তুরাগ আজ কেন লাশের নদী?

এস এম কামাল হোসেন
তুরাগ নদীকে আমরা চিনি জীবনের নদী হিসেবে। এই নদী কৃষকের মাঠে জল দেয়, জেলের জালে মাছ তুলে দেয়, শহরের মানুষকে প্রকৃতির নিঃশ্বাস এনে দেয়। কিন্তু আজ আমার চোখে সেই তুরাগ যেন আর কেবল একটি নদী নয়। সে যেন শোকের প্রতীক, কান্নার প্রতীক। তার ঢেউয়ে আমি শুনি মায়ের আর্তনাদ, সন্তানের হাহাকার, স্বজনহারা মানুষের দীর্ঘশ্বাস। আজ তুরাগের জল যেন কারবালার ফুরাত নদীর রক্ত স্রোতে মিশে গেছে। এই নদীতে বীর ছাত্রলীগের তাজা রক্তে লাল হয়েছে।

আমি যখন তুরাগের দিকে তাকাই, তখন মনে হয়—নদীর জল যেন আর স্বচ্ছ নেই। সে যেন রূপক অর্থে রক্তের স্মৃতি বহন করছে। সেই স্মৃতি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে, আমাদের রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে, আমাদের সমাজকে প্রশ্ন করে।

একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, একটি মিছিলে হাঁটা, একটি মত প্রকাশ করা—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এগুলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার হওয়ার কথা। অথচ যখন রাজনৈতিক সহিংসতা, নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ কিংবা প্রতিশোধের রাজনীতির কথা সামনে আসে, তখন মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন জাগে—এই কোন বাংলাদেশ? এই কোন বিচারব্যবস্থা? আওয়ামী লীগ কর্মীকে হত্যা করা যেন দৈনন্দিন খবরে পরিণত করেছে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ও বিএনপির খুনিরা। বিগত দুই বছর ধরে একটাই চিত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নির্মূল করা আর আতঙ্কের সমাজ নির্মাণ করাই তাদের কাজ।

রাজনীতি যদি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য হয়, তাহলে কেন রাজনীতির মাঠে এত মৃত্যু? কেন একজন কর্মীকে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য ভয় নিয়ে বাঁচতে হবে? কেন একজন মা প্রতিদিন অপেক্ষা করবেন—তার সন্তান জীবিত ফিরে আসবে, নাকি শুধু একটি দুঃসংবাদ আসবে?

যে রাষ্ট্রের ভিত্তি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানুষের মর্যাদা, সেই রাষ্ট্রে প্রতিটি প্রাণের মূল্য সমান হওয়া উচিত। কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী, কোনো মতের মানুষ, কোনো আদর্শের অনুসারী—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, আবার কেউ আইনের সুরক্ষার বাইরেও নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস রক্তাক্ত। এই ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দল, বিভিন্ন মতের মানুষ সহিংসতার শিকার হয়েছে। প্রতিশোধের এই রাজনীতি কখনোই কোনো জাতিকে এগিয়ে নিতে পারেনি। বরং প্রতিটি হত্যাকাণ্ড নতুন ঘৃণা জন্ম দিয়েছে, নতুন বিভাজন সৃষ্টি করেছে।

আমার মতো অনেক রাজনৈতিক কর্মীর মনে আজ একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—আমরা কি বারবার হত্যার শিকার হব, আর নীরবে তা মেনে নেব? আমরা কি শুধুই পরিসংখ্যান হয়ে যাব? আমাদের পরিবারগুলোর কান্না কি শুধু ব্যক্তিগত শোক হিসেবেই থেকে যাবে?

কোনো মায়ের বুক খালি হওয়া শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; সেটি পুরো জাতির ক্ষতি। কোনো সন্তানের পিতৃহারা হওয়া শুধু একটি শিশুর ট্র্যাজেডি নয়; সেটি রাষ্ট্রেরও ব্যর্থতা। কারণ রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্বই হলো নাগরিকের জীবন রক্ষা করা।

আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক বিরোধিতা মানে শত্রুতা নয়; যেখানে মতের ভিন্নতা মানে মৃত্যুদণ্ড নয়; যেখানে আইনের আদালতই শেষ কথা বলবে, রাস্তার সহিংসতা নয়।

যখন কোথাও রাজনৈতিক সহিংসতার খবর আসে, তখন আমরা প্রায়ই দেখি—ঘটনার বিচার নিয়ে বিতর্ক হয়, দায়িত্ব নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হয়, কিন্তু নিহত মানুষের পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থেকে যায়। এই অপেক্ষা দীর্ঘ হয়, আর মানুষের আস্থা ক্ষয়ে যায়।

আজ প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা। যে-ই অপরাধ করুক, যে দলেরই হোক, তার বিচার হতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি কখনোই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না। বরং তা সহিংসতাকে উৎসাহিত করে।

বাংলাদেশের জন্ম কোনো ঘৃণার দর্শনের ওপর হয়নি। এই দেশের জন্ম হয়েছিল মানুষের অধিকার, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে। লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস আমাদের শেখায়—মানুষের জীবনই সবচেয়ে মূল্যবান। তাই রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতভেদ যেন কখনো মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার কারণ না হয়।

আজ প্রয়োজন প্রতিশোধের ভাষা নয়, ন্যায়বিচারের ভাষা। প্রয়োজন প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার রাজনীতি নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার রাজনীতি। কারণ ইতিহাস সাক্ষী—ক্ষমতা আসে যায়, কিন্তু একটি অন্যায় হত্যা বহু প্রজন্মের হৃদয়ে ক্ষত রেখে যায়।

আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কোনো মা তার সন্তানের লাশ খুঁজে বেড়াবেন না; কোনো স্ত্রী নিখোঁজ স্বামীর অপেক্ষায় বছরের পর বছর কাটাবেন না; কোনো শিশু রাজনৈতিক সহিংসতায় এতিম হবে না।

তুরাগ নদী আবার জীবনের নদী হোক। তার ঢেউয়ে যেন আর কান্নার প্রতিধ্বনি না শোনা যায়। বাংলাদেশের প্রতিটি নদী, প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি শহর আবার মানুষের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠুক।

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বন্দুকের নল নয়, প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বরং আইনের শাসন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সমান মর্যাদায়।

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন এমন বাংলাদেশ পায়, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ ভয় পাবে না; যেখানে বিরোধিতা করা অপরাধ হবে না; যেখানে রক্তের বদলে ভোট, ঘৃণার বদলে যুক্তি এবং সহিংসতার বদলে সংলাপই হবে রাজনীতির ভাষা। এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা। এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ মানুষের জীবন—যে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

এস এম কামাল হোসেন
তুরাগ নদীকে আমরা চিনি জীবনের নদী হিসেবে। এই নদী কৃষকের মাঠে জল দেয়, জেলের জালে মাছ তুলে দেয়, শহরের মানুষকে প্রকৃতির নিঃশ্বাস এনে দেয়। কিন্তু আজ আমার চোখে সেই তুরাগ যেন আর কেবল একটি নদী নয়। সে যেন শোকের প্রতীক, কান্নার প্রতীক। তার ঢেউয়ে আমি শুনি মায়ের আর্তনাদ, সন্তানের হাহাকার, স্বজনহারা মানুষের দীর্ঘশ্বাস। আজ তুরাগের জল যেন কারবালার ফুরাত নদীর রক্ত স্রোতে মিশে গেছে। এই নদীতে বীর ছাত্রলীগের তাজা রক্তে লাল হয়েছে।

আমি যখন তুরাগের দিকে তাকাই, তখন মনে হয়—নদীর জল যেন আর স্বচ্ছ নেই। সে যেন রূপক অর্থে রক্তের স্মৃতি বহন করছে। সেই স্মৃতি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে, আমাদের রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে, আমাদের সমাজকে প্রশ্ন করে।

একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, একটি মিছিলে হাঁটা, একটি মত প্রকাশ করা—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এগুলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার হওয়ার কথা। অথচ যখন রাজনৈতিক সহিংসতা, নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ কিংবা প্রতিশোধের রাজনীতির কথা সামনে আসে, তখন মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন জাগে—এই কোন বাংলাদেশ? এই কোন বিচারব্যবস্থা? আওয়ামী লীগ কর্মীকে হত্যা করা যেন দৈনন্দিন খবরে পরিণত করেছে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ও বিএনপির খুনিরা। বিগত দুই বছর ধরে একটাই চিত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নির্মূল করা আর আতঙ্কের সমাজ নির্মাণ করাই তাদের কাজ।

রাজনীতি যদি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য হয়, তাহলে কেন রাজনীতির মাঠে এত মৃত্যু? কেন একজন কর্মীকে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য ভয় নিয়ে বাঁচতে হবে? কেন একজন মা প্রতিদিন অপেক্ষা করবেন—তার সন্তান জীবিত ফিরে আসবে, নাকি শুধু একটি দুঃসংবাদ আসবে?

যে রাষ্ট্রের ভিত্তি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানুষের মর্যাদা, সেই রাষ্ট্রে প্রতিটি প্রাণের মূল্য সমান হওয়া উচিত। কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী, কোনো মতের মানুষ, কোনো আদর্শের অনুসারী—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, আবার কেউ আইনের সুরক্ষার বাইরেও নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস রক্তাক্ত। এই ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দল, বিভিন্ন মতের মানুষ সহিংসতার শিকার হয়েছে। প্রতিশোধের এই রাজনীতি কখনোই কোনো জাতিকে এগিয়ে নিতে পারেনি। বরং প্রতিটি হত্যাকাণ্ড নতুন ঘৃণা জন্ম দিয়েছে, নতুন বিভাজন সৃষ্টি করেছে।

আমার মতো অনেক রাজনৈতিক কর্মীর মনে আজ একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—আমরা কি বারবার হত্যার শিকার হব, আর নীরবে তা মেনে নেব? আমরা কি শুধুই পরিসংখ্যান হয়ে যাব? আমাদের পরিবারগুলোর কান্না কি শুধু ব্যক্তিগত শোক হিসেবেই থেকে যাবে?

কোনো মায়ের বুক খালি হওয়া শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; সেটি পুরো জাতির ক্ষতি। কোনো সন্তানের পিতৃহারা হওয়া শুধু একটি শিশুর ট্র্যাজেডি নয়; সেটি রাষ্ট্রেরও ব্যর্থতা। কারণ রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্বই হলো নাগরিকের জীবন রক্ষা করা।

আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক বিরোধিতা মানে শত্রুতা নয়; যেখানে মতের ভিন্নতা মানে মৃত্যুদণ্ড নয়; যেখানে আইনের আদালতই শেষ কথা বলবে, রাস্তার সহিংসতা নয়।

যখন কোথাও রাজনৈতিক সহিংসতার খবর আসে, তখন আমরা প্রায়ই দেখি—ঘটনার বিচার নিয়ে বিতর্ক হয়, দায়িত্ব নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হয়, কিন্তু নিহত মানুষের পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থেকে যায়। এই অপেক্ষা দীর্ঘ হয়, আর মানুষের আস্থা ক্ষয়ে যায়।

আজ প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা। যে-ই অপরাধ করুক, যে দলেরই হোক, তার বিচার হতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি কখনোই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না। বরং তা সহিংসতাকে উৎসাহিত করে।

বাংলাদেশের জন্ম কোনো ঘৃণার দর্শনের ওপর হয়নি। এই দেশের জন্ম হয়েছিল মানুষের অধিকার, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে। লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস আমাদের শেখায়—মানুষের জীবনই সবচেয়ে মূল্যবান। তাই রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতভেদ যেন কখনো মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার কারণ না হয়।

আজ প্রয়োজন প্রতিশোধের ভাষা নয়, ন্যায়বিচারের ভাষা। প্রয়োজন প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার রাজনীতি নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার রাজনীতি। কারণ ইতিহাস সাক্ষী—ক্ষমতা আসে যায়, কিন্তু একটি অন্যায় হত্যা বহু প্রজন্মের হৃদয়ে ক্ষত রেখে যায়।

আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কোনো মা তার সন্তানের লাশ খুঁজে বেড়াবেন না; কোনো স্ত্রী নিখোঁজ স্বামীর অপেক্ষায় বছরের পর বছর কাটাবেন না; কোনো শিশু রাজনৈতিক সহিংসতায় এতিম হবে না।

তুরাগ নদী আবার জীবনের নদী হোক। তার ঢেউয়ে যেন আর কান্নার প্রতিধ্বনি না শোনা যায়। বাংলাদেশের প্রতিটি নদী, প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি শহর আবার মানুষের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠুক।

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বন্দুকের নল নয়, প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বরং আইনের শাসন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সমান মর্যাদায়।

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন এমন বাংলাদেশ পায়, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ ভয় পাবে না; যেখানে বিরোধিতা করা অপরাধ হবে না; যেখানে রক্তের বদলে ভোট, ঘৃণার বদলে যুক্তি এবং সহিংসতার বদলে সংলাপই হবে রাজনীতির ভাষা। এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা। এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ মানুষের জীবন—যে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ