা দেশের সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতার এক চরম ও ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।

