২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিচারবিভাগের অপব্যবহার, ভিন্নমত দমনে মামলার মহড়া আর ভয় দেখিয়ে গণমাধ্যমকে স্তব্ধ করার অপশাসনের যে কালো অধ্যায় বাংলাদেশ ভুলতে বসেছিল, বিএনপি ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সেই বিভীষিকা ফিরিয়ে এনেছে হুবহু একই চেহারায়। এবার শিকার বগুড়ার চারজন সাহসী সাংবাদিক, যাদের অপরাধ তারা প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বিতর্কিত ভূমিকা জনসমক্ষে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।
বগুড়ায় এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী যা বলেছেন, সংবাদমাধ্যম তার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। অথচ ক্ষমতার দম্ভ এতটাই চরমে পৌঁছেছে যে প্রতিবেদনের ভাষা পছন্দ না হলেই দেওয়া হচ্ছে মানহানির মামলা। এই মামলা করার জন্য এগিয়ে এসেছেন প্রেসক্লাবেরই একজন কর্মকর্তা, যে কিনা নিজের পেশাদার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে আইনের হাতিয়ার উঁচিয়ে ধরতে দ্বিধাবোধ করেননি। আদালত প্রাথমিক শুনানিতেই অভিযোগ এজাহার হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যা নিতান্তই যান্ত্রিক একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রশ্নটা গভীরে, এই মামলার মর্মার্থ কোথায়? ভিন্নমতকে আইনের ফাঁদে ফেলে শ্বাসরোধ করা ছাড়া কি অন্য কিছু কি এটি?
‘দণ্ডবিধির ৫০০, ৫০১, ৫০৪ ও ১০৯ ধারা’ এই অভিযোগপত্রের অক্ষরগুলো শুধু আইনের বুলি নয়, এগুলো তামার বিষে ডোবানো তীর। মানহানি, উসকানি কিংবা শান্তিভঙ্গের অভিযোগের আড়ালে ক্ষমতাবানদের সমালোচনা করার পথটাই বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ নিজেদের জনসংযোগ ও তথ্যবিভাগ দিয়ে মিথ্যাচার আর বিভ্রান্তি ছড়ানোর রাজনীতি যে এ সরকারের মূলমন্ত্র, তা তো বুঝতেই পারছেন দেশবাসী। মন্ত্রী রাস্তায় নেমে ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন না, উল্টো সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করতে চান।
এটি একটি সুচিন্তিত কৌশলের অংশ। বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে যেভাবে বিরোধী কণ্ঠরোধে মামলাকে হাতিয়ার করেছিল, তার অশুভ পুনরাবৃত্তি চলছে এখন। দলের হাইকমান্ড নির্বিকার, তলাবিহীন ঝুড়ির মতো ক্ষমতা ভোগ করছেন, আর নিচের স্তরের নেতাকর্মীরা ছোট ছোট স্বৈরাচারী আচরণে মেতে উঠেছেন। স্থানীয় সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী যে ভাষায় জনগণের প্রতিনিধিত্ব না করে প্রকাশক-সম্পাদক আর প্রতিবেদকদের জেলে পুরতে চান, তাতে বোঝা যায় বিএনপির এই সংস্করণের সঙ্গে দেশের গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চিরশত্রুতা এখনো অটুট।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও কাপুরুষোচিত ব্যাপার হলো, মামলাটি করেছেন বগুড়া প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ। পেশাদারিত্ব ও সহকর্মীত্বের বোধকে পদদলিত করে ক্ষমতার দালালি করার এ এক জঘন্যতম নমুনা। যেখানে এক সাংবাদিক অন্য সাংবাদিকের পাশে দাঁড়াবেন, সেখানে তিনি হয়ে উঠলেন সরকারের দণ্ডবাহক। এটি প্রেসক্লাবের ভাবমূর্তির জন্যও গ্লানিকর এবং সাংবাদিক সমাজের জন্য কলঙ্ক।
দেশ এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রতিটি মামলা যেন একটি সতর্কবার্তা। চুপ থাকা মানে পরবর্তী শিকার হওয়ার অনিবার্যতাকে মেনে নেওয়া। তাই এই অপশাসনের বিরুদ্ধে এখনই রুখে দাঁড়ানোর সময়। কলমের বিরুদ্ধে দায়ের করা প্রতিটি মামলাকে প্রতিহত করতে হবে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে, যে সরকার সত্য প্রকাশকে অপরাধ মনে করে, সে সরকারের স্থান ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই নির্ধারিত হয়ে আছে। মীর শাহে আলমদের বিচার হবে, তবে তা জনগণের আদালতে, কোনো চাপা দেওয়া সংবাদ সম্মেলনে নয়।

