রাজধানীর অভিজাত এলাকা এলিফ্যান্ট রোডে রাস্তার উপর পড়ে থাকা অবিস্ফুটিত ককটেল যেন হুমায়ুন আজাদের সেই বিখ্যাত উক্তিটাই মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রতিটি বোমা বিষাক্ত ফুলের মতো ফুটে থাকে নিরীহ মানুষের রক্ত চুষে খাওয়ার অপেক্ষায়!
রাতের অন্ধকারে এসব ককটেল কখন, কীভাবে এলো, কার ইশারায় ছুড়লো, কে বাঁচলো, কে মরলো, এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার লোক এখন বাংলাদেশে বড়ই অভাব। অথচ যাদের দায়িত্ব, তারা ব্যস্ত ক্ষমতার ভাগ বুঝে নেওয়ার হিসাব-নিকাশে। নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা সাধারণ মানুষ তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে, আর রাষ্ট্রযন্ত্রের নীরবতা যেন এক অলিখিত মেনে নেওয়া।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল, সেই দুঃস্বপ্নের সময়টাকে মানুষ ভুলতে বসেছিল। ককটেল, বোমা, গ্রেনেড হামলা, নাশকতা আর আগুন সন্ত্রাস ছিল তখনকার নিত্যদিনের ছবি। পাঁচ বছর ধরে দেশ চলেছিল এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে। তারপর ইতিহাসের পাতা উল্টে মানুষ ভেবেছিল আর ফিরে আসবে না সেই অমানিশা। কিন্তু রাত যত গভীর হয়, পুরনো সেই আতঙ্ক ততই যেন নিঃশ্বাস ফেলে মানুষের ঘাড়ের কাছে।
এলিফ্যান্ট রোডের এই ককটেলগুলো কি শুধুই পড়ে থাকা বস্তু, নাকি কোনো গভীর চক্রান্তের পূর্বাভাস, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। কিন্তু যে সমাজে দিনের আলোয় ককটেল বিস্ফোরণের প্রস্তুতি চলে, সেখানে রাতের অন্ধকারে এর উত্তর খোঁজা বৃথা। পুলিশের বক্তব্য নেই, প্রশাসনের তৎপরতা নেই, উৎসুক জনতার ভিড়ই শুধু সাক্ষী হয়ে রইলো এই আতঙ্কের।
ক্ষমতার ভাগাভাগির সময়ে বারবার প্রশ্নটা উঠেছে, দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা আসলে কার হাতে? যে শক্তি অতীতে দেশকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করেছে, তারাই যখন আবার মসনদে বসার সুযোগ পায়, তখন এলিফ্যান্ট রোডের এই ককটেলগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ভয়ংকর এক সতর্কবার্তা।
সেই ২০০১-০৬ সালের আর ২০২৬ সালের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়, সেটা বোঝার মতো মানুষ এই সমাজে এখনো আছে। পার্থক্য শুধু এই যে তখনকার ভয় আর এখনকার ভয়ের চেহারাটা একই, কিন্তু চারপাশের নীরবতা আরও ঘন, আরও গভীর, আরও অসহায়।

