এম এ আহাদ চৌধুরী রায়হান
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে কিছুদিন আগে যখন কলমের আঁচড়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হচ্ছিল, তখন কি আমাদের নীতিনির্ধারকদের হাত একবারও কাঁপেনি? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং পাকিস্তানের মহসিন রাজা নকভি হাসিমুখে করমর্দন করলেন, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল। কিন্তু এই কূটনৈতিক হাসির আড়ালে যে দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারের ইঙ্গিত আছে, তা কি আমরা পড়তে পারছি, নাকি স্রেফ না দেখার ভান করছি?
দশ বছর মেয়াদি এই চুক্তির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘মাদক নির্মূল’। শুনতে মহৎ মনে হয়, জননিরাপত্তার রক্ষাকবচ মনে হয়। কিন্তু কূটনীতির বিষাক্ত অলিগলি যারা চেনেন, তাদের কাছে ‘গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়’ এবং ‘কন্ট্রোলড ডেলিভারি অপারেশন’-এর মতো শব্দগুলো স্রেফ প্রযুক্তিগত টার্ম নয়—এগুলো এক একটি অশনিসংকেত।
যে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা দশকের পর দশক ধরে এই অঞ্চলে অস্থিরতা আর উগ্রবাদ ছড়ানোর প্রধান কারিগর হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, তাদের হাতে আমরা আমাদের গোয়েন্দা তথ্যের চাবিকাঠি তুলে দিচ্ছি? এটি কি মাদক নির্মূলের লড়াই, নাকি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার অন্দরমহলে এক বিতর্কিত শক্তিকে সগৌরবে প্রবেশের অনুমতিপত্র?
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, যখনই বিশেষ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসে, তখনই ইসলামাবাদের সাথে আমাদের এই ‘নিরাপত্তা প্রেম’ অদ্ভুতভাবে উথলে ওঠে। ২০০১-০৬ সালের সেই দুঃসহ স্মৃতি এ দেশের মানুষ এখনো ভোলেনি। মাদকের দোহাই দিয়ে তখন যে ধরনের ‘সহযোগিতা’র পথ প্রশস্ত করা হয়েছিল, তার চড়া মাশুল দিতে হয়েছিল সার্বভৌমত্বকে।
সেই আমলে মাদকের চেয়েও ভয়াবহ মারণাস্ত্র আর বিচ্ছিন্নতাবাদ আমাদের মাটিকে রক্তাক্ত করেছিল। মাদক চোরাচালানের আন্তর্জাতিক রুটগুলো যারা নিয়ন্ত্রণ করে বা যাদের প্রত্যক্ষ মদতে এসব সিন্ডিকেট টিকে থাকে, তাদের উত্তরসূরিদের সাথে বসে রুট বন্ধের আলোচনা করা—এর চেয়ে বড় কৌতুক আর কী হতে পারে? এটি যেন অনেকটা নেকড়েকে খোঁয়াড় পাহারার দায়িত্ব দেওয়ার শামিল।
সবচেয়ে বিপদের কথা হলো চুক্তিতে থাকা ‘গোপনীয়তা’ রক্ষার কড়া শর্ত। এর অর্থ হলো, এই সমঝোতার আড়ালে পর্দার পেছনে কী দেওয়া-নেওয়া হচ্ছে, কোন গোপন তথ্য পাচার হচ্ছে, তা জানার অধিকার খোদ এ দেশের সাধারণ মানুষেরও নেই। আমরা কি তবে এমন এক ব্যবস্থার দিকে পিছু হটছি যেখানে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দোহাই দিয়ে বিজাতীয় রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে?
মাদকের মরণকামড় থেকে আমাদের যুবসমাজকে বাঁচাতে হবে, এ নিয়ে কোনো দ্বিতীয় মত নেই। কিন্তু বিষ দিয়ে বিষক্ষয় করার এই যে বিপজ্জনক খেলায় সরকার মেতেছে, তার শেষ কোথায়? মাদক আমাদের প্রকাশ্য শত্রু, কিন্তু সেই শত্রুর সাথে লড়াই করার জন্য আমরা এমন কাউকে বন্ধু বেছে নিচ্ছি যার নিজের অতীত এবং বর্তমান—উভয়ই এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
রাজধানীর সেই বিলাসবহুল হোটেলের রুদ্ধদ্বার কক্ষে কেবল একটি কাগজ সই হয়নি, বরং প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে আমাদের আগামীর নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। ছায়ার সাথে এই সন্ধি আমাদের কোন খাদে নিয়ে ফেলবে, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে মনে রাখা দরকার, একবার যদি জাতীয় নিরাপত্তার দেয়াল ফুটো হয়, তবে তা মেরামত করার সুযোগ ইতিহাস দ্বিতীয়বার দেয় না।
লেখক: সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

