ইউরোপের বাজার দশ শতাংশ ছোট হয়েছে, বাংলাদেশের রফতানি কমেছে উনিশ শতাংশ। এই দুই সংখ্যার ফাঁকটাই আসল গল্প বলে দিচ্ছে। বৈশ্বিক মন্দা সব দেশকে সমান চাপে ফেলেছে, এটা সত্যি। কিন্তু ইইউর মোট আমদানি কমার হারের প্রায় দ্বিগুণ গতিতে বাংলাদেশ ধসে পড়েছে, এই বাড়তি পতনটুকু আবহাওয়ার দোষ নয়, এটা নীতির দোষ। আর সেই হিসাবটা চীনের পাশে রাখলে আরও স্পষ্ট হয়। একই বাজার, একই মন্দা, একই সময়, অথচ চীনের রফতানি কমেছে মাত্র সাড়ে চার শতাংশ, আর বাজার অংশীদারত্ব উল্টো বেড়েছে। তার মানে সংকট একটাই ছিল, প্রস্তুতি দুই রকম।
সংখ্যাগুলো আরও গভীরে গেলে চিত্রটা আরও খারাপ। জানুয়ারি-মার্চে রফতানি পরিমাণ কমেছে আট দশমিক তিন শতাংশ, কিন্তু গড় দাম কমেছে প্রায় বারো শতাংশ। মার্চের হিসাবে তো রীতিমতো উল্টে গেছে অনুপাতটা, পরিমাণ কমেছে মোটে তিন শতাংশের সামান্য বেশি, দাম কমেছে সাড়ে ষোলো শতাংশ। এর সরল অর্থ, ক্রেতা হারানোর ভয়ে কারখানাগুলো নিজেদের পণ্য পানির দরে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। যে দেশ একসময় মূল্য নির্ধারণে দরকষাকষি করত, সে দেশ এখন বাঁচার জন্য দাম কমিয়ে আনুগত্য কিনছে। এটা চাহিদা সংকট নয়, এটা আস্থা সংকট। ক্রেতারা বুঝে গেছে বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থা নড়বড়ে, তাই দরকষাকষিতে সুবিধা এখন তাদের হাতে।
আর এই নড়বড়ে অবস্থার কারণগুলো নতুন কিছু নয়। বিজিএমইএর সভাপতি নিজেই বলেছেন উচ্চ সুদহার, বন্দরের অদক্ষতা, কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্বের কথা। এগুলো কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা না, এগুলো বছরের পর বছর ধরে চিহ্নিত সমস্যা, প্রতিটি বাজেট বক্তৃতায় যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, প্রতিটি নতুন সরকার এসে যেগুলো মেরামতের ওয়াদা করে। অথচ ফেব্রুয়ারিতে দুই-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি আসন নিয়ে যে সরকার ক্ষমতায় বসল, তাদের হাতে সংস্কারের জন্য যতটা রাজনৈতিক পুঁজি দরকার তার প্রায় পুরোটাই ছিল। সেই পুঁজি ব্যাংক খাতের সুদহার যৌক্তিক করতে, বন্দর অটোমেশনে, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল। তার বদলে প্রথম কয়েক মাস কেটে গেছে আসন বণ্টন, গণভোটের ফলাফল আর জোট সমীকরণ নিয়ে। অর্থনীতি ফাইলটা যথারীতি অপেক্ষার তালিকায়।
এই প্যাটার্নটা চেনা। ২০০১-০৬ সালে বিএনপি-জামাতের শাসনামলেও একই দৃশ্য দেখা যেত, ব্যাংক ঋণ খেলাপের সংস্কৃতি, জ্বালানি সংকট, অবকাঠামোয় বিনিয়োগের অভাব। দুই দশক পরে, নতুন মুখ নিয়ে আবার একই রোগের লক্ষণ ফিরে আসা মানে এটা দুর্ভাগ্য না, এটা অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। ক্ষমতা কীভাবে ভাগ হবে সেই হিসাব যত গুরুত্ব পায়, কারখানার গ্যাস লাইন বা বন্দরের কনটেইনার জট তত গুরুত্ব পায় না, এটাই বাস্তবতা।
আর সময়টা একেবারেই বিলাসিতার নয়। ২০২৯ সালে এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে ইউরোপের শুল্কমুক্ত সুবিধা শেষ। এখনই যে বাজার অংশীদারত্ব হাতছাড়া হচ্ছে, শুল্ক সুবিধা উঠে গেলে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া আরও কঠিন হবে। অর্থাৎ যে সংস্কার আজ করার কথা ছিল, তা পিছিয়ে দেওয়া মানে আগামী তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় রফতানি খাতকে একরকম অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে দেওয়া।
বৈশ্বিক মন্দা একটা বাস্তব কারণ, এটা অস্বীকারের সুযোগ নেই। কিন্তু পরিসংখ্যান নিজেই বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশের পতনের একটা বড় অংশ মন্দার হিসাবে পড়ে না, পড়ে অব্যবস্থাপনার হিসাবে। আর সেই হিসাবের দায় এড়ানোর সুযোগ এই মুহূর্তে ক্ষমতায় থাকা সরকারের নেই।

