সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ বলে, সবাই আইনের চোখে সমান। কথাটা কাগজে-কলমে যত সুন্দর, বাস্তবে ততটাই বিবর্ণ। কারণ এই দেশে একশ্রেণির মানুষ আছেন, যারা আইনের ঊর্ধ্বে। তাদের জন্য আইন আরেক রকম, আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেক রকম। ছয় নবজাতকের মৃত্যুতে যখন পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা নড়ে উঠলো, হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হলো, মামলা হলো, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ধন্যবাদ পেলেন, তখনই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, ছয়শোর বেশি শিশুর হামে মৃত্যুর ঘটনায় সেই রাষ্ট্র কেমন পাথর হয়ে বসে আছে।
প্রশ্নটা একটাই, কেন? কেন ছয় শিশুর মৃত্যুতে বিচার পাই, আর ছয়শোর মৃত্যুতে পাই না? এই প্রশ্নটা রাজনৈতিক মতবাদ, দল-মত নির্বিশেষে যে কোনো ন্যায়বিচারকামী মানুষকেই করতে বাধ্য করে। কারণ এটা তো আর কোনো ‘দুর্ঘটনা’ ছিল না। ইউনিসেফ বলে দিয়েছে, তারা তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারকে পাঁচটা চিঠি দিয়েছিল টিকা সংকটের ব্যাপারে সতর্ক করে। দশটা মিটিংয়ে বলেছিল একই কথা। টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় ইচ্ছাকৃত পরিবর্তন এনে শিশু হত্যার ষড়যন্ত্র করাটা নিছক গাফিলতি নয়, এটা নৃশংসতম অপরাধ। আর সেই অপরাধ করেছে বলেই আমরা জেনে ফেললাম, কীভাবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দাঙ্গা বাঁধিয়ে, বিদেশি রাষ্ট্রের টাকা আর জঙ্গি সহায়তায়, সামরিক বাহিনীর সমর্থনে, দেশের নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলে দিয়ে ক্ষমতা দখলকারী সুদী মহাজন ইউনূস ও তার সহযোগী যুদ্ধাপরাধী জামায়াত আর স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের বানানো সেনানিবাসে জন্ম নেওয়া দুর্নীতি-সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর বিএনপি। আবারও প্রমাণ করলো, এই চক্র ক্ষমতার লোভে যে কোনো নিষ্ঠুরতার পথ বেছে নিতে পারে। এখন ক্ষমতায় নেই ইউনূস, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে ক্ষমতায় বিএনপি। তার পরও কী করে এই ছয়শো শিশুর ঘাতকরা রক্ষা পায়?
আমরা কি ভুলতে বসেছি, আদ-দ্বীনের ছয় নবজাতকের মৃত্যু যেমন নৃশংস, তেমনি নৃশংস ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সেই নির্দেশনা, যে নির্দেশনায় টিকার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল? আমরা কি ভুলে গেছি, এই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই হামে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছিল? ইউনিসেফ যখন বারবার সতর্ক করছিল, তখন এই সুদী মহাজন ও তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা কী করছিলেন? জনগণের টাকায় বিলাসবহুল জীবনযাপন আর নিজেদের ভাবমূর্তি বাঁচাতে কী কী প্রহসন করছিলেন? পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডের দায় নেবে কে? উত্তরটা সবার জানা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বাস্থ্য মন্ত্রী, তথ্য উপদেষ্টা – সবাই সাবেক সরকারের গাফিলতিকে দায়ী করেছেন। এনিয়ে বক্তৃতা ঝড় তুলেছেন, কিন্তু একটা নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি পর্যন্ত গঠন করেননি। এখনো। এ কেমন বিচার?
কেন সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের করা মামলা আদালত খারিজ করে দিলো? কেন আদালত বললো না, “আমরা জানতে চাই এই ছয়শো শিশুর মৃত্যুর পেছনে কারা?” কেন এতো রিট, এতো আইনি নোটিশ নিষ্ফল হয়ে গেলো, নীরবে মরে গেলো? কারণ, যারা জড়িত তারা এখনো এতো শক্তিশালী যে তাদের ছোঁয়া যায় না? নাকি সরকারের ভেতরেই এমন এক অদৃশ্য চুক্তি হয়েছে, যাতে অতীতের কোনো গুনাহের হিসেব নেওয়া হবে না? এটা তো বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে, ‘কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়’ কথাটা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।
আমরা একটা অদ্ভুত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছি, যেখানে সুশীল মুখোশ পরে কেউ ক্ষমতায় এলেই তার অপরাধ অপরাধ থাকে না। যেখানে ক্ষমতার উৎসব আর বিচারের বোধন কখনো একসাথে হয় না। যেখানে ছয় নবজাতকের জীবন দামি, কিন্তু হামে মরা সেই ছয়শো শিশুর মা-বাবার বুকফাটা কান্না মিডিয়ার টকশো আর ক্ষমতাবানের বক্তৃতায় বিনোদনের উপকরণ মাত্র। এই ভয়ঙ্কর বৈষম্যের বিরুদ্ধে এখনই কিছু না করলে, এই যে আপনি বলছেন আইনের চোখে সবাই সমান, এটা আজীবনের জন্য একটা মিথ্যা বুলিতে পরিণত হবে। একটা নির্মম রসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়।
দেশের মানুষ জানে কে বা কারা এই হত্যাযজ্ঞের নেপথ্যের কারিগর। জানে তারা কীভাবে এখনো রাজনীতির পর্দার আড়ালে সুরক্ষিত। জানে দেশটাকে তারা কোন পথে নিয়ে যেতে চায়। তাই ‘বিচার চাই’ স্লোগানটা শুধু রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য নয়, এটা এখন জাতির নৈতিকতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ যদি ছয়শো শিশু মৃত্যুর বিচার না হয়, তাহলে সেই কালো অধ্যায় আমাদের ইতিহাসের গায়ে চিরকালের জন্য কলঙ্ক হয়ে লেগে থাকবে। আর তখন বলে দিতে হবে, আমরা সবাই একটা বিভৎস বিচারহীনতার সাক্ষী হয়ে থেকে গেলাম।

