বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে । আন্তর্জাতিক বাজারে সস্তা ও সাশ্রয়ী বিকল্প জ্বালানির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। বিশ্লেষক ও বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের দাবি, মূলত কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সন্তুষ্টির জন্যই দেশের স্বার্থ বিকিয়ে এই ব্যয়বহুল পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের মে মাসে ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত কৌশলগত জ্বালানি সহযোগিতা এমওইউ এবং ফেব্রুয়ারির বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এলএনজিসহ জ্বালানি পণ্য ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকারি পক্ষ একে জ্বালানি নিরাপত্তা ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে দাবি করলেও সমালোচকদের মতে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন জ্বালানি বলয়ের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলা হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা স্পষ্ট বলছেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সংগ্রহের একাধিক পথ খোলা ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়া বর্তমানে ছাড়মূল্যে ডিজেল ও ফুয়েল অয়েল সরবরাহ করছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমিত মেয়াদে কিছু ছাড় পাওয়া সত্ত্বেও সেই পথটি পুরোপুরি ব্যবহার না করে উচ্চমূল্যের মার্কিন এলএনজি বেছে নেওয়া নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ঐতিহ্যগতভাবে কম দামে তেল ও গ্যাস সরবরাহ করলেও সাম্প্রতিক আঞ্চলিক অস্থিরতার দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আকাশচুম্বী দামে জ্বালানি কেনার যৌক্তিকতা খোঁজা হচ্ছে। স্পট মার্কেটের অস্থিরতা এড়াতে রাশিয়ার মতো উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী চুক্তির সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো হয়নি।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই চুক্তি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যসহ অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এর ফলে দেশের ভঙ্গুর বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি হবে। একই সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতের ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাবে পরিবহন খরচ ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো এই চুক্তির কড়া সমালোচনা করে অভিযোগ তুলেছে যে, বর্তমান সরকার জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পাওয়ার জন্য অক্ষরে অক্ষরে মার্কিন নির্দেশ পালন করছে। তাদের দাবি, ১৫ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল দায় দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে এবং জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা একদম কমিয়ে দেবে। সরকারি পক্ষ থেকে একে জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ বলা হলেও স্বচ্ছতার অভাব এবং উচ্চমূল্যের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির এই বিশাল বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বইতে হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

