রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস এ বছর যে সূচক প্রকাশ করেছে, তাতে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম। গত বছরের চেয়ে তিন ধাপ পেছানো। এবার বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতিকে “খুবই গুরুতর” বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সংখ্যাটা নিয়ে বসে একটু ভাবুন। ১৫২। এর মানে পৃথিবীর মাত্র ২৮টি দেশে সাংবাদিকতার পরিস্থিতি বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ। আর এই সরকার এবং এই সরকারের বশংবদ গণমাধ্যমের একটা অংশ এটাকে “সাফল্য” বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এই হলো বিএনপির নতুন বাংলাদেশ।
১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে, সেটা নিয়ে কথা না বললেই নয়। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, সাধারণ মানুষের ব্যাপক বয়কটের মধ্যে, নিজেদের মধ্যে একটা পাতানো খেলা খেলে যারা ক্ষমতায় বসেছে, তারাই এখন দেশের গণমাধ্যমের অভিভাবক সেজে বসে আছে। একটা দল যার জন্ম সেনানিবাসে, যার প্রতিষ্ঠাতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন, সেই দল এখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বড় বড় কথা বলছে। এই স্ববিরোধিতাটা দেখতে পাওয়ার জন্য খুব বেশি বুদ্ধির দরকার নেই।
আরএসএফ বলছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ব্যাপকভাবে কমে গেছে। অর্থাৎ সাংবাদিকতার স্বায়ত্তশাসনে রাজনৈতিক সমর্থন নেই, রাষ্ট্রীয় চাপ আছে, ভিন্নমতকে সহ্য করা হচ্ছে না। এটা নতুন কিছু না। বিএনপির ইতিহাসে গণমাধ্যমের সাথে সম্পর্কটা কখনোই স্বস্তির ছিল না। যারা প্রশ্ন করে, যারা জবাবদিহি চায়, তাদের জন্য পরিবেশ কখনোই অনুকূল রাখা হয়নি। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
আর গণমাধ্যমের নিজের দিকটার কথা বললে, সেটা আরও বিরক্তিকর। বিএনপির শাসনামলে যে পরিমাণ গুজব, মিথ্যা তথ্য আর পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে, তাতে ১৫২তম স্থানটা আসলে অবাক করার মতো কিছু না। একটা বড় অংশের গণমাধ্যম এখন সংবাদ পরিবেশন করছে না, করছে দলীয় প্রচারণা। সত্য আর মিথ্যার ফারাক যেখানে ঘুচে গেছে, সেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচক কমবে না তো বাড়বে নাকি?
নেপাল আমাদের চেয়ে ৬৫ ধাপ এগিয়ে। ভুটান ২ ধাপ। শ্রীলঙ্কা ১৮ ধাপ। যে দেশগুলোকে আমরা একসময় অবজ্ঞার চোখে দেখতাম, তারা এখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় আমাদের অনেক পেছনে ফেলে চলে গেছে। আর আমরা পড়ে আছি পাকিস্তানের ঠিক ৫ ধাপ উপরে। পাকিস্তান, যে দেশের রাজনৈতিক কাঠামো, সামরিক হস্তক্ষেপ আর গণমাধ্যমের দুরবস্থা নিয়ে দশকের পর দশক ধরে উদ্বেগ প্রকাশিত হয়েছে। সেই পাকিস্তানের মাত্র ৫ ধাপ উপরে থাকাটাকে যারা “এগিয়ে থাকা” বলে মনে করছে, তাদের বিচারবুদ্ধি নিয়ে সত্যিই প্রশ্ন জাগে।
আরএসএফ জানাচ্ছে, ২৫ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম বৈশ্বিক গড় স্কোর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি দেশ এখন “কঠিন” বা “খুবই গুরুতর” শ্রেণিতে। ২০০২ সালে যেসব দেশে গণমাধ্যমের পরিস্থিতি ভালো ছিল, সেই দেশগুলোয় বিশ্বের ২০ শতাংশ মানুষ থাকত। এখন সেটা নেমে এসেছে মাত্র ১ শতাংশে। বৈশ্বিক এই পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশ পিছিয়ে যাচ্ছে মানে দেশের ভেতরের সমস্যাটা আলাদা এবং সেটা নিজেদের তৈরি।
যে সরকার গণমাধ্যমকে নিজের মুখপাত্র বানাতে চায়, যে সরকার সাংবাদিকের কলম বা ক্যামেরার দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়, সেই সরকারের অধীনে গণমাধ্যম স্বাধীনতার সূচক উপরে যাওয়ার কথা না। যাচ্ছেও না। আর ১৫২তম স্থানকে অর্জন বলে চালিয়ে দেওয়ার এই চেষ্টাটা ঠিক ততটাই হাস্যকর, যতটা হাস্যকর পাতানো নির্বাচনকে গণতন্ত্র বলে দাবি করা।

