ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক সরকারের দেড় বছরের শাসনকাল বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। শান্তিতে নোবেলজয়ী এই ব্যক্তির মসিহা সাজার প্রবণতা আর বাস্তবতার মাটিতে তার সরকারের লুটতরাজের কীর্তি এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার সরকারের প্রতিটি অঙ্গে লেগে থাকা দুর্নীতির পচন ধরা গন্ধ ক্রমেই স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, অর্থনৈতিক অপরাধের এক ভয়াবহ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল ইউনূস সরকার, যা অতীতের সব কলঙ্ককে ছাড়িয়ে গেছে।
সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি তাদের যে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা এই সরকারের প্রকৃত চেহারা উন্মোচনের জন্য যথেষ্ট। প্রতিবেদনের কাঁটায় কাঁটায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁয়, যা আগের বছর ছিল মাত্র ৫৯ কোটি ফ্রাঁ। স্থানীয় মুদ্রায় এই পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই উল্লম্ফন কোনো স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় না, বরং এটি একটি সংঘবদ্ধ লুটপাটের চিত্রই তুলে ধরে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়। বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, সুইস ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের মূল গন্তব্য নয়, এটি কেবল একটি ক্ষুদ্র স্রোত। অর্থ পাচারের মূল কেন্দ্রগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, হংকং এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের কিছু দ্বীপদেশ। সুইস ব্যাংকে যে অর্থ জমা পড়ে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তার অন্তত ১০ গুণ অর্থ এই দেশগুলোতে পাচার হয় বলে ধারণা করা হয়ে থাকে।
হিসাব বলছে, ইউনূস সরকারের মাত্র এক বছরে দেশ থেকে পাচার হওয়া মোট অর্থের পরিমাণ দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এটি একটি নির্বাচিত সরকারের তো দূরের কথা, যেকোনো শাসনব্যবস্থার জন্যই কলঙ্কজনক এক রেকর্ড। দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার এই মহাযজ্ঞে ইউনূস ও তার সহযোগীরা যেন এক আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন।
অর্থ পাচার ঠেকানোর নামে ইউনূসের ভূমিকা ছিল পুরোটাই মঞ্চনাটকের মহড়া। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরপরই তিনি জাতিকে শোনালেন পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার মন্ত্র। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করে গলায় গাম্ভীর্য এনে ভাষণ দিলেন। কিন্তু কাজের বেলায় শূন্য। তার এই দম্ভোক্তি ছিল শুধুই ফাঁকা আওয়াজ, যা দিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর পাঁয়তারা করা হয়েছিল। তার চেয়েও এক কাঠি সরেস ছিলেন তার হাতে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।
তিনি রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশ সফর করে পাচারকৃত অর্থ ছয় মাসের মধ্যে ফেরত আনার যে গল্প ফেঁদেছিলেন, তা ছিল ডাহা মিথ্যাচার। অথচ বাস্তবে এই গভর্নরের নিজের বিরুদ্ধেই অর্থ পাচারের জোরালো প্রমাণ বিদ্যমান। নিজের মেয়ের নামে দুবাইয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার যে কীর্তি তিনি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় করেছেন, তা রীতিমতো নির্লজ্জ অপরাধ। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈধ পথে এই অর্থ নেওয়া হয়নি, এ কথা হলফ করে বলা যায়।
শুধু গভর্নর নন, সেই সরকারের মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যের বিরুদ্ধেই এখন পর্যন্ত চাঞ্চল্যকর সব অভিযোগ ওঠা একটি প্রকাশ্য রহস্য। সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং তথ্য উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বারবার সুইজারল্যান্ড সফরের কারণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সাবেক সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আদিলুর রহমান খানসহ হাতে গোনা দুএকজন ছাড়া প্রায় সবার বিরুদ্ধেই শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ এখন উন্মুক্ত গোপন তথ্য। এমনকি আন্দোলনের মাঠ থেকে উঠে আসা নেতৃত্বের একাংশও প্রকাশ্যেই সেই সরকারের আমলে ব্যাপক অর্থ পাচারের কথা স্বীকার করেছেন।
ইউনূস সরকারের আরেকটি বড় কৌশল ছিল প্রকৃত অর্থ পাচারকারীদের রক্ষা করে বিরোধী দল ও বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিডিয়া ট্রায়াল পরিচালনা করা। অর্থ পাচারের নিরপেক্ষ তদন্তের নামে তারা তদন্তকে প্রতিহিংসার হাতিয়ারে পরিণত করেছিল। প্রকৃত অপরাধীরা তাদের ব্যবস্থাপনায় আড়ালে সুরক্ষিত থেকে গেছে, অথচ অনেক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীকে বিনা কারণে হয়রানি করে বেসরকারি খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় কিছু উপদেষ্টা সরাসরি পাচারকৃত অর্থ ও সম্পদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছেন, যা রীতিমতো আতঙ্কের বিষয়।

